সম্পাদক সৈয়দের স্মৃতি ও শ্রুতি
মাঈন উদ্দিন জাহেদ
পুবাকাশ
খ্যাতিমান লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দের আত্মস্মৃতির আরও একটি পর্যায় গ্রন্হিত হয়েছে তার সম্পাদকের কলমে(সূচিপত্র–২০০৫) এ ও ‘মিটিল না সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়‘(গদ্যপদ্য ২০১২) এর সম্পাদকের দপ্তরে প্রবন্ধে। সৈয়দের শিল্প যাপনের এলামলো রেখাচিত্র চমৎকার উঠে এসেছে ঐ দুটো গদ্যভাষ্যে। প্রথমচি ‘সম্পাদকের কলমে’ গ্রন্থের ভূমিকা অন্যটি ‘সম্পাদকের দপ্তরে‘।
সব্যসাচী লেখক আবদুল মন্নান সৈয়দ বেশ কয়েকটি সহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু সৈয়দ কবিতা – কথাসাহিত্য ওসমালোচনা সহিত্যের বিপুল পরিসর– তার সম্পাদনা সত্ত্বার আলোচনা তেমন হয়নি বলে চলে। তিন যে পরিমাণ ও পরিসরে বাংলা সাহিত্যের নানা সম্পাদনা প্রকরণে লেখালেখি করছেন, তাক নিয়ে তেমন আলোচনা নেই বললে চলে। আর তারনানা আঙ্গিক নিয়ে আলোচনাতো দূরাস্ত।
রূপম ও কিছুধ্বন সম্পাদক কবি–সমালোচক আনোয়ার আহমদ কে উৎসর্গ করে আদুল মন্নান সৈয়দ একটি চমৎকার কবিতালিখেছেন উৎসর্গ পত্রে।
বন্ধু, ‘রূপম’-‘কিছুধ্বনি’-সম্পাদক
আওয়ার আহমদ (১৯৪২–২০০৩)
স্মরণে
ফুটেছিল যাথার্থ্য ও ভুল,
ভালোবাসা আর অভিমান—
স্বতঃস্ফূর্ত, অপ্রশ্নসঙ্কুল ।
—কেউ নেই তোমার সমান।
এত ভুল! এত ভালোবাসা!
অভিমান! ফিরে ফিরে আসা!—
মনে পড়ে চোখের পানিতে।
—তুমি যা, আমরা পারিনি তা দিতে।
ছিল এক উতল হৃদয়,
অকুটিল দীপ্ত কণ্ঠস্বর—
নির্দলীয়, একাকী, নির্ভয়।
—তাই এই স্মৃতির পাথর ॥
রচনা : ১১ই পৌষ ১৪১০
সাথে যুক্ত হয়েছে ‘এই বই নিয়ে কথা‘ শিরানামে ১৩ পৃষ্ঠার ১টি ভূমিকা। যা সৈয়দের সম্পাদনা জীবনের সরৎসার বললে ভুলহবে না। সম্পাদক মান্নান সৈয়দের একটি রেখাচিত্র নিজেই এঁকেছেন নিজের শব্দকলায়।
লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর জীবন পরিসরে শিল্পকলা‘ চারিত্র‘ ‘জীবনানন্দ‘ এখন‘ ‘শিল্পতরু‘, নজরুল একাডেমীপত্রিকা কিছুধ্বনি (জীবনানন্দ সংখ্যা)। এছাড়া জীবনের প্রারম্ভে ও উপান্তে যেসব ছোট ছোট প্রয়াসে সম্পাদনায় যুক্ত হয়েছেতার কিছু তথ্য নির্দেশনা রয়েছে আলোচনার ফঁকে ফাঁকে।
সম্পাদনার প্রারম্ভিক পর্যায় সর্ম্পকে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ নিজেই লিখেছেনঃ
‘লেখালেখি, ছবি আঁকা – যদ্দুর মনে পড়ছে এসব শুরু হয়েছিল ক্লাস ফোর–ফাইভ থেকে। আশ্চর্য বলতে হবে, পত্রিকাসম্পাদনাও তার সন্নিকট সময়
থেকেই। ‘প্রভাতী‘ বা এরকম নামের একটি পত্রিকার কয়েক সংখ্যা বের করেছিলাম হাতে লিখে। তাতে কার্টুন ও একেঁছিলাম, মনে পড়ে। হাতে লেখা পত্রিকাটি ছিল অভিনব। দেয়াল – পত্রিকা না, এটিকে বলা যেতে পারে; ল্যাম্পোস্ট–পত্রিকা। তখনঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই বিদ্যুৎ আসেনি। যেমন, আমাদের গোপীবাগ থার্ড লেনে। আমাদের ৩৩ নম্বর বাড়ির উল্টো দিকে ছিল ল্যাম্পোস্ট। আমাদের বাল্যবন্ধু উপা (ডাকনাম, অভিনেতা উৎপল, খুরশিদুজ্জামান উৎপল) দের বাড়িরঠিক সামনে। রোজ সন্ধেবেলা এক তাজ্জব জাদুকরের মতন সিঁড়ি কাঁধে একজন লোক আসত, এসে ল্যাম্পোস্টের কাঁধেসিঁড়ি রেখে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে, বাতিটা জ্বালিয়ে দিত। সন্ধের নেমে আসা অন্ধকারের মধ্যে ফটফটে শাদা আলো জ্বলে উঠত, রজনীগন্ধার ঝাড়ের মতন। সেই ল্যাম্পোস্টের গায়ে আমার প্রভাতী‘ পত্রিকটি টাঙিয়ে দিতাম, মোটা একটা বোর্ডের ওপরশেঁটে দেওয়া হতো। তার ওপারে থাকত আমাদের লিখন ও চিত্রন।
পত্রিকাটি সম্পাদনা করতাম আমি আর আমাদের পাড়ার সমবয়সী এক বন্ধু খোকন (পুরো নাম ভুলে গেছি), আজ বুঝতেপারিঃ পত্রিকা সম্পাদনা নির্ঘাত আমারই উৎসাহ ছিল বেশি।
এভাবেই আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদকীয় যাত্রা। ঢাকা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাম্প্রতিক সম্পাদনায় যুক্তহয়েছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মফিজুল আলম, শাহজাহান হাফিজ, লতাফত হোসেন, আমিনুল ইসলাম বেদু‘রসাথে। তখন আবদুল মান্নান সৈয়দ হয়ে উঠেননি। অশোক সৈয়দ নামেই তিনি লেখালেখি শুরু করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনোর পর সম্পাদনায় যুক্ত হোন গল্পপপত্র নামে একটি গল্প কেন্দ্রীক লিটল ম্যাগাজিনে। সাথেছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও মুহম্মদ মুজাদ্দেদ (দাদু)।
“কয়েক ফর্মা ছাপা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোনো অন্তর্গত জটিলতায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়নি।‘
এটা আবদুল মান্নান সৈয়দের নিজরই ভাস্য।এর পর তিনি যুক্ত হয়েছিলেন অন্য একটি কাগজ ‘আসন্ন‘ সম্পাদনার সাথে ছিলেন সৈয়দ ইকবাল। একটি সংখ্যাইপ্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটি নামকরণও করেছিলেন – আবদুল মনান সৈয়দ। যেখানে প্রকাশিত হয়েছিল সৈয়দে কাব্যনাট্যঃ‘জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা‘-যা তাঁর দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্হে গ্রন্হিত হয়েছে।
সিলেট এম. সি কলেজ থেকে বদলি হয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ যখন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে চলে আসেন। তখন‘শিল্পকলা‘ নামে একটি ছোট পত্রিকা বর ববার উদ্যোগ নেন। সাথে যুক্ত হোন লেখব–অনুবাদক আবদুস সেলিম। যা ছিল মূলত প্রবন্ধ পত্রিকা। আট সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৭৮ এর কলকাতা থেকে বিশদিনের ভ্রমণ শেষে আবদুল মান্নান সৈয়দ উদ্যোগ নেন ‘চারিত্র‘ নামে আরেকটি লিটলমাগাজিনের। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৯ এর মে । সহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় যা বেশ আলোড়ন তুলেছিলে । মোট চার সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল।
লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ মুগ্ধতা সহিত্য জীবনের প্রারম্ভেই। জীবনানন্দ নিয়ে তার একক ভাবে গবেষণাউভয়বঙ্গে শ্রেষ্ঠতর। জীবনানন্দকে নিয়ে ‘শুদ্ধতম কবি‘ মত সমালোচনা সাহিত্য উভয় বঙ্গে আর ক‘টি হয়েছে?
তিনি সম্পাদনা করছেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা । যেখানে প্রায় ৫৭ পৃষ্ঠার গবেষণামূলক টীকা–টিপ্পনী সংযোগ সহভূমিকা যোগ করছেন- জীবনানন্দ গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ।
এছাড়া– জীবনানন্দচর্চা, তার শ্রেষ্ঠ কবিতা, প্রকাশিত অপ্রকাশিত জীবনানন্দের কবিতা সমগ্র, শ্রেষ্ঠ জীবনানন্দ, তুলনামুলক আলোচনা, পত্রাবলীসহ প্রায় আটশতঅটআশি পৃষ্ঠার গবেষণা-(আবদুল মান্নান সৈয়দ রচনাবলী ৬ষ্ঠ খন্ড) উভয়বঙ্গে বিরল। আর এসব শুরু হয়েছিল ১৯৮১সালে জীবনানন্দ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
আশি দশকের প্রথমদিকে আবদুল মান্নান সৈয়দ যুক্ত হয়েছিলেন ‘উৎসব” নামে একটি বার্ষিকী সম্পদনারও । বিশিষ্টসাংবাদিক দৈনিক নবযুগের সাথে সংশ্লিষ্ট , দৈনিক আজাদের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ জাফর আলীর সাথে। সম্পর্কেতিনি লেখক আদুল মান্নান সৈয়দের বড় মামা ছিলেন।
১৯৯৩ সালে রূপম ও কিছুধ্বনি সম্পাদক কবি আনওয়ার আহমদের প্রণোদনায়। কিছুধ্বনি – জীবনানন্দ সংখ্যার অতিথিসম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। দুর্দান্ত একটি সংখ্যা হয়েছিল সেটি।
ষাটের দশকে আরও দু‘টো পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছে ও অভিপ্রায়ে কথা জানান তিনি তাঁর স্মৃতি গদ্যে। তবে নাম তিনি উল্লেখকরেননি। তবে আক্ষেপ কারেন এম্নি :
“ষাটের দশকে একবার আমি আর রাজীব আহসান চৌধুরী… একটি পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলাম। পরিকল্পনাইমাত্র। ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছুটন্ত খরগোশের বিদ্যুৎচমকের বেশি ছিলনা তা। প্রকাশিত হলে নিশ্চয় তা হতো কবিতা–পত্রিকা। ‘
নব্বই এর দশকে জগন্নাথ কলেজ বাংলা বিভাগ (দিন) থেকে অধ্যাপক মমতাজ আহমদ (নাট্যকার–অভিনেতা) আর আমিএকটি গবেষণা পত্রিকা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম। (পৃষ্ঠাঃ ১৫)
‘কন্ঠস্বরএর সম্পদনার সাথে যুক্ত হতে হতে হোননি। সম্পাদনায় নিজস্বতা এর বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল– এতো বড় সুযোগ পাওয়ার পরও। কারণ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পাদনা রীতি ও আবদুল মান্নান সৈয়দের মনো সংগঠনতো এক কম নয়।
‘এখন‘ ও ‘শিল্পতরু‘ পত্রিকার তিনি ছিলেন মূলতঃ উপদেষ্টা সম্পাদক। কিন্তু এখন‘ এর আটটি সংখ্যার সম্পাদকীয়লিখেছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। ‘শিল্পতরু‘ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি আবিদ আজাদ। তবে সংখ্যার প্রয়োজনেবেশ কিছু সম্পাদকীয় লিখেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। এখন‘ নিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দের আত্মস্মৃতি রোমাঞ্চকর। ১৮ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন:
‘বঙ্গবন্ধু এভেনিউ এর ‘এখন‘ এর তিনতলা অফিসে বিকেল বেলা আসতেন অনেকেই। সারা ১৯৮৬ সালে এই পত্রিকাই ছিল আমার প্রধান উদ্ যাপন–ক্ষেত্র। সিকান্দর আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান আরঅমিয় চক্রবর্তীকে নিয়ে তিনটি অনুষ্ঠান আমরা করেছিলাম ‘এখন‘ অফিসে। একদিন আমার টেবিলের সামনেকবি–কথাশিল্পী সাইয়িদ আতিকুল্লাহ (মরহুম) আর মওলানা মহীউদ্দীন খান (মাসিক ‘মদীনা‘ –সম্পাদক) প্রতীপ মেরুরএই দুই মানুষ বসেছিলেন, পরস্পরের কুশল জিগেস করেছিলেন এই ভাবতেও ভাল লাগে আমার।‘
‘নজরুল একাডেমী পত্রিকা‘র আটটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল অনন্য গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায়।এছাড়া ‘শিল্পতরু‘র নজরুল সংখ্যাটির সম্পাদনায় ছিলেন তিনি। তা এতোই প্রচার পেয়েছিলো– ‘শিল্পতরু’র প্রকাশের সাথে সাথে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য তিনি নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকা‘ এবং ‘নজরুল ইন্সটিটিউট বুলেটিন‘ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তবে আক্ষেপও করপ গেছেন কবি ত্রিবিদ দস্তিদারের প্রস্তাবনায় ‘অক্ষর‘ পত্রিকার‘জানালা‘ সংখ্যা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে ত্রিবিদের অকাল প্রয়াণে।
সম্পাদকীয় লিখেছিলেন শিল্পকলা‘র ৫টি, চারিত্রে ৩টি, জীবনানন্দে ২টি, এখনে ৮টি, নজরুল একাডেমী পত্রিকার ৭ টি, শিল্পতরুতে ১২টি, কিছুধ্বনি ১টি। মোট আট ত্রিশটি সম্পাদকীয় সংকলন এটি। সম্পাদনার সাথে সাথে তিনি
সম্পাদকীয় কে আলাদা একটি শিল্পে উত্তীর্ণ করেছে তথ্য উপাত্তের সমৃদ্ধ উপস্থিতি ও সমন্বয়ে। বিশেষ করে তথ্য উপাত্তউপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি দশ দিক দ্রষ্টার ভূমিকায় ছিলেন। নানা দিক থেকে আলো ফেলে তিনি বিষয় ও প্রসঙ্গকে বিশ্লেষণকরেছেন সত্যান্বেষী গবেষকের মতো। তার সম্পাদনা মূলতঃ গবেষণার এক এক পর্যায়।
বিশেষ করে শিবনারায়ণ রায়ের রবীন্দ্র মূল্যায়ন, অমিয় চক্রবর্তীর নজরুল ইসলাম সর্ম্পকে কুটভাষ ও দেওয়ান মোহাম্মদআজরফের নজরুল ইসলাম সর্ম্পকে বিশাল পরিসরে মূল্যায়ন, বিখ্যাত কবিতা পত্রিকার নজরুল সংখ্যায় বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদকীয়তে ফুটে ওঠা তার বিবেচনা দৃষ্টি।
বিশেষ করে নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ চর্চায় নানা পর্যায়ের নানা মাত্রার পত্র পল্লব ফুটে উঠেছে।
বিশেষ ভাবে বিশিষ্ট অনুবাদক আবদুস সেলিম ও কথাশিত শাহেদ আলীর দীর্ঘ চিঠির সংযোজন অনেক তথ্য ও প্রসংঙ্গকেপাঠকের কাছে সরস উপস্থাপনে সমৃদ্ধ করেছে। আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদকীয় যাত্রা পথের এক উজ্জ্বল উপস্থিতির স্বাক্ষর হয়ে আছে এ গ্রন্থটি।
মাঈন উদ্দিন জাহেদ: কবি ও প্রাবন্ধিক । সম্পাদক-পুবাকাশ ।