সবুজ ভট্টাচার্য্য
কথায় আছে ভাষা চলতে চলতে বদলায়। তবে এটা বলা যাবে না যে কারণে অকারণে বদলায়। এর প্রত্যেকটা পরিবর্তনের পেছনে আমাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। কিন্তু যে বিষয়টা আমরা একদম খেয়াল করছি না সেটা হচ্ছে ভাষার দূষণ। পরিবেশ দূষণ এর সংজ্ঞা বলতে গেলে বলতে হয় পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থার পরিবর্তনকেই পরিবেশ দূষণ বলে। কিন্তু ভাষার দূষণ একটু ভিন্ন। বর্তমানে আমরা যে বাংলা ভাষা ব্যবহার করছি বিশেষ করে মৌখিক বাংলা ভাষা; তার বিশাল একটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রতিটা মুহূর্তে আমরা ভাষাকে দূষিত করছি বিভিন্ন ভাষার শব্দ একই সাথে ব্যবহার করে। এটা বলা যাবে না যে পৃথিবীর কোন ভাষা সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ যেখানে অন্য কোন ভাষার শব্দের আগমন ঘটেনি বা প্রভাব নেই। আমরা যদি ইংরেজি ভাষার বর্তমান অবস্থার দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে দেখতে পাই যে এতেও বিভিন্ন ভাষার প্রভাব রয়েছে। যেমন ইংরেজি ভাষার মধ্যে গ্রীক, ল্যাটিন, ফরাসি এবং বহু সংখ্যক বিদেশি শব্দ রয়েছে। বাংলা ভাষাও ঠিক তেমনি একটি ভাষা যাতে বহু ভাষার অসংখ্য শব্দ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ভাষায় যুক্ত হয়েছে এবং সেগুলো আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করছি।
আমার বক্তব্য পরিষ্কার হওয়া উচিত। ভাষার দূষণ বলতে আমি মাতৃভাষা ব্যবহার কালীন সময়ে বিদেশি ভাষার অত্যধিক ব্যবহার এর কথা বলতে চাচ্ছি। অর্থাৎ বর্তমানে তথাকথিত অত্যাধুনিক প্রজন্ম ঠিক যেভাবে বাংলা ভাষাটাকে ব্যবহার করছে অথবা কথা বলার সময় একটা বাক্যে অত্যধিক বিদেশি শব্দ ব্যবহারের যে প্রবণতা আমাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে তার কথা বুঝাতে চাচ্ছি। অনেকের সাথে কথা বলতে গেলে দেখা যায় তারা একটা বাক্য বলতে গিয়ে বাক্যের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করছেন। এতে তার বাক্যটি তার দিক থেকে অনেক বেশি স্মার্ট অথবা আধুনিক মনে হতে পারে কিন্তু অধিকাংশ শ্রোতার কাছে সেটা বেশ কটু শোনায় যেটা আমাদের পরিত্যাগ করা উচিত। আমি বলতে চাই যে, যখনই আমরা যে ভাষা ব্যবহার করব আমরা চেষ্টা করব সেই ভাষাতেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করার। তবে খুব জরুরী সাপেক্ষে প্রচলিত কোন শব্দ না পেলে সে ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করার চেষ্টা করব। যদি আমরা ইংরেজিতে কথা বলি তাহলে চেষ্টা করবো সম্পূর্ণটা ইংরেজিতে বলার এবং ঠিক একই ভাবে সেটা যদি বাংলা হয় তাহলে তখনও আমরা চেষ্টা করব সম্পূর্ণটা বাংলায় বলার। পরিভাষার ব্যবহার হতেই পারে তবে যে শব্দগুলো বাংলায় স্বাভাবিকভাবেই প্রচলিত রয়েছে সেগুলোর জায়গায় আমরা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করব না। দুটো ভাষার মিশ্রণে আমরা যে ভাষা সৃষ্টি করি সেটা আদৌ কতটা সুন্দর সেটা বুঝতে হলে আমাদেরকে কথা বলতে হবে সেই সব বাচিকশিল্পী দের সাথে যারা বাংলা ভাষাকে তাদের অলংকারে পরিণত করেছে; যে বাংলা ভাষা তাদেরকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। আমার বিশ্বাস যে কোন একজন বাচিকশিল্পীর সাথে কথা বললে যে কোন ব্যক্তি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনতে বাধ্য হবেন যেখানে সেইসব ব্যক্তি যারা ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে বলতে পছন্দ করেন তাদের কথা হয়তো কিছুক্ষণ শুনতে ভালো লাগলেও দীর্ঘ সময়ে তা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মৌখিক ভাষায়, মাতৃভাষার পাশাপাশি অত্যধিক ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের যে প্রবণতা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে; তা আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলা ভাষাকে ভবিষ্যতে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা নিয়ে আমি ভয়ভীত। বর্তমানে আরও একটি সমস্যা দেখা গেছে যা অত্যন্ত অদ্ভুত অনুভূত হয়েছে আমার কাছে। কিছুদিন ধরে আমি একটা বিষয় খেয়াল করলাম যে সেই অত্যধিক ইংরেজি শব্দ ব্যবহারকারী বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে নতুন এক ধরনের শব্দের অনুশীলন দেখা যাচ্ছে যা অত্যন্ত অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর; পরিশেষে লজ্জাজনক। যেমন ইংরেজি শব্দের সাফিক্স-প্রেফিক্স বাংলা শব্দের সাথে জুড়ে দিয়ে নতুন শব্দ গঠন করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, আমি কয়েকজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবে শব্দটিকে স্বাভাবিকলি বলতে শুনেছি। আবার অনেকেই বাংলা শব্দের শেষে এস শব্দটি জুড়ে দিয়ে নতুন এক ধরনের শব্দের সৃষ্টি করছে যেমন বড়লোকস্ , গরিবস্ ইত্যাদি। এভাবে ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। যার ইতিহাস পর্যালোচনা করে পৃথিবীর যে কোন জাতি চমকে উঠে। পৃথিবীর প্রত্যেকটা ভাষাই ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় এই যে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা পরিবর্তিত হচ্ছে বিকৃতভাবে। প্রমিত বাংলা উচ্চারণ বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে খুব বিশাল একটি অনীহা দেখা যাচ্ছে; যা খুবই দুঃখজনক। আমরা আধুনিকতার নামে নিজেদের জাতিগত পরিচয় এবং ভাষাকে ক্রমশ অপমান করছি এবং নিলজ্জের মত মাথা উঁচু করে নিজেকে আধুনিক মানুষ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছি।
অনেকের মধ্যে এই ধরনের মিশ্র ভাষা ব্যবহার করা এক ধরনের গর্বে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ ব্যবসায় পরিচালনায় কর্মকর্তাদের মধ্যে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে যা প্রশংসার যোগ্য কিন্তু কোন ভাবেই তা বাংলা ভাষার সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করার পক্ষে আমি নই। যে ভাষা তারা ব্যবহার করতে আগ্রহী তা বাংলা ভাষা এবং ইংরেজি ভাষা কোনটির কাতারে পড়েনা এবং শুনতে বেশ কটু লাগে। এভাবে ভাষার ভুল ব্যবহারের যে প্রতিযোগিতায় আমরা মেতে উঠেছি তা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গর্ব করার মতো কিছু থাকবে বলে আমার মনে হয় না। তাই আমাদের সবাইকে বাংলা ভাষার ব্যবহারে সচেষ্ট হতে হবে। এক কথায় প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতে হবে যাতে বাংলা শব্দের প্রাধান্য থাকবে সর্বোচ্চ।
সবুজ ভট্টাচার্য্য: সম্পাদক, ত্রৈমাসিক ঊষাবার্তা।