‘বাংগালী মুসলমানের মন’।। আলমগীর মোহাম্মদ।। পুবাকাশ
বর্তমান সমাজে আত্মসমালোচনা একটা দুর্লভ ব্যাপার। চ্যারিটি, রিলিজিয়ন, এথিইজম, মরালিটি এসব শব্দের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে পার্টস অভ স্পীচ পড়তে গিয়ে। এবস্ট্রাকট নাউন হিসেবে। মানবিক গুণাবলি হিসেবে পরিচয় ঘটে না খুব একটা। যদিও ঘটে সেটা সবার ক্ষেত্রে নয়। সবার ক্ষেত্রে হলেও সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। নজরুলের একটা নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ আছে ‘হিন্দু-মুসলমান’ নামে। নজরুল হিন্দু সমাজকে সমীহ করতেন বেশ। উপরোল্লিখিত প্রবন্ধেও কিছুটা তাই ঘটেছে। মুসলমানদের ধুয়েছেন পুকুর ঘাটে আছড়ে আছড়ে।
চিন্তক ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে যেসব ধান্ধাবাজদের কথা বারবার বলেছেন তাঁরাই অবশ্যই পরবর্তীতে এই নামে, ঐ নামে ছফা নিয়ে আলাপ-আলোচনার আয়োজন করছেন। এতে করে নিজেদের ‘এক্সপেডিয়েন্সি’ কিছুটা হলেও আড়াল করতে পেরেছেন সেই সুবিধাবাদী মহল। তবে পুরোপুরি ঢাকতে পারেননি যেমনটা ঘটে রোজার দিনে কালো পর্দা ঢেকে ভাত- নাস্তা বিক্রি করা দোকানের ক্ষেত্রে। আলাপ অন্যদিকে মোড় নেয়ার আগে চলুন লাইনে আসি।
ধর্মকে নিজ নিজ রিডিং দিয়ে ব্যাখ্যা করা আমাদের একটা স্বভাবে পরিণত হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের শ্রেণিভাগ কয়েকভাগে করা যায়।
১.
গ্রামের মক্তবে কোরান শিখে, কালেমা, দোয়া-দরুদ শিখে ধর্ম পালন করেন একদল। এদের ইসলামি জ্ঞান বড়জোর শুক্রবারে খুতবার আগে বয়ান শোনা এবং মাঝেমধ্যে বাড়ির উঠোনে বা মসজিদের ময়দানে মাহফিলে শোনা- এই পর্যন্ত। তো, এরা কতক বড়বড় মাওলানা তৈরি করেন নিজ উদ্যোগে। চাঁদা তুলে মাহফিলের আয়োজন হয়। আয়োজনে খাটে কিছু নিরীহ প্রাণ অন্যদিকে মাহফিলের স্টেজে গিয়ে বাজারের সুদখোর, এলাকার ঘুষখোর ও চাঁদাবাজরা বসে বসে পান খান।
এই শ্রেণির মুসলমানদের আল্লাহ ভীতি বেশি এবং এরা খুবই বিশ্বাসপ্রবণ। বুড়ো বাপের প্রেস্ক্রিপশন নিয়ে বাজারে যেতে বললে নাক ঝাড়লেও মাহফিলে চাঁদা দিয়ে জিলাপি মুড়ির টোঙা অথবা এক বক্স আখনি খাওয়াকে এরা সওয়াবের মনে করে।
২.
দ্বিতীয় শ্রেণির মুসলমান হলো হাল্কা ও মাঝারি শিক্ষিত লোকজন। এরা বিশেষ করে বাংলা শিক্ষিত ভদলোক। নিজ জ্ঞানে ধর্মচর্চা করেন এরা আর জায়গায় জায়গায় হাদিস আওড়াবেন। নিজেদেরকে সবক্ষেত্রে ইসলামের সেবক মনে করা এই শ্রেণি অসম্ভব ধুরন্ধর ও স্বার্থপর। এরা ঠিকঠাক মানুষের হক আদায় করেন না, আল্লাহর হক আদায়ে জেহাদ ঘোষণা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এরা ধর্মের দোহাই দিয়ে, দাড়ি-টুপিকে ইসলামের লেবাস বানিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পছন্দ করেন নিজেদেরকে।
৩.
উচ্চশিক্ষিত এই শ্রেণীর সুবিধা হলো এরা জেনেশুনে ধর্মকর্ম করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের প্রয়োজনে ধর্মের ব্যাখ্যা নিজের মতো করে করেন। তবে আশার কথা হলো সামাজিক অবস্থানের কারণে এরা খুব একটা ধান্ধাবাজি করতে পারেন না।
৪.
এই দলের মধ্যে আছে নব্য এলিট ও হঠাৎ করে সাহিত্য -দর্শন চর্চাকারী মানুষজন। অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী স্টাইলে নানা বিষয়ে নানারকম পড়াশোনার চেষ্টা করলেও ধর্ম সম্পর্কে খুব একটা পড়াশোনা সেভাবে করতে চান না এরা। প্রথম জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়িয়ে, শেষ বয়সে গিয়ে মাথায় টুপি চেপে প্রথম দিকে জুমায়, তারপর আস্তে আস্তে পাড় ধার্মিক।
৫.
এই দলের সবচেয়ে উদ্রেক ঘটেছে ডিজিটাল যুগে। ইউটিউব চ্যানেলে জনপ্রিয়তা পাওয়াকে উদ্দ্যেশ্য হিসেবে ধরে নিয়ে এরা মাহফিলে গিয়ে কুরান -হাদিস-ইজমা- কিয়াস – এই চারটা উৎসের আশেপাশে না গিয়ে খালি ক্লাউনিস বক্তব্য দিয়ে বেড়ান আর এদের অর্থের মূল উৎস উপরোল্লিখিত নাম্বার ওয়ান ক্যাটিগরির নিরীহ ধর্মপ্রাণ লোক। এদের নিরীহতা ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মাঝখানে বাজারে চলে এসেছে ইব্রাহিম নোবেল, অক্সফোর্ড মনোয়ার, ঢেলেদিই তাহিরী এবং ‘ওরে বাটপার -ওরে চিটারের মতো লোকজন যারা ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা দেয়ার পরিবর্তে নানারকম উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে মাঠ গরম রাখেন। আদতে এরা ধর্মের শত্রু।
আজকের আলাপ শেষ করব নজরুলের প্রবন্ধ ‘হিন্দু-মুসলমান’ দিয়ে। নজরুলের সুরে বললে বলতে হয়, এরা আসলে নিজেদেরকে ইসলামের ধারক বাহক ভাবলেও আদতে ইসলাম এদের কারো নয়। স্বয়ং আল্লাহর শেষ নবী যেখানে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে না করেছেন সেখানে মোল্লার মোল্লাত্ব, মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের বাড়াবাড়ি, নিজেদের মত করে বিশ্লেষণ করে আত্মস্বার্থ সিদ্ধি করা ব্যক্তি নিজেকে খাঁটি মুসলমান বলার কোন দাবী রাখে না। এরা সুবিধাবাদী, শ্রেণীলোভী ও স্বার্থান্বেষী।
আলমগীর মোহাম্মদ : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।