অণুগল্প
নীলপদ্ম সরোবর
আবু জাফর সিকদার
পুবাকাশ
হিমাদ্রী বরফ গলে গলে হয়ে উঠে এক নীলপদ্ম সরোবর
হিমাদ্রীর চোখে ঘুম নেই। রাতের পর রাত এভাবেই কেটে যায় নির্ঘুম সময়। পাশে কেউ নেই। থেকেও নেই। রিমান, মানে তার পতিদেবতা, আজ বহু বছর হলো আলাদা বিছানায় থাকে! ছোট ছেলেটিকে রাখতো, সেও কলেজে উঠে যাওয়ার পর বিছানা আলাদা করে দিয়েছে । মেঝ ছেলে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে উঠে গেছে চার বছর আগে! বড় ছেলে বুয়েট পাশ দিয়ে বছর দুই চাকুরীর জন্য ঘুরাঘুরি করে অবশেষে আমেরিকা চলে গেল অনেকটা নিরুপায় হয়ে। ছেলেটা আজ দুবছর পর ফিরছে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বিমান গতকাল ছাড়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় বিলম্ব হয়ে গেল শিডিউল। ছেলে বিদেশ থেকে আসছে এ উত্তেজনায় ও টেনশনে ঘুম একদম ছুটিতে চলে গেছে! তার উপর ফেলে আসা শ্বাসরুদ্ধকর জীবনটাও যেন মাথার ভেতর সেলুলয়েড ফিতার মতো ঘুরপাক দিচ্ছে!
রুম্মান, এই বড় ছেলেটির জন্যই, হিমাদ্রীর শেষ পর্যন্ত রিমানের সংসারটা ছেড়ে যেতে পারলো না। স্বামী, সংসার, সম্পর্কের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করতে করতেই শরীরে বাসা বাঁধলো অন্য শরীর! এই সেই নাড়ীছেঁড়া ধন, যাকে আশ্রয় করে হিমাদ্রীর পোতাশ্রয়টি গড়ে উঠেছিলো! ভেবেছিলো দ্বিতীয় সন্তানটা নিলে তার নিজের গভীরের ক্ষতটি আস্তে আস্তে শুকিয়ে উঠবে। কিন্তু না, কষ্টটা তুষের আগুন হয়ে শরীরে লেপ্টে থাকে। এক মরু তৃষ্ণা নিয়ে ঘানিটানা কলুর বলদের মতো কাটিয়ে দিলো যাপনের কত সহস্র দিবা-রজনি। একই পথে তৃতীয়জনও এসে যুক্ত হলো। ছেলে তিনটি বড় হতে থাকে। হিমাদ্রী মায়ের মমতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়। কষ্ট ভুলে নিষ্ঠায় মনোনিবেশ করে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে, এখন গর্ব করতে পারে – সে একজন রত্মগর্ভা!
ষোল বছরের এক কিশোরীকে চৌত্রিশ বছরের এক জন অপরিচিত মানুষের হাত ধরে যে বাড়িতে তুলে আনা হয়েছিলো, দিন কয় যেতে না যেতেই বুঝতে পারলো, সে এই বাড়িতে একজন অগন্তুক মাত্র।তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা; চাহিদা, প্রাপ্তি, দেয়া-নেয়ার এসব রসায়ন ইট-কনক্রিটের ইঞ্জিনিয়ার কখনই বুঝে উঠতে পারেননি! অথবা বুঝার চেষ্টাই হয়তো করেননি!
আর এদিকে হিমাদ্রীর ‘তিনি ‘ একটি মফস্বল শহরে সরকারি আপিসের চাকুরে! দায়িত্ববান ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বেশ নাম ডাক। কখনও সপ্তাহান্তে,কখনও দু’সপ্তাহ পর তিনি বৌ বাচ্চাদের কাছে আসতেন। টাকা পয়সা যা দরকার হিসাব করে দিয়ে দেন। এখানেও তিনি যথেষ্ট দায়িত্ববান। এখন হিমাদ্রীর চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। তিনি আটান্ন। রিটায়ার্ড করে হজও করে এসেছেন। যথাসম্ভব আল্লাহ বিল্লাহ করেন। এক বাসায় থাকেন, এক হাঁড়ির ভাতও খান। কিন্তু দু’জনার দু’টি পথ দু’দিকে গিয়েছে বেঁকে…একজন পাশের ঘরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন , অন্যজন মধ্যরাতের তারা গুনছেন!
ষোল বছরের এক কিশোরীকে চৌত্রিশ বছরের এক জন অপরিচিত মানুষের হাত ধরে যে বাড়িতে তুলে আনা হয়েছিলো, দিন কয় যেতে না যেতেই বুঝতে পারলো, সে এই বাড়িতে একজন অগন্তুক মাত্র।তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা; চাহিদা, প্রাপ্তি, দেয়া-নেয়ার এসব রসায়ন ইট-কনক্রিটের ইঞ্জিনিয়ার কখনই বুঝে উঠতে পারেননি! অথবা বুঝার চেষ্টাই হয়তো করেননি!
তিনি সেই থেকে পালা করে বিছানায় আসেন। নিজের মতো করে আসেন। নিজের মতো করে নিষ্ক্রান্ত হয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন !
হিমাদ্রী বরফ গলে গলে হয়ে উঠে এক নীলপদ্ম সরোবর।
আবু জাফর সিকদার : কবি ও কথাকার।