পুনঃপাঠ


রাজনীতি যখন সমাজকে চালায়


আহমদ ছফা।। পুবাকাশ


[আহমদ ছফা (৩০জুন১৯৪৩ -২৮ জুলাই২০০১) আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলে এক আপন সৌকর্যে উচ্চারিত নাম। মতামত ও চিন্তায় যিনি সতত ঔচিত্যবোধে জাগ্রত। আজ তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যু’র একবছর আগে লেখা তাঁর সমাজবীক্ষণ মতামতটি পুবাকাশ পাঠকের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক বলে নিবেদন হলো। সম্পাদক ]

বুদ্ধিবৃত্তির একটা নিজস্ব শক্তি ও সৌন্দর্য আছে। এ শক্তি এবং সৌন্দর্যের কারণেই কিছুসংখ্যক মানুষ সমাজে শ্রদ্ধার আসন অধিকার করে থাকেন। সাধারণ মানুষ মনে
করেন এ সমস্ত মানুষেরা যা বলেন, যা করেন তার মধ্যে অবশ্যই মানুষের জন্যে কল্যাণকর কিছু নিহিত রয়েছে। এ সকল কারণে কবি, লেখক, নাট্যকার, দার্শনিক
এবং বিজ্ঞানীদের প্রতি সাধারণ মানুষদের একটা শ্রদ্ধার ভাব পােষণ করতে লক্ষ্য করা যায়।

অনেক সময় সাধারণ মানুষ সাহিত্য পাঠ করতে পারেন না। কবিতার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য উপলব্ধি করা তাদের ক্ষমতার বাইরে থেকে যায়। দর্শনের জটিলতার মধ্যে প্রবেশ করার সুযােগ সাধারণ মানুষের ঘটে না। বিজ্ঞান তাে অধিকতর দুরূহ বিষয়, অনেক সময় সাধারণ মানুষ বৈজ্ঞানিক সত্য অনুধাবন করতে পারেন না। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মনে এই ধরনের মানুষদের প্রতি একটা অচল আস্থার ভাব সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ সমস্ত মানুষ যখন কিছু বলেন, তারা সেটা আগ্রহসহকারে শােনার চেষ্টা করেন। যখন কোন বিষয়ে কোনরকম সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন সেটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে থাকেন।

এই ধরনের মানুষদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে একটা আস্থার ভাব সৃষ্টি হয়, তার কারণ এই সমস্ত মানুষদের চিন্তা, কল্পনা ব্যক্তিগত স্বার্থ চিন্তা থেকে যেমন মুক্ত, তেমনি কোন রকম শঙ্কা বা ভীতির কারণে তারা নিজেদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন না। যে সকল মানুষ নিজেদের অন্তঃস্থ শক্তি, সৌন্দর্যবােধ এবং সততার কারণে একেকটি সমুন্নত অবস্থানে আরােহণ করতে সক্ষম হন, মানুষের দৃষ্টি স্বভাবতই তাঁদের প্রতি ধাবিত হয়। মানুষ তাদের মতামত পরামর্শ এমন কি আশঙ্কা এবং হুঁশিয়ারি এগুলােকেও সমান মূল্য দিয়ে গ্রহণ করে থাকেন। একটি সমাজে এই ধরনের মানুষের সংখ্যা যত অধিক হয়, ততই সমাজের মঙ্গল।

পৃথিবীতে এমন কোন সমাজ নেই, যে সমাজে রাজনীতি কর্তৃত্ব করে না। অধিকাংশ সময়েই রাজনীতি মানুষের কাছে চরম আনুগত্য দাবি করে থাকে। অনুগত লােক না হলে রাজনীতির চলে না। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, টিকে থাকার জন্য তাকে একদল লােকের অন্ধ আনুগত্যের ওপর পুরােপুরি নির্ভর করতে হয়। যে দল
বিনা ক্ষমতায় যেতে চায়, তাদেরও একদল অনুগত লােক দরকার। বিনা প্রশ্নে, তর্কে দলীয় নির্দেশ পালন করা তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
মূলত রাজনীতিকে ক্ষমতার ক্রীড়াক্ষেত্র বললে অধিক বলা হয় না। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কহীন যে রাজনীতি সেটা আসলে রাজনীতি নয়।

কিন্তু রাজনীতি যখন নিছক ক্ষমতার ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হয়, মানসিক মূল্যবােধগুলাের দুর্দশার অন্ত থাকে না। শক্তিমানেরা যা বলেন, যা উচ্চারণ করেন, সেগুলাে অন্য সবাইকে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে মান্য করতে বাধ্য করা হয়। রাজনীতি যেহেতু রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে, কিছুদূর পর্যন্ত রাজনীতির প্রতি আনুগত্য পােষণ করা লােক- সাধারণের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। কিছুদূর মানে কতদূর? সমাজ যখন রাজনীতিকে চালায় তখন রাজনীতি সুস্থ থাকে। কিন্তু রাজনীতি যদি সমাজের চালক হয়ে বসে সমাজ অসুস্থ এবং বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে। সুতরাং এই ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশ ভয়ংকর রকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।

রাজনীতি সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিয়ন্ত্রণ করতে আরম্ভ করলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে কোন সুযােগ সেখানে থাকে না। একজন ভাল কবি হওয়া, একজন ভাল দার্শনিক হওয়া, একজন মেধাবী চিত্রকর কিংবা প্রতিভাশালী বৈজ্ঞানিক হওয়া, এগুলাে এক ধরনের ব্যক্তিত্বের বিকাশ। সমাজে যখন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রবলভাবে চেপে বসে, মানুষের মৌলিক বৃত্তিসমূহের প্রকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যেতে আরম্ভ করে। মানুষের অপকৃষ্ট বৃত্তিসমূহ এমনভাবে প্রকাশ পেতে আরম্ভ করে মানবসমাজ আর মানুষের সমাজ থাকে না, পশুর সমাজে রূপান্তরিত হয়।

আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই আমরা এই চিত্রই দেখতে পাই। প্রতিদিন খুন হচ্ছে, লুঠ হচ্ছে, হাইজ্যাক হচ্ছে, ডাকাতি হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছে, সরকারি অফিসে
দুর্নীতি হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি করছে, আমলারা ঘুষ খাচ্ছে, রাজনীতিবিদেরা নিজেদের আখের গুছাবার চেষ্টায় ব্যস্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ সন্ত্রাসী তৈরির
কারখানাতে পরিণত হচ্ছে এই সামাজিক অপরাধগুলাে চলমান রাজনীতি থেকেই জন্ম নিচ্ছে। রাজনীতির মধ্য থেকেই সমস্ত অসুস্থতার বীজ সমাজের শরীরে সংক্রমিত হচ্ছে। যত ধরনের পাশবিক প্রবৃত্তি থাকতে পারে, তার সবগুলাে রাজনীতির প্রশ্রয়ে বিকাশ লাভ করছে, রাজনীতিই তার সবগুলােকে লালন-পালন করছে।

আমাদের সমাজে লেখক, কবি, নাট্যকার এবং শিল্পী হিসেবে যে সমস্ত ব্যক্তি সুপরিচিত, তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ভাবটি আর অবশিষ্ট নেই। এক
সময়ে সাধারণ মানুষ যে সমস্ত ব্যক্তিকে চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন, এখন সাধারণ মানুষের চোখে তাদের সে ভাবমূর্তিটি আর অটুট নেই। তাদের অনেকেই সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কথায়ই উঠবস করেন। সরকার যা বলে সেটা সমর্থন করেন। অনেকের অধঃপতন এতদূর গিয়ে ঠেকেছে যে, সাধারণ লােকের চোখে দলীয় ক্যাডারের ভূমিকার চাইতে তাদের ভূমিকা আলাদা নয়।

এটা এমন এক ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি, মানব-চরিত্রের অন্তর্নিহিত সততা এবং সৌন্দর্যবােধ সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এই যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হল সেটা থেকে পরিত্রাণের আশু কোন পন্থা আছে সেটা দৃষ্টিগােচর নয়। এই সরকার হয়ত ক্ষমতায় থাকবে না। পরবর্তী যে সরকার আসবে, সে সরকারের আমলেও মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের কোন অনুকূল ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে তেমন প্রত্যাশা করার কোন উপায় নেই। আমাদেরকে ক্রমাগত আগুন থেকে খােলায় এবং ভােলা থেকে আগুনে লাফ দিতে হচ্ছে, এই লাফ দেয়া পরিশ্রমটাই সার। পরিস্থিতির পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই।

আমরা সরকার পরিবর্তন করতে পারি, কিন্তু রাজনীতির ধরন-ধারণ পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। সরকার পরিবর্তন করে রাজনীতির অসুস্থতা দূর করা সম্ভব নয়, বরং রাজনীতিটাই পরিবর্তন করা প্রয়ােজন।

২৫.৯.২০০০

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন