গোলাম কিবরিয়া পিনু’র একগুচ্ছ কবিতা 

অন্তর্বাস

 
জীবন অনেক সময়ে রূঢ় হয়ে ওঠে, আশীর্বাদ কোনো
কাজে লাগে না, প্রতিশ্রুতিতেও বিশ্বাস থাকে না,
বিজ্ঞাপনগুলো অক্ষরহীন হয়ে পড়ে, লাগে টাকা ও
পয়সা, এমন রিয়েলিটি অর্থবহ হয়ে ওঠে, মূল্যবান হয়ে
ওঠে; শেষতক জীবনের অর্থ পালটে যায়-গিরগিটির 
রঙ পাল্টানোর মতন! মাথার উপর থাকা মাতব্বরও 
কোনো কাজে লাগে না, তখন জীবনও বলে-জামাটা
পাল্টাও, অন্তর্বাসও!
 

নির্যাস

সব ধরনের সুগন্ধির চেয়ে-এখন টাকার
গন্ধ মানুষের প্রিয়! টাকাতে যে সুগন্ধ আছে.
তা আর কোথাও নেই! সুগন্ধ যা দিয়ে তৈরি
হয়, ধরো–গোলাপের নির্যাস, সেই 
নির্যাসের চেয়েও অতিমাত্রায় পাগলকরা
নির্যাস টাকায়, যা গভীর আসক্তির কারণ
হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে হৃদবিকল হওযার
কথা জানার পরও-ভয়াবহ রকম আসক্তিতে
আমরা অনেকে পাগলপ্রায়! পাগল হলেও
পাগলাগারদে থাকতে হচ্ছে না, সে-কারণে
তা আরও ভয়াবহ!

কালঘুম

 
কীভাবে টিস্যুর পচন থামানো যায়, সেইদিকে
কারো নজর নেই, গ্যাংগ্রিনের ভয়ে 
হাত ও পা কেটে ফেলতে হচ্ছে, চেতনানাশক 
ক্লোরোফর্ম ও মরফিন দিয়ে শুধুই অচেতন 
করে রেখে–এই পচন থামানো যাবে না!
পাঁচজন মিলে ধর্ষণ–তার পর আঘাতের 
ক্ষত, মুখে টেপ দিয়ে নির্যাতন, অবুঝ শিশুও 
রেহাই  পাচ্ছে না–মসজিদে, স্কুলে, বাসে 
ও বাসায়, রক্তাক্ত শরীর! এত সংক্রমণ–এত 
গ্যাংগ্রিন; এন্টিবায়োটিক যাদের হাতে 
থাকার কথা, তারাও কি কালঘুমে?
 

ছোটগ্রাম

গ্রামবাসীরাও ভাগ হয়ে গেল, একটা ছোটগ্রাম, কয়টা
বা বসত ঘর, কতজন আর মানুষ, একটা শান্ত
নদীর অববাহিকায় থেকেও একসাথে ফসলের 
জমিতে জলসেচ করতে পারল না! একটি কৃষিখামারও 
তৈরি করতে পারল না, হাসপাতালের কথা বাদই 
দিলাম! এতটা বিভেদ, এতটা বিরোধ, এতটা 
হিংসাআশ্রিত জীবন নিয়ে একটা কাঁচাসড়কও তৈরি 
করা গেল না;  যে সড়কে পা রেখে শিশুরা অন্তত 
নদীর জলে সাঁতার শিখবে!

স্পর্শকাতরতা

 
আজকাল দাঁতের ফাঁকেও কিছু একটা আটকে থাকলে
আর সহ্য হয় না!
                বেশ অস্বস্তি লাগে!
স্পর্শকাতরতায় অস্থির হয়ে পড়ি!
যা তা  কোনোকিছুকে স্থান দিতে পারি না এখন!
মাঢ়িও মাড়ির খপ্পরে পড়ে থাক-তা তো চাই না!
 
জাউ আটকে থাকে না-তরলেও না!
মাছও না-সবজিও না!
নিষিদ্ধ মাংস খেলেই ঝামেলা!
 
পাকস্থলির জিনিস দাঁতের গোড়ায় ও ফাঁকে আটকে থাকুক
তা তো সমীচীন নয়-
               তাতে দাঁতেরও ক্ষয়!
যতটুকু পারি দাঁত পরিষ্কার রাখি
সব কিছুই চিবুতে চাই না–গিলতে চাই না!

গোলাম কিবরিয়া পিনু :
কবি। প্রবন্ধ,ছড়া ও অন্যান্য লেখাও লিখে থাকেন।গবেষণামূলক কাজেও যুক্ত। জন্ম ১৬ চৈত্র ১৩৬২ : ৩০মার্চ ১৯৫৬ গাইবান্ধায়। গাইবান্ধা শহরে মূলত  শৈশব-কৈশোর কেটেছে। পড়েছেন গাইবান্ধা শহরের মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, এর পর মাধ্যমিক-গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে, এর পর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ হয়ে রাজশাহী  বিশ্ববিদ্যালয়।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা : স্নাতক সম্মান (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) এবং স্নাতকোত্তর; পিএইচ.ডি. । কবিতা-ছড়া-প্রবন্ধ ও গবেষণা মিলে ২৬টি গ্রন্থ বের 
হয়েছে–বাংলা একাডেমি,বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। কবিতা ছাপা হয়েছে অনেক।ছাপা হয়েছে সকল উল্লেখযোগ্য পত্রিকা-সাময়িকীতে এবং উল্লেখযোগ্য সম্পাদকের হাত দিয়েই
একটি আর্ন্তজাতিক মিডিয়া বিষয়ক সংস্থা ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’-এর  সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন। এর আগে এফপিএবিতে উপপরিচালক (এডভোকেসি), ফোকাল পয়েন্ট ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।এছাড়া এফপিএবি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘সুখী পরিবার’-এর সম্পাদক হিসেবে ১৯৮৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।বিসিসিপি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও যুক্ত ছিলেন।পেশাগতভাবে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, কলামলেখা, সম্পাদনা ও এডভোকেসি বিষয়ক কর্মকাণ্ডেও  যুক্ত থেকেছেন। 
প্রকাশিত গ্রন্থ
১. এখন সাইরেন বাজানোর সময় (কবিতা), ১৯৮৪
২. খাজনা দিলাম রক্তপাতে (ছড়া), ১৯৮৬
৩. সোনামুখ স্বাধীনতা (কবিতা), ১৯৮৯
৪. পোট্রেট কবিতা (কবিতা), ১৯৯০
৫. ঝুমঝুমি (ছড়া), ১৯৯৪
৬. সূর্য পুড়ে গেল (কবিতা), ১৯৯৫
৭. জামাতের মসজিদ টার্গেট ও বাউরী বাতাস (প্রবন্ধ), ১৯৯৫
৮. কে কাকে পৌঁছে দেবে দিনাজপুরে (কবিতা), ১৯৯৭
৯. এক কান থেকে পাঁচকান (ছড়া), ১৯৯৮
১০. দৌলতননেছা খাতুন (প্রবন্ধ), ১৯৯৯
১১. আমরা জোংরাখোটা (কবিতা), ২০০১
১২. সুধাসমুদ্র (কবিতা), ২০০৮
১৩. আমি আমার পতাকাবাহী (কবিতা), ২০০৯
১৪. মুক্তিযুদ্ধের ছড়া ও কবিতা (ছড়া ও কবিতা), ২০১০
১৫. বাংলা কথাসাহিত্য :
নির্বাচিত মুসলিম নারী লেখক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (গবেষণা), ২০১০
১৬. ও বৃষ্টিধারা ও বারিপাত (কবিতা),২০১১
১৭. ফসিলফুয়েল হয়ে জ্বলি (কবিতা),২০১১ 
১৮. মুক্তিযুদ্ধের কবিতা (কবিতা),২০১২
১৯. ফুসলানো অন্ধকার (কবিতা),২০১৪
২০. উদরপূর্তিতে নদীও মরে যাচ্ছে(কবিতা),২০১৪
২১. নিরঙ্কুশ ভালোবাসা বলে কিছু নেই(কবিতা), ২০১৫
২২. ছুঁ মন্তর ছুঁ (ছড়া),২০১৬
২৩. কবন্ধ পুতুল নাচে (কবিতা),২০১৬
২৪. ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো (কবিতা),২০১৮
২৫. সমকালীন কবিতা ও বোধের দিগন্ত(প্রবন্ধ), ২০১৮
২৬.উনিশ বিশ মতকের নারী লেখক ও আত্মশক্তির বিকাশ(প্রবন্ধ),২০১৯
সম্মাননা/পুরস্কার :রংপুর তথ্য কেন্দ্র পুরস্কার (প্রবন্ধ, ১৯৭৪)
বাংলাদেশ পরিষদ-রাজশাহী বিভাগীয় পুরস্কার (বক্তৃতা, ১৯৭৪)
গাইবান্ধা কলেজ ছাত্র সংসদ পুরস্কার ( প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, ১৯৭৪)
আমরা ক’জনা বিদ্রোহী সূর্যকণা পুরস্কার (১৯৭৫)
গাইবান্ধা তথ্যকেন্দ্র পুরস্কার (প্রবন্ধ, ১৯৭৬ ও ১৯৭৭)
জাতীয় শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক উৎসব-গাইবান্ধা পুরস্কার (কবিতা ও অন্যান্য ১৯৭৭)
বিতর্ক অঙ্গন-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কার (১৯৭৮)
মাদার বখশ ছাত্রাবাস-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কার (প্রবন্ধ,১৯৮১)
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সম্মাননা-কবিতা, ১৯৮৫
বাংলা কবিতা উৎসব সম্মাননা কোলকাতা, হলদিয়া, ভারত, ১৯৮৮
‘বাংলার মুখ’ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উৎসব সম্মাননা, বালুরঘাট, পশ্চিমবঙ্গ, ১৯৯৭
সৌহার্দ্য’৭০ সম্মাননা, কোলকাতা, ২০০৩
অনিরুদ্ধ’ ৮০ সম্মাননা, কোলকাতা, ২০০৩
বিন্দুবিসর্গ সম্মাননা, ২০০৩
দীপালোক বিজয় দিবস সম্মাননা পদক,কবিতা-২০০৬
লোকসখা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, কোলকাতা কর্তৃক লোকসখা সম্মাননা ২০০৮
উইমেন ডেলিভার আমেরিকা-এর ফেলোশিপ অর্জন ২০১০ 
বন্ধু পরিষদ গাইবান্ধা সম্মাননা ২০১০
এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার 

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন