কবি কাজী নজরুল ইসলামের মুহররমের বিখ্যাত দু’টি কবিতা ।। পুবাকাশ
মোহর্রম
ওরে বাংলার মুসলিম, তোরা কাঁদ!
এনেছে এজিদি বিদ্বেষ পুন মোহররমের চাঁদ।
এক ধর্ম ও এক জাতি তবু ক্ষুধিত সর্বনেশে।
তখ্ তের লোভে এসেছে এজিদ কম্ বখ্ তের বেশে!
এসেছে ‘সীমার’, এসেছে ‘কুফা’র বিশ্বাসঘাতকতা,
ত্যাগের ধর্মে এসেছে লোভের প্রবল নির্মমতা!
মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ,
কাঁদে আশমান জমিন, কাঁদিছে মোহররমের চাঁদ।
একদিকে মাতা ফতেমার বীর দুলাল হোসেনি সেনা,
আর দিকে যত তখ্ত-বিলাসী লোভী এজিদের কেনা।
মাঝে বহিতেছে শান্তিপ্রবাহ পুণ্য ফোরাত নদী,
শান্তিবারির তৃষাতুর মোরা,ওরা থাকে তাহা রোধি।
একদিকে ইসলামি ইমামের সিপাহি শান্তিব্রতী,
আর একদিকে স্বার্থান্বেষী হিংসুক ক্রোধমতি!
এই দুনিয়ার মৃত্তিকা ছিল তখ্ত সে খলিফার,
ভেঙে দিয়েছিল স্বর্ণ-সিংহাসনের যে অধিকার,
মদগর্বী ও ভোগী বর্বর এজিদি ধর্মী যত,
যুগে যুগে সেই সাম্য ধর্মে করিতে চেয়েছে হত।
এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
‘আলীর’ সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান!
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায়
হাসান হোসেনে গালি দিতে যেত মদিনা ও মক্কায়।
এরাই আত্মপ্রতিষ্ঠা-লোভে মসজিদে মসজিদে
বক্তৃতা দিয়ে জাগাত ঈর্ষা হায় স্বজাতির হৃদে।
ঐক্য যে ইসলামের লক্ষ্য, এরা তাহা দেয় ভেঙে।
ফোরাত নদীর কূল যুগে যুগে রক্তে উঠেছে রেঙে
এই ভোগীদের জুলুমে! ইহারা এজিদি মুসলমান,
এরা ইসলামি সাম্যবাদেরে করিয়াছে খান খান!
এক বিন্দুও প্রেম-অমৃত নাই ইহাদের বুকে,
শিশু আসগরে তির হেনে হাসে পিশাচের মতো সুখে!
আপনার সুখ ভোগ ও বিলাস ছাড়া জানে নাকো কিছু,
একজন বড়ো হতে চায়, করে লক্ষ জনেরে নিচু।
আজন্ম রহি শ্বেতমর্মর-প্রাসাদে মদবিলাসী,
তখ্ত টলিলে বলে, ‘দরিদ্রে মোরা বড়ো ভালবাসি!’
দরিদ্রেরে ভালবেসে যার ভুঁড়ি ফেঁপে হল ধামা ঝুড়ি,
শীতের দিনেও চর্বি গলিয়া পড়ে চাপকান ফুঁড়ি,
যাদের চরণ পরশ করেনি কখনও ধরার ধূলি,
যাহারা মানুষে করেছে ভৃত্য মুটে মজুর ও কুলি,
অকল্যাণের দূত তারা আজ ভূত সেজে পথে পথে
মৃত্যুর ভয়ে ফিরিতেছে নেমে সোনার প্রাসাদ হতে।
সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, ইসলামের সাম্যবাদ
যুগে যুগে এই অসুর-সেনারা করিয়াছে বরবাদ।
ফোরাত নদীর স্রোত [ধারা]-সম ধনসম্পদ লয়ে
দেয় নাকো পিয়াসের এক ফোঁটা পানি। নির্মম হয়ে
মারে কাটে এরা বে-রহম, এরা টলে নাকো কোনোদিন,
এজিদি তখ্ত টুটেছে বলিয়া ছুটিছে শ্রান্তিহীন।
আল্লা রসুল মুখে বলে, তাঁর ক্ষমা পায়নিকো এরা,
দেখেছে শুষ্ক দামেস্ক শুধু, দেখেনি কাবা ও হেরা।
শোনেনি ইহারা আল-আরবির সাম্য প্রেমের বাণী।
আল্লা! এরাও মুসলিম, এরা রসুলের উম্মত,
কেন পায়নিকো প্রেম আর ক্ষমা শান্তি ও রহমত?
ভুল পথে নিতে চায় অন্যেরে, ভুল পথে চলে, তবু
এরা মোর ভাই, এদেরে জ্ঞান ও প্রেম ক্ষমা দাও প্রভু!
লোভ ও অহংকার ইহাদেরে করিয়াছে অজ্ঞান,
সাম্য মৈত্রী মানে না, তবুও এরা যে মুসলমান।
এদের ভুলের, মিথ্যা মোহের করি শুধু প্রতিবাদ,
ইহাদেরই প্রেমে কাঁদি আমি, কেন এরা হল জল্লাদ?
আমাদের মাঝে যত দ্বন্দ্ব ও মন্দ হউক ভালো,
আল্লা! আবার জ্বালাও প্রেমে শান্ত মধুর আলো!
ভালোবাসাহীন এই পৃথিবীরে আর ভালো লাগে নাকো,
আমার পরম প্রেমময় প্রভু, প্রেম দিয়ে বেঁধে রাখো!
খলিফা হইয়া মুসলিম দুনিয়ার বাদশাহি করে,
ভৃত্যে চড়ায়ে উটের পৃষ্ঠে নিজে চলে রশি ধরে!
খোদার সৃষ্ট মানুষেরা ভালোবাসিতে পারে না যারা,
জানি না কেমনে জন-গণ-নেতা হতে চায় হায় তারা!
ত্যাগ করে নাকো ক্ষুধিতের তরে সঞ্চিত সম্পদ,
নওয়াব বাদশা জমিদার হয়ে, চায় প্রতিষ্ঠা-মদ।
ভোগের নওয়াব আমির ইহারা, ত্যাগের আমির কই?
মোহররমের বিষাদ-মলিন চাঁদ পানে চেয়ে রই!
মা ফাতেমা! কোন জন্নতে আছ? দুনিয়ার পানে চাহো,
প্রার্থনা করো, দূর হোক ভায়ে ভায়ে বিদ্বেষ দাহ!
আমাদের মাঝে যার লোভ আছে, তাহা দূর হয়ে যাক,
যাহারা ভ্রান্ত, আসুক তাদের সত্যপথের ডাক।
ফোরাতের পানি ধরার মরুতে শান্তিধারার মতো
না, না, তোমারই মাতৃস্নেহ-রূপে বহে অবিরত।
সেই পবিত্র স্নেহবন্যার দুই কূলে ভায়ে ভায়ে –
হানাহানি করে! তুমি কাঁদিতেছ কোন জন্নত-ছায়ে?
ফোরাতের পানি রক্তিম হল ; মা গো, বিদ্বেষ-বিষে,
কারা তির হানে কাবার শান্তি মিনারের কার্নিশে?
তুমি দাও মাগো ফিরদৌস হতে দুটি ফোঁটা আঁখিবারি,
তব স্নেহবিগলিত অশ্রু, মা, সর্বতৃষ্ণাহারী!
তুমি নবিজির নন্দিনী, নন্দন-আনন্দ দাও,
আল্লার কাছে ভায়ে ভায়ে পুন মিলন-ভিক্ষা চাও!
মোহর্ রম
নীল সিয়া আস্ মান লালে লাল দুনিয়া, –
“আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।”
কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সিমারেরও ছোরাতে!
রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া-দামেস্কে –
“জয়নালে পরালো এ খুনিয়ারা বেশ কে?”
‘হায় হায় হোসেনা’, ওঠে রোল ঝঞ্ঝায়!
তলোয়ার কেঁপে ওঠে এজিদের পাঞ্জায়
উন্মাদ দুল্ দুল্ ছুটে ফেরে মদিনায়,
আলী-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়!
মা ফাতিমা আস্ মানে কাঁদি খুলি’ কেশপাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেতবাস।
রণে যায় কাসিম ঐ দু’ঘড়ির নওশা;
মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা !
‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা
‘কঙ্কণ’ পঁইচি খুলে ফেল সকীনা!’
কাঁদে কে রে কোলে ক’রে কাসিমের কাটা-শির ?
খান্ খান্ হ’য়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর।
‘কেঁদে গেছে থামি’ হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,
বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র !
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
“আম্মা গো পানি দাও,ফেটে গেল ছাতি, মা!”
নিয়ে তৃষা সাহারার দুনিয়ার হাহাকার,
কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার !
দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস,
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্ মনও ‘সাব্বাস্’ !
দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর “শির দেগা, নেহি দেগা আমামা”!
কলিজা কাবাব-সম ভুনে মরু-রোদ্দুর
খাঁ খাঁ করে কারবালা, নাই পানি খর্জুর।
মা’র স্তনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়্ পায়,
জিভ চুষে কচি জান্ থাকে কিরে ধড়্ টায়?
দাউ দাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,
কাঁদে বানু- “পানি দাও, মরে যাদু আসগর।”
পেলো না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,
ডাকে মাতা,- ‘পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!”
পুত্র হীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে।
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল,
“দাদা! তেরি ঘর কিয়া বর্ বাদ পয়মাল্! ”
‘হাইদরী-হাঁক-হাঁকি দুলদুল্-আস্ওয়ার
শম্ শের চম্ কায় দুশমনে ত্রাসবার!
খ’সে পড়ে হাত হ’তে শত্রুর তরবার,
ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার।
নিঃশেষ দুশমন্ ; ওকে রণ-শ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মোছে আঁখি-প্রান্ত!
কোথা বাবা আস্ গর? শোকে বুক-ঝাঁঝরা,
পানি দেখে হোসেনের ফেটে যায় পাঁজরা !
ধুঁকে ম’লো, আহা, তবু পানি এক কাৎরা
দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম্ জাত্ রা !
অঞ্জলি হ’তে পানি প’ড়ে গেল ঝর্ ঝর্,
লুটে ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জর !
হল্ কুমে হানে তেগ ও কে ব’সে ছাতিতে ?
আফ্ তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে ।
‘আস্ মান’ ভ’রে গেল গোধূলিতে দুপুরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে !
বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্-
‘আরশের’ পায়া ধ’রে, কাঁদে মাতা ফাতেমা,
“এয়্ খোদা বদ্ লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জ্জনা করো গোনা পাপী কম্ বখতের ।”
কত মোহর্ রম এলো, গেল চ’লে বহু কাল-
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল !
মুসলিম! তোরা আজ ‘জয়নাল আবেদীন’,
‘ওয়া হোসেনা- ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!
ফিরে এল আজ সেই মোহর্ রম মাহিনা,-
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা।
উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবীর,
দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শীর,-
তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা,
শমশের হাতে নাও, বাধ শিরে আমামা!
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নাকিবের তুর্য,
হুঁশিয়ার ইসলাম, ডুবে তব সূর্য!
জাগো,ওঠো মুসলিম, হাঁকো হায়দারী হাঁক,
শহীদের দিলে সব লালে-লাল হয়ে যাক্।
নওশার সাজ নাও খুন খচা আস্তিন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস্ দিন!
হাসানের মত পিব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মত নিব বুকে ছুরি কহরের
আস্ গর সম দেব বাচ্চাদের কোরবান,
জালিমের দাদ নেব,দেব আজ গোর জান্!
সকীনার শ্বেতবাস দেবো মাতা কন্যায়,
কাসিমের মত দেবো জান্ রুধি’ অন্যায়।
মোহর্ রম! কারবালা! কাঁদো “হায় হোসেনা!”
দেখো মরু-সূর্য এ খুন যেন শোষে না!