আবু হেনা মোস্তফা কামাল: শ্রদ্ধাঞ্জলি


আবু মুসা মোহাম্মদ মামুন


পুবাকাশ


১৯৬৪ সালে ২৫ ডিসেম্বর বিটিভির যাত্রা শুরু। উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত হয় তাঁর লেখা ‘ঐ যে আকাশ নীল হলো আজ/ সে শুধু তোমার প্রেমে।’
তাঁর স্মরণীয় কিছুগান- সেই চম্পা নদীর তীরে,আমি সাগরের নীল,অনেক বৃষ্টি ঝরে,এই পৃথিবীর পান্থশালায়,তুমি যে আমার কবিতা,তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে,শত জনমের স্বপ্ন তুমি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

অধ্যাপনা শিল্পের বরপুত্র- মন ও মেজাজে, মেধা ও মননে, সৃষ্টি ও কৃতিতে আবু হেনা মোস্তফা কামল ছিলেন স্বতন্ত্র ও প্রায় তুলনাহীন।তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সমালোচক, অধ্যাপক, প্রশাসক, গায়ক, গীতিকার, এবং অসাধারণ কথক ও উপস্থাপক।তাঁর প্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন না হওয়ার একটা বড় কারণ প্রতিভার এই বহুমুখিনতা।তার সাথে যুক্ত হয়েছে নিজের দুর্মর ও দুর্লঙ্ঘ্য খ্যাতি এবং সমালোচকদের ক্রমাগত অবহেলা।
জন্ম- ১২ মার্চ,১৯৩৬।গোবিন্দা, উল্লাপাড়া, পাবনা।বর্তমানে সিরাজগঞ্জ। বাবা শাজহজাহান আলী, গ্রাজুয়েট শিক্ষক।মা খালিসুন্নেসা, গৃহিনী।পিতার শিক্ষানুরাগ ও মাতার সংগীতপ্রীতি সমন্বিত সুসংস্কৃত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তিনি।শৈশবকৈশোর কেটেছে পাবনায়। এসএসসি- পাবনা জেলা স্কুল, ১৯৫২। এইচএসসি-ঢাকা কলেজ, ১৯৫৪। উভয় পরীক্ষায় যথাক্রমে প্রথম বিভাগে ১৩ম ও ৭ম স্থান। অনার্স (বাংলা সাহিত্য)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৮ এমএ(বাংলা সাহিত্য), ১৯৫৯ উভয় ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান।
১৯৬৬-৬৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।বিষয়- শিরোনাম: The Bengali Press and Literary Writing ( 1881-1931).
গোটা ছাত্রজীবনে মেধাবী ছাত্র হিশেবে তাঁর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে ছিলো। বিয়ে-২৫ অক্টোবর,১৯৫৬. স্ত্রী- হালিমা খাতুন,পাঁচ সন্তান। তিন কন্যা ও দুই পুত্র।

কর্মজীবন : শিক্ষকতাই করতে চেয়েছেন, করেছেনও।১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে খন্ডকালীন প্রভাষক। “দুমাস চাকরি করেই এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, আমার কাছে এর চেয়ে গ্রহণযোগ্য পেশা আর কিছু নেই।”
তারপর চাঁপাইনবাব গঞ্জ কলেজে দুমাস দশ দিন। তারপর ১৯৬২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পর ১৯৬৩ সালে অস্থায়ী প্রভাষক পদে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৫ সালে স্থায়ী প্রভাষক পদে যোগদেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে চলে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্বদিদ্যালয়ে।এখানে এসে তিনি নিজেকে মেলে ধরেন সমহিমায়।” চট্টগ্রামে আমি আমার লুপ্ত আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই।রাজশাহীতে যদি আমার মৃত্যু হয়ে থাকে তবে চট্টগ্রামে হয়েছে পুনর্জাগরণ, পুনরুজ্জীবন। ১৯৭৮ সালে পুনরায় ঢাবিতে যোগ দেন অধ্যাপক পদে।তারপর প্রেষণে ১৯৮৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি এবং ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।মৃত্যু অবধি তিনি শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
১৯৮৯ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩.৪৫ মিনিটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সাহিত্যকর্ম:
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক। চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতেই বঙ্কিমশরৎ- সাহিত্য পড়ে ফেলেছিলেন। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় রাবেয়া খাতুনের মহিলা বিষয়ক পত্রিকা অঙ্গনায়,শুধু হেনা নামে।তারপর বিরতিহীনভাবে তার কবিতা প্রকাশিত হয় প্রায় সব পত্রিকায়। তিনি পঞ্চাশের দশকের কবি হলেও গ্রন্থ প্রকাশিত হয় দেরিতে- সত্তরের দশকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ’ আপন যৌবন বৈরী(১৯৭৪), দ্বিতীয়টি ‘যেহেতু জন্মান্ধ(১৯৮৪), তৃতীয় ও শেষ’ আক্রান্ত গজল(১৯৮৮),
কবিতায় তিনি আপাদমস্তক রোমান্টিক।আত্মমুখিতা, প্রেম, নারী, ও কবি ও কবিতা তাঁর প্রিয় বিষয়। শব্দ ব্যবহারে তিনি মিতবাক, সংযত ও সংহত।একটি নমুনা-
” তোমার ভালোবাসায় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম/
যেমন নিঃঝুম দুপুরে –
সুন্দরীর পায়ের কাছে বেড়াল- সমর্পিত, দ্বিধাহীন ও তৃপ্ত।”
প্রবন্ধ রচনায় তিনি সুতীক্ষ্ণ সমালোচনা বৃত্তির অধিকারী।তাঁর সমালোচনা প্রতিভার অভ্রান্ত স্বাক্ষর বহন করে তাঁর ‘শিল্পীর রূপান্তর(১৯৭৫), ও ‘ কথা ও কবিতা(১৯৮৪) প্রবন্ধগ্রন্থদ্বয়।অনুবাদ করেছেন অ্যান টেরি হেয়াইটের ‘ জর্জ ওয়াশিংটন কার্ভার।
সম্পাদিত গ্রন্থ তিনটি-
১.পূর্ব বাংলার কবিতা(মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর সাথে)
২. কলিকাতা কমলালয়: ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
৩. বাংলাদেশের সাহিত্য।
আবু হেনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য তিনি অসামান্য কথক ও উপস্থাপক। কথা বলার এক নিপুণ কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন। প্রচুর বলতেন। কিন্তু বাজে বকতেন না।সুনির্বাচিত শব্দে,পরিমিত বাক্যে কথা বলতেন। বৈঠকী আড্ডায় ছিলেন তুলনাহীন। সর্বত্রই তিনি সমান মনোযোগের সাথে শ্রুত হতেন। এমনই ছিলো তার সম্মোহন শক্তি।

পরচর্চাও যে এমন শিল্পিত ও উপভোগ্য হতে পারে তার সাক্ষ্য আড্ডার স্মৃতিগুলো। উপস্থাপক হিসেবে তিনি অননুকরণীয়।১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁর রেডিওতে প্রচারিত ‘শাস্ত্রের কথা’ শুনবার জন্য মানুষ চায়ের ও পানের দোকানে ভিড় করতো। বাংলাদেশ টেলিনভিশনের সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠান’ উত্তরণ’ ও সংগীতানুষ্ঠান ‘ আমার যত গান’ কালশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

অধ্যাপনাটাকে তিনি শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন।তাঁকে ‘অধ্যাপনা শিল্পের বরপুত্র’ বলা হয়। তিনি যখন কলাভবনে ক্লাস নিতেন বাকি দুটি ফ্যাকালটি প্রায় ফাঁকা হয়ে যেত।
আবু হেনার আরেক পরিচয় তিনি গায়ক ও অনবদ্য গীতরচয়িতা।বাংলাদেশের গানের স্বর্ণযুগ রচনায় তাঁর অবদান সর্বাগ্রে বিবেচ্য।প্রায় দুহাজারের অধিক গান লিখেছেন। ‘সাগরের নীল’ গীতগ্রন্থে মুদ্রিত আছে শদুয়েক গান।তাঁর গান সংযত,নির্ভার ও গীতল।একটি গান তো ইতিহাসের অংশ।১৯৬৪ সালে ২৫ ডিসেম্বর বিটিভির যাত্রা শুরু। উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত হয় তাঁর লেখা ‘ঐ যে আকাশ নীল হলো আজ/ সে শুধু তোমার প্রেমে।’
তাঁর স্মরণীয় কিছুগান- সেই চম্পা নদীর তীরে,আমি সাগরের নীল,অনেক বৃষ্টি ঝরে,এই পৃথিবীর পান্থশালায়,তুমি যে আমার কবিতা,তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে,শত জনমের স্বপ্ন তুমি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
কবিতা,প্রবন্ধ,গান,উপস্থাপনাসহ সাহিত্যের নানা শাখায় তিনি অসাধারণ স্বাক্ষর রেখে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে লোকান্তির হন।
পূর্ণ বিকশিত হওয়ার আগে তাঁর এই অসময়োচিত চলে যাওয়া এক অসমাপ্ত কবিতার মতো হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস ছড়াচ্ছে পাঠক ও বাংলা সাহিত্যে।


আবু মুসা মোহাম্মদ মামুন : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ। হাটহাজারী সরকারী কলেজ, চট্টগ্রাম।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন