স্মৃতি


ছিন্ন কথায় সাজাই তরণী


সরওয়ার মোরশেদ


পুবাকাশ


আর স্মৃতির বুনো হাতির পাল আমার রাত্রিকে
মাড়িয়ে ছিঁড়ে দিয়ে যায়।
– ‘কোকিল, ওগো কোকিল’/ বুদ্ধদেব বসু।

.

প্রত্যেসিক স্ফীতি মানবের মধ্যে প্রবলভাবে উস্কে দেয় এই কর্ষণ-স্পৃহা। আমরা হয়ে যাই একেকজন স্মৃতিচাষী। অতীত হয়ে ওঠে আমাদের কাছে কচি নেবু পাতার ঘ্রাণের মতো প্রিয়। স্মৃতি-তাড়িত হলে নাগরিক চাঁদও আমাদের কাছে ধরা দেয় শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ের ’পরে ঝুলে থাকা সোনার ডিমের মতো ফাগুনের চাঁদ হয়ে। স্মৃতির এমন-ই ঐন্দ্রজালিক মৌতাত। মনে হয়, এ যেন এক অলৌকিক কিশতি – জলের আহলাদে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্মৃতির শরীর যেন এক পালতোলা নৌকা, চলে যায় ছলছল জলের সর্পিল হিল্লোল তুলে।

.
স্মৃতিপ্রত্নস্থলে খননযন্ত্র চালিয়ে দেখতে পাচ্ছি, হাসান স্যারের সাথে আমার প্রথম পরিচয় প্রায় তিন দশক আগে। তখন চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছিলাম। জগৎ সংসারের তাবৎ বিষয়ের প্রতি সে সময় আমার অসীম আগ্রহ। ক্লাস না থাকলে সকালে ঘুম থেকে ওঠে পত্রিকার হেডলাইন থেকে ‘পাত্র চাই/ পাত্রী চাই’ পর্যন্ত সমান মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। এরকম-ই একদিন পত্রিকা পড়ার সময় দেখতে পেলাম হাসান স্যারের পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের খবর। স্যারের গবেষণার বিষয় তখনই আমার নজর কেড়েছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর যুগপৎ অভিনবত্ব এবং সংবেদনশীলতার কারণে। মনে মনে ডঃ হাসান মোহাম্মদ স্যার- কে টুপি খোলা অভিনন্দন জানিয়েছিলাম তাঁর অসম সাহসের জন্য। সত্যিইতো, একাডেমিয়ায় পান্ডুরোগগ্রস্ত, জরাপীড়িত, হ্রস্বদৃষ্টিধারীর মতো আচরণের কোন সুযোগ নেই। গবেষকের আতশী কাঁচের নিচে ফেলে নির্মোহভাবে সত্যকে তুলে আনতে হয়।

৩.
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও জারি থাকলো হাসান স্যারের সাথে অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগ। আমি আর বন্ধু জসিম প্রত্যহ বৈকালিক ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করতাম। সোহরাওয়ার্দী হলের বাইরে ছিল ইংরেজি বিভাগের পিয়ন হারুন ভাইয়ের চায়ের দোকান। স্বজনপ্রীতির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে আমরা চা নাস্তা করতাম হারুন ভাইয়ের স্টলে। সেখান থেকেই শুরু হতো আমাদের প্রাত্যহিক হন্টন পর্ব।


সোহরাওয়ার্দী মোড় হয়ে শহীদ মিনার ঘুরে, ছাত্রদের ভাষায় ‘জিন্দাপীরের মাজার’ জেয়ারত করে অর্থাৎ শামসুন্নাহার হল (প্রীতিলতা হল তখন নির্মাণাধীন)ঘুরে আমরা চলে যেতাম দক্ষিণ ক্যাম্পাস। এই ‘দাক্ষিণাত্যেই’ আমাদের সাথে দেখা হয়ে যেত হাসান স্যারের। এক অলিখিত, অলৌকিক নিয়মে আমরা মুখোমুখি হয়ে যেতাম জগিংরত হাসান স্যারের। স্যারকে মূলতঃ হাঁটতে দেখতাম বিডিএফ থেকে ফরেস্ট্রি পর্যন্ত অনিন্দ্য সুন্দর রাস্তাটি ধরে। এখানে এসে আমরা বিনা যোগাযোগে কী করে যেন স্যারের অনুগামী হয়ে যেতাম! এ এক অলৌকিক পাটিগণিত! টেরিফিক টেলিপ্যাথি!কবি এন্ড্রু মার্ভেলের ভাষায়, Conjunction of minds। কী যে সুন্দর লাগতো স্যারকে ব্যায়ামের পোষাকে!


কাঞ্চনকান্তি, নাদুসনুদুস, স্মিতহাস্য অধ্যাপক যখন ট্র্যাকস্যুট, টি-শার্ট আর ক্যাডস পড়ে ঘাম ঝড়াতেন, তখন তার অবয়ব থেকে এক ধরণের আভিজাত্যের দীপ্তি ঠিকরে পড়তো। অনেক সময় আমরা মজা করে জনবিরল রাস্তায় স্যারের পিছনে দৌড়ানোর ভান করতাম। কোনদিন বিকালে স্যারকে না দেখলে এক ধরণের শূন্যতা আমাদের গ্রাস করতো। রাস্তার রিশতা যে কখন বন্দর পেরিয়ে হৃদয়ের অন্দরে মঞ্জিল গেড়েছে টেরই পাইনি।  আচ্ছা, স্যার ও কি আমাদের মনে মনে খুঁজতেন?

৪.
দরিদ্র-ভার্যা নাকি গণ-ভাউজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের হয়েছে এই দশা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন কুলীন বিভাগ চতুষ্টয়ের একটা হলেও, এ বিভাগে শিক্ষক স্বল্পতাজনিত অনেক সমস্যা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ এ সমস্যার সমাধান করা হয়নি বা যায়নি। ফলে, এখানে সমস্যার পুঞ্জীভবন হয়েছে। এ সুযোগে অনেকেই জেনে না জেনে ইংরেজি বিভাগ সম্পর্কে মন্তব্য করে বসেন। বলা বাহুল্য, এসব মন্তব্যের সিংহভাগই অনধিকারচর্চা বা বিদ্বেষপ্রসূত। এরকমই কিছু প্রচার প্রচারণা আর নামসর্বস্ব মিডিয়ার পীতসন্ত্রাসের কারণে আমাদের বিভাগে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, সম্ভবতঃ ২০১১-১২ সালের দিকে। কিছু অর্ধসত্য আর বিকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে সংবাদপত্রে হতে থাকে একের পর এক রিপোর্ট। এসবের প্রেক্ষিতে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যউপাত্তসমৃদ্ধ প্রবন্ধ লিখি যা চট্টগ্রামের একটি দৈনিক পত্রিকায় দুই কিস্তিতে প্রকাশিত হয়। লেখাটি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সহকর্মীকে প্রিন্ট করে পাঠিয়েছিলাম। বিজ্ঞ সহকর্মীদের কেউ কেউ লেখাটি পড়ে আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হাসান স্যার। স্যার আমার লেখার, তাঁর চয়িত শব্দে বলছি, ‘শৈলী’র প্রশংসা করেছিলেন। বাহুল্য হলেও বলা প্রয়োজন, হাসান স্যারের ফোন পেয়ে, স্নেহসিক্ত বচন শুনে সেদিন বেশ পুলকিত হয়েছিলাম।

৫.
অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ একজন কীর্তিমান শিক্ষক ছিলেন। ছিলেন শিক্ষক সমাজের নেতৃত্বেও। টক শোতেও স্যারের উপস্থিতি দেখেছি, যদিও বোকা বাকশের এই ধরণের অনুষ্ঠানে অনেক কথকের মৌখিক উদরাময় (Verbal diarrhea) বিবমিষা উদ্রেক করে। এত এত গুণের মধ্যে হাসান স্যারের পরিমিতিবোধ আর স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বসৌকর্য আমাকে মুগ্ধ করতো। তাইতো স্যারের মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে ছিল কোমল বাতাসে আলপিন বিধাঁর মতো স্নায়ুকম্পী শব্দ।

মহান রব হাসান স্যারকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।

প্রফেসর সরওয়ার মোরশেদ

সরওয়ার মোরশেদ: অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন