শ্রদ্ধার্ঘ্য
প্রফেসর মোহাম্মদ আলী: তাঁর ব্যক্তিত্ব সৌকর্যের ছায়াতলে
আমীরুল ইসলাম।। পুবাকাশ
আজও প্রফেসর দম্পতি কবিকে পৌঁছে দিলেন ডেরায়। সম্পর্কের প্রগাঢ় উষ্ণতা থেকে কবি তাঁর প্রকাশিতব্য কাব্য ‘দোয়েল ও দয়িতা’ উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন আমাদের। কাব্যটি উৎসর্গ করা হবে প্রফেসর মোহাম্মদ আলী ও প্রফেসর খালেদা হানুমকে। এই দম্পতিই কি তাহলে কবির দোয়েল ও দয়িতা? উল্লেখ্য ১৯৯৭ এর ফেব্রুয়ারীতে সংস্কৃতি কেন্দ্র কবি আল মাহমুদের এই গুরুত্বপূর্ণ কাব্যটি প্রকাশ করে।
১.
কিছু কিছু ব্যক্তিত্ববান মানুষের সান্নিধ্য সবসময়ই অনেক আকাঙ্ক্ষিত। তাদের বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান-গরিমা ও সুকীর্তি স্বাভাবিকভাবে অন্যদের আকর্ষণ করে। প্রফেসর মোহাম্মদ আলী আমার কাছে তেমন মোহনীয় এক ব্যক্তিত্ব। চোখ বন্ধ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে ক’জন ব্যক্তিত্ববান মানুষের চেহারা মানসপটে ভেসে ওঠে, তিনি তাদের অন্যতম। ২৪ জুন ২০২১ বৃহস্পতিবার ৮৮ বছর বয়সে প্রিয় মানুষটি অনন্তের পথে যাত্রা করলেন। আষাঢ়ের সন্ধ্যায় অকস্মাৎ তার মৃত্যু সংবাদ অনেকের মতো আমাকেও শোকস্তব্ধ করে। মনে হলো, মাথার উপরে ছায়াদানকারী সবচেয়ে বড় বটবৃক্ষের ছায়া হঠাৎ সরে গেল। কবি ফররুখ আহমদের কবিতার লাইন মনে পড়লো তৎক্ষণাৎ–
আমার হৃদয় স্তব্ধ, বোবা হয়ে আছে বেদনায়
যেমন পদ্মের কুঁড়ি নিরুত্তর থাকে হিম রাতে
যেমন নিঃসঙ্গ পাখি একা আর ফেরেনা বাসাতে
….. (ক্লান্তি: মুহূর্তের কবিতা)
কবিতাটির কথা মনে আসার মূল কারণ হলো এটি প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর হাতে অনূদিত হয়। আমার সম্পাদিত ফররুখ স্মৃতি স্মারক ‘তবে পাল খোলো’তে ENNUI শিরোনামে এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৩ সালে।
By heart is steel dumb with grief
Like the lotus bud shrunken on a wintry night
Like the lonesome bird that wings not back to its nest….
শুধু কবিতাটির কথা নয়, স্যারের সাথে অন্তরঙ্গ স্মৃতির অনেক কথা একে একে ভেসে উঠছে মনের পর্দায়। স্বাভাবিক কাজকর্মের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যৌবন বয়সের সেইসব নানা উপাখ্যান।
২.
খ্যাতিমান প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের কথা শুনেছি ১৯৭৭-এ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই, ইংরেজী বিভাগের কতিপয় সিনিয়র ছাত্রের মুখে। ওই বিভাগের ক’জন সহপাঠী এবং সিনিয়র-জুনিয়র ছাত্রের সাথেও খাতির ছিল। বন্ধুত্বের আহ্বান ও সাহিত্যপ্রীতির দুর্মর আকর্ষণে সুযোগ পেলেই বাংলা-ইংরেজী বিভাগের করিডোরে হেঁটে আসতাম। কখনো এমন দেখেছি, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী বিভাগের বারান্দা দিয়ে ঋজু ভঙ্গিতে হাঁটছেন, ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে সমীহ করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। গৌরবর্ণের লম্বা মানুষ, সুগঠিত স্বাস্থ্য,পরিপাটি দীর্ঘ চুল, মানানসই বেশভূষা, হাস্যোজ্জ্বল মুখ– সবকিছু মিলিয়ে যেন এক বয়স্ক রাজপুত্র। জানতে পারলাম, বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা তার কাছ থেকে সরাসরি পাঠ নিতেও ভীষণ আগ্রহী।
স্যার ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সভাপতি। আমাদের পড়াকালীন (১৯৭৭–৮৩) বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার, ডীন ইত্যাদি পদও তিনি অলংকৃত করেন। এমন একজন সিনিয়র প্রফেসরের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সহজ নয়। ইংরেজি বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ছিলেন স্যারের সরাসরি ছাত্র ও একান্ত স্নেহভাজন। বিভাগের দু’জন খ্যাতিমান ছাত্র মীযানুল করীম ও চৌধুরী গোলাম মাওলা ছিলেন স্যারের ঘনিষ্ঠ। আবার এই তিন জনের সাথে ছিল আমার খাতির। চৌধুরী গোলাম মাওলা ছিলেন ‘তবে পাল খোলো’র সহযোগী সম্পাদক। বাকি দু’জন স্মারকটিতে লিখেছেন। স্যারের কাছাকাছি পৌঁছা কষ্টসাধ্য হলেও তাদের সুবাদে বারবার চেষ্টা করে অনুবাদ কর্মটি শেষ পর্যন্ত হাতে পাই।
পরবর্তীতে জানতে পারি স্মারকটি স্যারের পছন্দ হয়েছে। এইভাবে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা শুরু।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে স্যারের মিসেস প্রফেসর ড. খালেদা হানুমের সাথেও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় আমাদের। অধ্যাপকদ্বয়ের দাম্পত্য রসায়ন ছিল চোখে পড়ার মতো। অধিকাংশ সময়ে তাঁরা থাকতেন পরস্পরের ছায়াসঙ্গী হয়ে। তাঁদের সুদৃষ্টিতে পড়ে ক্রমে ক্রমে আমরা স্নেহভাজন দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ি। ছোট্ট একটি ঘটনা মনে পড়ছে। আশি দশকের গোড়ায় মা’কে নিয়ে ঢাকা গিয়েছি ন্যাশনাল প্রফেসর ডা.নুরুল ইসলাম সাহেবের চিকিৎসা নিতে। ওখানে হঠাৎওখানে হঠাৎ প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের সাথে দেখা। তিনি অনেক আন্তরিকতার সাথে আমাদের কুশলাদি জেনে নিলেন। জানতে পারলাম, প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম স্যারের ভগ্নিপতি। সেই থেকে স্যারের প্রতি বিশেষ অনুরাগ মনে স্থায়ী আসন করে নিল।
৩.
বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার আরো অনেক সম্মানিত ও প্রিয় স্যার ছিলেন। কিন্তু ‘স্যার’ বলতে কেন জানি আমরা প্রফেসর মোহাম্মদ আলীকে বুঝে নিতাম। এমনকি স্যারের ব্যক্তি নামটি উচ্চারণ করলেই ‘প্রফেসর’ শব্দটি অটোমেটিক চলে আসত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর পর স্যারের সাথে যোগাযোগ কমে গেলেও কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এসময় বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে চট্টগ্রামে এই ঘরানার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করতাম। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর এর সাথে যুক্ত হন তেজস্বী সাহিত্যকর্মী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। স্যারের পরিবারের সাথে নাসির পরিবারের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রতীক’ এ কবি ফররুখ আহমদের বিখ্যাত কবিতা ‘ডাহুক’ এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপেন। “The Dahuk” শিরোনামে কবিতাটির অনুবাদ করেন প্রফেসর মোহাম্মদ আলী। অনুবাদ কর্ম টির পেছনে রয়েছে একটি মুখরোচক গল্প। নাসির উদ্দিন তখন চট্টগ্রাম মেডিকেলের ছাত্র। অনুবাদ কর্মটি সংগ্রহ করতে তিনি নাকি চৌদ্দবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্যারের সাথে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি জেনে স্যার অবশেষে বলেই ফেললেন, ‘অনুবাদের কাজটি শেষ করা এখন আমার অনিবার্য দায়িত্ব হয়ে গেল।’ এই অসাধারণ অনুবাদটি পরবর্তীতে পুনর্মুদ্রণ করা হয় সংস্কৃতি কেন্দ্রের লিটল ম্যাগাজিন ‘নোঙর’ এর প্রথম সংখ্যায়।
১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র জাতীয় পর্যায়ে কৃতি সাহিত্য-সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বকে পুরস্কৃত করতে প্রবর্তন করে ‘ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার।’ পুরস্কার কমিটির সভাপতি হিসেবে খোঁজা হচ্ছিল সর্বগ্রহণযোগ্য একজন জাতীয় ব্যক্তিত্বের, যিনি চট্টগ্রামেই অবস্থান করেন। প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের নাম এক বাক্যে উদ্যোক্তাদের পছন্দের। স্যারকে পাওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু স্যার নিরাশ করেন নি আমাদের। পূর্ব সম্পর্কের সূত্রে মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও আমি স্যারের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাঁর সম্মতি পাই। বস্তুত এটি ছিল আমাদের জন্য আনন্দ সংবাদ এবং বিশাল প্রাপ্তি। পরবর্তী প্রায় দশ-এগারো বছর স্যার ‘ফররুখ স্মৃতি পুরস্কারকমিটি’র সভাপতির হিসেবে পদ অলংকৃত করেন। কিছুটা অনিয়মিত হলেও যে ক’টি পুরস্কার নির্বাচন ও প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন তা ছিল আমাদের জন্য মহার্ঘ। এছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগেও তাঁর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করি। শ্রেণিকক্ষে সরাসরি স্যারের ছাত্র হতে না পারলেও বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি আড্ডা-অনুষ্ঠানে তাঁর জ্ঞান চর্চা ও ব্যক্তিত্বের যে দ্যূতি দেখি তা আমাদেরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেইসব অবিস্মরণীয় মূল্যবান কথামালা ও স্মৃতিগুলো শেয়ার করার লোভ সামলানো সহজ ব্যাপার নয়।
৪.
১৯৯৫ সালে ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন কবি আল মাহমুদ। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করবেন। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের উপস্থিতি অনেক কাম্য ছিল। আগের দু’টি পুরস্কার অনুষ্ঠানে তাঁকে পাই নি। স্যার পড়তে পারলেন আমাদের মনোবাসনা। তিনি সম্মতি দিলেন। এই সম্মতি আদায়ের জন্য মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ জাকির হোসাইন ও আমি সহ অনেকেই সময় ব্যয় করেছি। পুরস্কার অনুষ্ঠান ছিল শীতের সন্ধ্যায়। ঢাকা-চট্টগ্রামের অনেক বিদগ্ধজনের উপস্থিতিতে সেদিনের চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের অনুষ্ঠান হয়েছিল বর্ণাঢ্য, সুবাসিত ও আলোকোজ্জ্বল । অতিথিদের বক্তব্য ছিল শ্রোতার মননের তৃষ্ণা নিবারণকারী। বিশেষত প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের বক্তব্য ছিল অন্তর্ভেদী। স্যারের মূল্যবান বক্তব্যের অংশবিশেষ–
“আল মাহমুদ একজন বহুল-পঠিত ও বহুল আলোচিত কবি। বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, নদী, বৃক্ষ, মানব-মানবী, তাঁর বিশ্বাস ও অধ্যাত্ম অনুসন্ধান, সামাজিক অবস্থান, লোকজ ঐতিহ্য, সমকালীন রাজনীতি– এ সবকে অবলম্বন করেই নির্মিত হয়েছে তাঁর কবিতার অবয়ব। তিনি জসীমউদ্দীনের মত পল্লী কবি নন,– বরঞ্চ তাঁর সাযুজ্য রয়েছে ইংরেজ কবি ইয়েটসের সঙ্গে,আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে। এঁদের মত আল মাহমুদও অনাগরিক আধুনিক কবি। আল মাহমুদ আধুনিক তাঁর নিজস্ব ভাষাশৈলী গঠনে, তিনি আধুনিক উপমা উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারে, নাটকীয় রহস্যময়তা সৃষ্টিতে।”
বলাবাহুল্য, সম্মানিত মেহমান ও সমঝদার শ্রোতার উপস্থিতিতে সেদিনের সামগ্রিক অনুষ্ঠান আনন্দঘন ও উৎসাহ ব্যঞ্জক হয়ে উঠেছিল। পুরস্কার অনুষ্ঠান শেষে ডিনারেও মেহমানরা উপস্থিত ছিলেন গভীর রাত পর্যন্ত। ডিনারে খোশ আলাপের ফাঁকে স্যার ইঙ্গিত করলেন যেন একদিন পর সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় কবি আল মাহমুদের সাথে আমরা তিনজন চায়ের দাওয়াতে উপস্থিত থাকি। তিনজন মানে মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ জাকির হোসাইন ও আমি। একদিন পর কবিকে নিয়ে স্যারের বাসায় পৌঁছুতে খানিকটা দেরিই হয়ে গেল। প্রবীণ শিক্ষাবিদ দম্পতির উৎকণ্ঠিত চেহারা দেখেই বুঝেছি কতটা উদগ্রীব ছিলেন তাঁরা। অপেক্ষার পর্ব শেষ, জমে উঠলো আলাপচারিতা। প্রজ্ঞাবানদের দুর্লভ সম্মিলনে সমকালীন বাংলা সাহিত্য, সাহিত্যাঙ্গনের চালচিত্র, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সহ বিশ্ব সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ উঠে এলো তাঁদের মেধাবী উচ্চারণে। কবি ও মেজবান দম্পতির আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব রেকর্ড করা হলো। পরবর্তীতে এর অবিকৃত রূপ ‘নোঙর’ নবম সংখ্যায় উপস্থাপন করা হয় পাঠকদের জন্য। অধ্যাপক দম্পতি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল মাহমুদের স্বকন্ঠ আবৃত্তি রেকর্ড করতে চাইলে কবি অনেকগুলো কবিতা পড়লেন। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কিছু স্থিরচিত্রও ধারণ করা হলো। এরপর সবার ডিনারের দাওয়াত স্যারের প্রতিবেশী সৈয়দ জাকির হোসাইনের বাসায়। ডিনার ও আড্ডা শেষ হতে হতে গভীর রাত। ড্রাইভারকে ঘুম থেকে জাগালেন স্যার এবং মেহমানদের যথাস্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন। ভদ্রতাজ্ঞানের চমৎকার উদাহরণটি ভুলবার নয়।
এরপর বিভিন্ন প্রয়োজনে স্যারের বাসায় আসা-যাওয়া বাড়তে থাকে। স্নেহের স্বরে স্যার আমাকে ডাকতেন ‘আমীরুল’ বলে। এ সময় স্যার আমাকে উপহার দিলেন তাঁর অনূদিত বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতার বই “Selected Poems”. বইয়ের প্রথম পাতায় লিখে দিলেন– To Amirul, with all good wishes. (স্বাক্ষর: অস্পষ্ট) ২৫.২.৯৬.
স্যারের ড্রয়িং রুমে একটি সাদা-কালো ছবি লটকানো। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে ১৯৭৭-এ জেনেভায় অনুষ্ঠিত UNESCO কনফারেন্সে স্যার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আরেকদিন লক্ষ্য করলাম, ড্রয়িংরুমে নতুন একটি ছবি ঝুলছে। ছবিটির সামনের সারিতে বসা কবি আল মাহমুদ, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী ও প্রফেসর ডঃ খালেদা হানুম আর পেছনের সারিতে আমরা তিনজন দাঁড়ানো। স্নেহমাখা স্বরে ম্যাডাম বললেন– নাসির, জাকির, আমীর– তিনজনের নামের শেষে ‘র’, চমৎকার অনুপ্রাস। মনে হলো,গত শীতের সন্ধ্যায় কবি সহ আমাদের আড্ডা ও আবৃত্তির স্মৃতি প্রফেসর দম্পতির মনেও রেখাপাত করেছে।
চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র ‘চলমান সংস্কৃতির সংকট’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে ১৯৯৬ এর শীতে। প্রধান অতিথি কবি আল মাহমুদ, আলোচক প্রফেসর ড. হাসান মুহাম্মদ, সংস্কৃতিজন জয়নুল আবেদিন আজাদ প্রমুখ। গাম্ভীর্যময় এ অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে প্রথম পছন্দ প্রফেসর মোহাম্মদ আলী। স্যারও রাজি হলেন। অনুষ্ঠান শেষে বাড়তি আকর্ষণ ‘আল মাহমুদ কবিতাসন্ধ্যা।’ বিজ্ঞজনদের আলোচনায় সেদিন নতুন চিন্তার খোরাক পেয়েছিলেন শ্রোতামন্ডলী এবং অবশ্যই কবিতা শোনার আনন্দ। সুন্দর অনুষ্ঠান শেষে মেহমানদের নৈশভোজ চলে অনেক রাত অবধি। সাথে খোশগল্প ও হৃদয়ের লেনদেন। আজও প্রফেসর দম্পতি কবিকে পৌঁছে দিলেন ডেরায়। সম্পর্কের প্রগাঢ় উষ্ণতা থেকে কবি তাঁর প্রকাশিতব্য কাব্য ‘দোয়েল ও দয়িতা’ উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন আমাদের। কাব্যটি উৎসর্গ করা হবে প্রফেসর মোহাম্মদ আলী ও প্রফেসর খালেদা হানুমকে। এই দম্পতিই কি তাহলে কবির দোয়েল ও দয়িতা? উল্লেখ্য ১৯৯৭ এর ফেব্রুয়ারীতে সংস্কৃতি কেন্দ্র কবি আল মাহমুদের এই গুরুত্বপূর্ণ কাব্যটি প্রকাশ করে।
৫.
স্যারের সাথে মিশতে গিয়ে কিছু শিষ্টাচার শেখার সুযোগ হয়েছে। যেমন, পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক আগে থেকে অনুমতি না থাকলে কারো সাথে দেখা করা কিংবা কথা বলা উচিত নয়। একদিন ফোনে স্যারের সাথে আমার কথা হচ্ছিল। এক ভদ্রলোক সেই ফোনে কথা বলতে চাইলে স্যার বেঁকে বসলেন। বললেন, অপর পক্ষ কথা বলবেন কিনা তা আগে জেনে নেওয়াটা শিষ্টাচার। আরেকবার দাওয়াত কার্ড পৌঁছাতে গিয়েছি স্যারের বাসায়। কথাশিল্পী শাহেদ আলী যেবার ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার পাবেন, ১৯৯৭ সালে। দাওয়াতি কার্ডে ব্যবহৃত একটি শব্দ মনোমত হল না তাঁর। শক্ত ভাষায় আমাকে ধরলেন, ‘এটা কী লিখেছ?’ সহসা বুঝে গেলাম,ভুল শব্দ প্রয়োগ হয়েছে। জীবনের জন্য শিক্ষা হয়ে গেল। সেই থেকে শব্দ ব্যবহারে সচেতন হবার চেষ্টা করি সবসময়। পুরস্কার অনুষ্ঠানের কথায় ফিরে আসি। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে সস্ত্রীক ঢাকা থেকে এসেছেন কথাশিল্পী আবু রুশদ। কমিটির সভাপতি হিসেবে মোহাম্মদ আলী স্যার অনুষ্ঠানের আগের রাতে তাদেরকে স্বাগত জানাতে নিজেই সস্ত্রীক উপস্থিত হলেন। পরদিন সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানে সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। অতিথি ও আলোচকদের কথামালা ছিল অনবদ্য। কিন্তু সভাপতি হিসেবে স্যারকে এক আলোচকের দীর্ঘ বক্তব্যের লাগাম ধরতে হলো কৌশলে। সেদিন স্যারের পরিমিত বক্তব্য ছিল তরুণ সাহিত্য কর্মীদের জন্য পথনির্দেশনা। এখনো গুরুত্ববহ তাঁর সেই বক্তব্য থেকে সামান্য উদ্ধৃতি:
“এই সময়ে আমাদের লেখক শিল্পীগন রাজনৈতিক মতাদর্শকে ভিত্তি করে প্রতিদ্বন্দ্বি শিবিরে বিভক্ত। সত্যাশ্রয়ী শিল্প সচেতনতা বা নান্দনিক নিরপেক্ষতা নয়, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ সাহিত্যবিচারের নিরিখে অবনমিত হয়েছে। দ্বান্দ্বিক বিভাজনের এমন ভয়ঙ্কর রূপ বিশেষ করে সাহিত্য ক্ষেত্রে খুব বেশি আমাদের জানা নেই। গভীর জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ সাহিত্য মানুষে মানুষে বৈরিতা নয়, দ্বন্দ্ব নয়– গভীর আত্মীয়তার বন্ধন রচনা করে থাকে। তার পরিবর্তে যদি দেখি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অসূয়া আর বিদ্বেষ সৃষ্টির অবিরাম প্রতিযোগিতা– তাহলে সত্যিই বড় যন্ত্রণা আর হতাশার জন্ম দেয়।”
স্যার আরো বললেন, “আমাদের সাহিত্যে সৃজন যতখানি সরবে আদৃত হয়ে থাকে– সমালোচনা ঠিক ততখানি হয় উদাসীন বা কুন্ঠাগ্রস্থ অথবা পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সাহিত্য অঙ্গনে রাজনীতির প্রবল প্রতাপ, লেখকগণ গোষ্ঠীতে বিভক্ত অথবা যুথবদ্ধ। এ পরিস্থিতিতে যতখানি উত্তাপ সৃষ্টি হচ্ছে সে পরিমাণে আলোক নেহায়েতই কম। ম্যাথু আর্নল্ড এর অবিস্মরণীয় ভাষায়– much heat, but not enough light.”
স্যারের মণিমুক্তাভরা ভাষণগুলো সত্যিই অমূল্য।
৬.
কাজী নজরুল ইসলামের গান পছন্দ করতেন স্যার। একদিন তাঁদের বাসার আড্ডায় হঠাৎ গানের প্রসঙ্গ এলো। গল্প করতে করতে স্যার স্মৃতি রোমন্থন করলেন। বললেন, “ঈদের আগের দিন একবার ট্রেনে করে ঢাকা থেকে ফিরছিলাম। ট্রেনের সাউন্ড সিস্টেমে হঠাৎ সতীনাথের কণ্ঠে বেজে উঠল নজরুলের গান– ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’– মুহূর্তেই মনটা ভাল হয়ে গেল। মনে হল সত্যিই ঈদ এসে গেছে।”
নজরুলের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হলো সংস্কৃতি কেন্দ্রের পক্ষ থেকে, ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে। স্যারের বাসায় গেলাম পরামর্শের জন্য। নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ প্রধান অতিথি থাকবেন। আলোচনার পর ঠিক হলো সভাপতিত্ব করবেন ম্যাডাম প্রফেসর ড.খালেদা হানুম। স্যার যাবেন দর্শক হিসেবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য যুৎসই শিল্পী পাচ্ছিলাম না। স্যারের মন্তব্য– “নজরুলের অনুষ্ঠানে সংগীতের ব্যবস্থা থাকবে না, এ কেমন কথা!” তাঁর বক্তব্য শিরোধার্য। অনেক চেষ্টা করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। অলিয়ঁস ফ্রঁসেজের সেদিনের সন্ধ্যা বেশ আকর্ষণীয় হয়েছিল গুণী আলোচকদের কথামালা ও আবৃত্তিতে। বিশেষত শাহাবুদ্দীন আহমদ বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে নজরুল থেকে চমৎকার গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করে শ্রোতাদের চমকে দিলেন। আকর্ষণীয় এই পর্ব শেষ হতে অনেক সময় লেগে গেল। তখন ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুম। স্যারের সাথে পরামর্শ করলাম সাংস্কৃতিক পর্ব চলবে কিনা। স্যার ‘না’ করলেন। ইতিমধ্যে শ্রোতাদের মনের চাহিদাও অনেকটা মিটেছে।
আরেকদিন নজরুলের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনে র্যালীর আয়োজন হলো। উদ্বোধন করবেন স্যার। সবকিছু প্রস্তুত। গাড়ি থেকে নেমে স্যার হেঁটে আসলেন কিছুদূর। তখন সাউন্ড বক্সে বাজছে কাজী সব্যসাচীর কন্ঠে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’। সে কি গমগম শব্দ আর ওজস্বী কন্ঠের জাদু! মনে হলো, আবৃত্তির ছন্দ ও তালে উপস্থিত মানুষগুলোর সাথে সাথে ওখানকার মাটিও কেঁপে উঠছে। র্যালী উদ্বোধন করে স্যার চলে গেলেন। সুন্দর মুহূর্তটি চিরকালীন হয়ে গেল উপস্থিত নজরুলপ্রেমীদের হৃদয়ে।
বাংলা কিংবা ইংরেজি– নিখুঁত উচ্চারণে স্যারের ভরাট কন্ঠের বক্তৃতা অনায়াসে শ্রোতাদের মরমে পৌঁছে যেতো। ফররুখ পুরস্কার কমিটির প্রস্তুতি সভায় সভাপতি হিসেবে তাঁর মতামতের পর অন্যদের আর কথা বলতে দেখি নি। কমিটির সভা বসতো স্যারের অফিস বা বাসায় কিংবা কোনো রেস্তোরাঁয়। এরকম এক সভা শেষে স্যারের বাসায় কমিটির সদস্য কর্ণেল (অব:) মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনের সাথে তাঁর দীর্ঘক্ষণের ইংরেজি কথোপকথন বাকিরা নিরবে ভীষণ উপভোগ করি।
এরকম এক কমিটি সভায় ১৯৯৯ এর ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার বিজয়ী হন কথাশিল্পী আবু রুশদ। জিয়া স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে পুরস্কার অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর ভাষণ ছিল বরাবরের মত চিত্তাকর্ষক।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আবু রুশদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন– “আমরা জানতাম, war veterans do not multiply– they gradually diminish. কিন্তু কি আশ্চর্য, এদেশে veterans– yes, war veterans– instead of gradually diminishing, they keep on multiplying! এটা একটি অতিপ্রাকৃত দুর্ঘটনা।” এমন বক্তব্য মোহাম্মদ আলী স্যারের মতো সাহসী এবং দৃঢ়চেতা মানুষের মুখে শোভা পায়।
৭.
জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান এর সাথে গভীর সখ্য ছিল মোহাম্মদ আলী স্যারের। ২০০০ সালের দিকে একটি স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম এলে তিনি অবস্থান স্যারের বাসভবনে। এসময় সংস্কৃতি কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কবি মুসতাফা মুনীরুদ্দীন ও আমি স্যারদের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় কিছু সময় কাটানোর সুযোগ পাই। সংস্কৃতি বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করা ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। দুই গুণী ব্যক্তিই আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সেই আলোকোজ্জ্বল আড্ডার রেকর্ডকৃত অংশ পরবর্তীতে সাক্ষাৎকার হিসেবে নোঙর দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার কিংবা আড্ডা– স্যারের মুখনিসৃত কথাগুলো সব সময় স্পষ্টই পেয়েছি। সেসব কথামালা ছিল অনেক বেশি জ্ঞানগর্ভ, তথ্যসমৃদ্ধ এবং চিন্তা উদ্রেককারী– তাতে কোন সন্দেহ নেই। আরও লক্ষণীয়, বিভিন্ন স্থানে কিংবা ফররুখ পুরস্কার অনুষ্ঠানে যতবার বক্তৃতা শুনেছি, এক বক্তৃতার সাথে অন্য বক্তৃতার বিষয় ও মাত্রা ভিন্নরকম, যা অনন্যসাধারণ।
যথারীতি ২০০১ সালে প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটি সভায় ব্যক্তিত্ব নির্ধারিত হলো, যেবার ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার লাভ করলেন প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান। দুর্ভাগ্য, জরুরী কাজে আটকে গিয়ে স্যার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন নি। শ্রোতাবৃন্দও বঞ্চিত হলেন এক জাতীয় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আরেক জাতীয় ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন শোনা থেকে।
প্রফেসর মোহাম্মদ আলী স্যারের সাথে দীর্ঘসময় মেলামেশার অনেকগুলো স্মৃতি থেকে সামান্য কিছু কথা তুলে ধরার প্রয়াসী হলাম। ৮৮ বছরের (১৯৩৪-২০২১) অতি সফল ও বহুবর্ণিল জীবনকে ছোট্ট লেখায় ধারণ করা সম্ভব নয়। মনে পড়লো– শিল্পপতি এ কে খান স্মারকগ্রন্থের ইংরেজি নামকরণ A K Khan In Memoriam করেছিলেন শ্রদ্ধেয় স্যার। নিশ্চয়ই স্যারের শত শত উপযুক্ত অনুসারীরা তাঁর স্মরণে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেবেন, যা প্রজন্মের জন্য শিক্ষনীয় হয়ে থাকবে।
শুধু কষ্ট পাচ্ছি এই ভেবে যে যার কাছ থেকে এত স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি, তিনি আর নেই। বিভিন্ন প্রয়োজনে সুখে-দুঃখে তাঁর কাছে আর পৌঁছুতে পারবো না। কয়েকদিন আগে তাঁর প্রিয় ছাত্র কবি কবি চৌধুরী গোলাম মাওলাকে বলেছিলাম, ‘স্যারের জন্য খারাপ লাগছে, চলুন দেখে আসি।’ গোলাম মাওলার অসুস্থতার কারণে আজ-কাল করতে করতে তা আর হয়নি। সেই কষ্টটাই মনে বেশি কাঁটা দিচ্ছে। মনের এ কষ্টটা হয়ত আরো পীড়া দেবে, যত দিন স্মৃতি জাগরুক থাকবে।
আমীরুল ইসলাম: প্রাবন্ধিক-অনুবাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।
আবেগঘন স্মৃতিচারণ। শ্রদ্ধেয় লেখককে ধন্যবাদ। পুবাকাশের প্রতি কৃতজ্ঞতা।