গুচ্ছ কবিতা


নাসির উদ্দিন আহমদ


পুবাকাশ


রোহিনী

আরো কিছুক্ষণ কদম্ব হও
ভাদ্র এসে গেছে
মাথার উপর ঝুলছে
আশি টন যমদূত অখন্ড গাফিলতি।

চলো কাশবনে রাতে
অকটেনের ইঞ্জিন ফেলে
হেঁটে আসি
ডিজেলের দামি ঘ্রাণে মৌ মৌ
কর্পোরেট সিটি ছেড়ে
চলো
জোছনায় খুলে দেই ভঙ্গুর দিন;

জীবনের ছিপি খুলে
আত্মায় একবার মেখে নিই
কালিজিরা এলাচের ঘ্রাণ
এসো বৃন্দাবনে
রোহিনী জ্বলছে দেখো
সমস্ত গার্ডারে।

১৮.৮.২০২২/ আশালতা।

নিলাজ পূর্ণিমায়

বাহারী নিলাজ পূর্ণিমা ;
এসো নক্ষত্রের রাতে
ঢেউ হই যমুনার পাড়ে পাড়ে
ঘন কাশফুলের মিহি প্রপাতে
এসো যুগল বালি হাঁস হই
ডুব সাঁতারে
ঢেউয়ের অক্ষরে
কচুরীপানার ভিতরে বুনে যাই
সুরেলা ঐশ্বর্যের নুন
ধুয়ে নিই নিরানন্দের বিষন্ন
প্রহরের জমে থাকা পুরনো দাগ
অস্থির তৃষ্ণার আগুন
টুকরো টুকরো সুখ গেঁথে নিয়ে
প্রেমের সুতোয় এসো
গড়ে যাই নিকেত নতুন!

এসো এলোমেলো এই রাতে
ছুঁয়ে যাও নিকষ নি:শ্বাস
রঙের কাঁচলে জড়াও
তৃষিত মহাকাশ !

মে ‘১৬/ কঙ্গো ।

এইখানে প্রিয় ভাঙ্গন

এইখানে জতুগৃহ
কুমার নদ
প্রিয় ভাঙ্গন
রুগ্ন বীজের ভিতর বেড়ে ওঠা সোমেশ্বরীর বট
নিষিক্ত কবুতর
বাকবাকুম সারাবেলা
আমাদের শহর থেকে কবিতা চুরি হয়ে গেলে
তোমার সহজ কঙ্কন হতে চায় পাখি

এইখানে তারা খসে পড়া ক্লাব ঘর
ভাঙ্গা হারমোনিয়াম
বেজে ওঠা অক্ষর
এইখানে রক্ত শুকিয়ে গজিয়ে ওঠে পদ্ম
কৃষ্ণচূড়া
এইখানে অপেক্ষা

এক জোড়া অলিন্দের কম্পমান কবিতা
এইখানে প্রজাপতির পড়ে থাকা ভেজা ডানা শিশিরের মানপত্র
এইখানে পঠন-পাঠনের শেষ বেলা
গোধূলির গান
পিতা-মাতামহদের বেহেশতী কলতান।
১৭.৫.২০২০/ ঢাকা।

যুদ্ধ-প্রিয় গেরস্থদের খেলা

বারুদের ও তৃষ্ণা থাকে—জ্বলন্ত চোখে পুড়ায় আদিগন্ত
ঝমঝম রেলগাড়ি, জমানো বাগান, প্রেয়সীর নীলক্ষেত
পাড়াপারের চৌকাঠ; আর বিষ্ফোরণে—আমাদের গোটা
গ্রহ-সবুজ, দেখা পতেঙ্গার ঝাউবন;

এই কোলে কাঁখে এখন তপ্ত শলাকা—পারমাণবিক রোদে
ঝলসে যাবে নক্ষত্রের গান—কুমার পাড়ের লক্ষী-উঠোন
জামরুল তলায় লাল নালছেরা পুড়ে যাবে—কেউ গাইবে না
তাদের শাদা ডিমের শোক গাঁথা;

তবু বারুদ হয়ে ওঠে পৃথিবীর মন—পুড়াতে শত ইচ্ছে,
উসকানি দেয়—যুদ্ধের চুলকানি, পাড়াময় হাট-বাজার বারুদের—মায়ের উঠোন শূন্য করে ঝরে পড়ে
রক্তাক্ত-শিশু সিরিয়ায়-গাজায়-ইয়েমেনে-নাফের তীরে;

ক্ষত-মন, বারুদের তৃষ্ণা—বারান্দায় চকচকে নোট,
যুদ্ধের ফেরিওয়ালা—দাঁত কেলিয়ে কত উল্লাস—যত পারো
পুড়াও, কাঠ-কয়লা হোক শিশু-বৃদ্ধ—এমনই বুঝি
বোধ-মন তাদের—তুমিও পুড়তে থাকো স্মৃতি,
সমস্ত ঐতিহাসিক নগর-সভ্যতা জ্বলে যাক এ বেলা,

দেখে-ক্লান্ত দুই-চোখ যুদ্ধ-প্রিয় গেরস্থদের খেলা…

১১.৫.১৮/ ময়মনসিংহ।

স্মৃতির সৌরভ

১.
অনন্য কবিতার বেগুনি ডাল ধরে
তুমি দাঁড়িয়ে আছো ফুটন্ত বিকেল
কেউ বলে অপরাজিতা
কেউ বলে বিস্তৃত জারুল
আমি দূর থেকে অক্ষর বুনে যাই
শাড়ি পড়ে হাসে দিগন্ত

এখন
অশান্ত বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে
স্মৃতির সৌরভ
কেউ বসে আছে অপেক্ষায়
কেউ আঁচল ছড়িয়ে শুকিয়ে নিচ্ছে
পুরাতন মেঘ

এই মুক্তাক্ষর বিকেলে
বৃষ্টির বারো হাত নদীতে
অকারনে
ভেসে যায় দেহাতি ইচ্ছেগুলো।

২.
কে তুমি অশান্ত বকুল
মেঘের অন্ধকার ভেদ করে চলে এসো
ময়ূর হয়ে বাঁচি

অরণ্যের স্বপ্ন সাথে নিয়ে
চলো
আটকে থাকি বনের সোহাগে
ঘাস লতা পাতা চুম্বন
সাথে করে আরেকদিন
মৌ মৌ করে তুলি দিগন্ত বাতাস

খোলা রাত হয়ে আসো
নগর দূরে সরে যাক
বেবিলন উদ্যান ঝুলে থাকুক
তোমার শূন্যতায়!

৩.
বাড়তে দাও
অরণ্য সোহাগ
যদিও তৃষ্ণার সীমানায় আটকে আছে
জ্বলজ্বলে মরুভূমি

বাড়তে দাও
করবী আবির
অমীয় বোধ
তেলাকুচ সবুজ
থাকুক না হয় শাড়ির
বিহঙ্গে আটকানো সেফটিপিন কাঁটা

বাড়তে দাও
নিজস্ব কুমকুম
নিষেধের আবডালে হাসুক
জোছনা বিতান..
১০.৫.২০২২/ ঢাকা।

চুম্বনে হাসে দুইপার

এবং ঘোষণাপত্র পাঠ করো উদ্বোধনের
সাহসি স্পর্ধার
পৃথিবী দেখুক
কী করে জেগে উঠতে হয়
দুয়ার খুলতে হয় অসম্ভবের
কে দাবায় রাখবে গ্যালাক্সির আলোর ধারা
উদ্দাম স্রোতের উপর হাসছে দেখো
গৌরব অবিচল প্রত্যয়

এবার মিলন হবে
শস্যের সাথে বতরের
ইলিশের সাথে পাবদার
নগরের সাথে নাগরের
বৃত্তের সাথে পরিধির
পথের সাথে পার্বতীর

এবার দেখা হবে
কবির সাথে কবিতার
স্রোতের সাথে দুর্বা ঘাসের
কোমল গন্ধার সাথে নাকফুলের
এসো হাত ধরি দুই তীরে
জয় শেষে নিশিগন্ধা ফুলের চুম্বনে
নতুন আকাশ গঙ্গা সাজাই
এসো কুসুমে স্বপ্নে ভরসায় স্পন্দনে
ললিত সাহসে নতুন মিলনে
এসো শ্যাওলা ধরা পলেস্তরা ঘষে নতুন সুরকীতে সাজাই বিবর্ণ ঠিকানা।

দুই পাড় মিলে গেছে
বেড়ে গেছে পুঁজি
বাহুবাল আত্মীয়তা
পথে পথে জাফরান আলো
সবুজ চেরাগ
আবার আকাশ ফসল শস্য পুষ্প
সৌরভে মুগ্ধ এলাচের উল্লাস
এখন দক্ষিণ ভরে যাবে দক্ষিণায়
প্রবল প্রাণের ভিতর বাঁশি
শোনো
অর্ফিয়াস আজ নতুন সুর তুলেছে বঙ্গে
উৎফুল্ল পদ্মার ঢেউ
চুম্বনে হাসে দুইপার
সেতু হলো সেতু হলো পদ্মার….
৯.৭.২০২২/ ফরিদপুর।


নাসির উদ্দিন আহমদ : কবি ও প্রাবন্ধিক। চিকিৎসক হিসেবে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন