পাঠ-উন্মোচন


ফাহমিদ-উর-রহমানের ভাবনা


মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত


পুবাকাশ


প্লেটো তার রিপাবলিকে যে দার্শনিক রাজার কথা বলেছিলেন, আলীয়া ইজেতবেগােভিচ হলেন আধুনিককালে তার এক মডেল। রাজনীতিকে তিনি
রীতিমত দার্শনিক প্রজ্ঞার স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এ কারণেই তিনি বসনিয়ার মানুষের সংকটকালে যথার্থ
দিশা দিতে পেরেছিলেন। এই দার্শনিক রাজার জীবন, চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসের কথাই লিখেছেন ফাহমিদ-উর-রহমান।

এক. সূচনা
‘ইকবাল: মননে অন্বেষণে’, ‘ইকবাল নিয়ে ভাবনা’, ‘উত্তরআধুনিকতা’, ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’, ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বাংলাদেশ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ ও তার অন্যান্য প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে ফাহমিদ-উর-রহমান নিজেকে একজন বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তার ভাষ্যকার হিশেবে উপস্থাপন করেছেন। বাঙালি মুসলিম আত্মপরিচয়কে তার বিভিন্ন বইতে তথ্য, তত্ত্ব ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সহকারে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছেন। এক্ষেত্রে আল্লামা ইকবালের কাব্য ও দর্শন তার চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি বিগত তিরিশ বছর ধরে নিরন্তর ইকবাল চর্চা করে গেছেন।
বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তার আত্মপরিচয় পরিস্ফুটনের উদ্দেশ্যে তিনি বাঙালি জাতিবাদের আড়ালে অনুপ্রবেশী ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ উন্মোচনে যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। এমনকি ভৌগোলিক সীমাভিত্তিক বাংলাদেশি জাতিবাদের অপর্যাপ্ততা এবং সীমাবদ্ধতাকেও তিনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। এসবের বিকল্প হিশেবে তিনি যে বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তা পেশ করেছেন তা ভাষা, সংস্কৃতি, ভূগোল, ধর্ম—সব মাত্রাকেই স্পর্শ করে সম্পূর্ণতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিক থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্যভিত্তিক জাতিসত্তা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রবক্তা ও লেখক আবুল মনসুর আহমদ এবং খন্দকার আবদুল হামিদের উত্তরাধিকার ধারণ করছেন। একই স্বাতন্ত্র্যচেতনার ধর্মবাদী ভাষ্যকার সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের অনুরণনও তার চিন্তায় ছায়াপাত করেছে বলে বলা যেতে পারে।
এর সঙ্গে যোগ করা যায় ফাহমিদ-উর-রহমানের উপমহাদেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উদীয়মান ইসলামি উম্মাহর সঙ্গে সংহতি ও ঐক্য চেতনা। এদিক থেকে তিনি একজন বুদ্ধিবৃত্তিক প্যান-ইসলামপন্থীও বটে। ঐতিহ্যবাদী উলামাদের বয়ান ও অনুশীলনের সঙ্গেও তিনি তুলনামূলকভাবে অল্পবিস্তর লিপ্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে একথা বলা যায় যে তিনি এদেশে সেক্যুলার জাতিবাদের বিভিন্ন বয়ানের প্রতিবয়ান নির্মাণে একজন প্রথম সারির বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবুক ও লেখক।

দুই. বাংলা ভাষা, বঙ্গ, বাঙালি মুসলমান ও মুসলিম সংস্কৃতি
বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ‘হাজার বছর’ মার্কা একটি বয়ান দিয়ে বাংলাদেশে একটি সমকালীন চেতনাকল্প তৈরি করা হয়েছে। সেটাতেই অনেকে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেখানে দেখানো হয় যে চর্যাপদ থেকে বৈষ্ণব পদাবলী হয়ে এর অভিযাত্রা। এরপরে উনিশ-বিশ শতকের ঔপনিবেশিক কলকাতায় গজিয়ে ওঠা আধুনিক বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যস্থতায় বিশ শতকের শেষার্ধ থেকে আজতক চলমান বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। অর্থাৎ বাংলাদেশ আজ একটি ভিন্ন রাষ্ট্র হলেও বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস কলকাতা হয়ে প্রাক-উপনিবেশ কালের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সেখানে উপনিবেশ কালের ছেদ, বিচ্যুতি ও অসম্পূর্ণতাকে চেপে রাখা হয়, অস্বীকার করা হয়। অথচ প্রাক-উপনিবেশ কালে উদীয়মান বাঙালি মুসলমানদের অংশগ্রহণ, সৃজন ও মননের মাধ্যমে যে আরো একটি সম্পূর্ণতর, বহুবাচক, উভসম্প্রদায় অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি গড়ে উঠছিল সেটি থেকে দৃষ্টি ও মনোযোগ সরিয়ে নেয়া হয়। ফলে আজ যা বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি নামে চলছে তা প্রকৃত বিচারে আংশিক, এক সম্প্রদায় কেন্দ্রিক এবং আরেক সম্প্রদায় বিচ্ছিন্ন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রাক-উপনিবেশিক মূল গতিপথের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ পুনর্স্থাপন করবার একটা মহৎ চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই চেষ্টা হল—বাংলার স্বাধীন সুলতান, যারা সর্বপ্রথম একটি অখন্ড আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, তাদের সূচিত ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গতি দেয়ার উদ্যোগ। উপনিবেশ কালের বিচ্ছিন্নতা, বিচ্যুতি ও বিচ্ছেদকে পাশ কাটিয়ে আবার একটা সম্পূর্ণতর, উভসম্প্রদায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি বিনির্মাণের আকাঙ্খা ও প্রচেষ্টা। এভাবে বাঙালির পরিচয়কে বৃহৎ বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে তোলার কথা ক্রমাগত জোরদার হচ্ছে।

ফাহমিদ-উর-রহমানের সাম্প্রতিক দুটি বই ‘বঙ্গ, বাঙ্গালা ও বাঙ্গালী’ ও ‘মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান’ এই পরিপ্রেক্ষিতেই লেখা তথ্য ও ভাষ্য ভিত্তিক প্রতিপাদনমূলক উপস্থাপনা। বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তার আজাদি ও ইজ্জত প্রাবন্ধিক ফাহমিদ-উর-রহমানের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আধিপত্যবাদমুক্ত পরিচয়ও তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। আর্থ-রাজনৈতিক তো বটেই উপরন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও কর্তাসত্তার প্রশ্নে তিনি আপসহীন ও সংগ্রামী। এসব ব্যাপারে প্রচলিত ও প্রথাগত বোকা বোকা বয়ানে তিনি কখনোই ইম্প্রেসড হন না। বরঞ্চ এসব মতাদর্শিক প্রোপাগান্ডার অন্তঃসারশূন্যতা তিনি নিয়মিতভাবে তার বিভিন্ন বইতে উন্মোচিত করে থাকেন।

তিন. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন
‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ নামক বইয়ের দুই খন্ডে তিনি আধুনিক ও উত্তর আধুনিক কালের সেরা মুসলিম চিন্তক ও লেখকদের জীবনী, রচনা ও কর্মের সারাংশ লিখেছেন। এর মাধ্যমে তিনি উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের ইসলামকেন্দ্রিক বৈশ্বিক ও স্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তির একটি বিশ্বকৌষিক আধার তৈরি করেছেন।
এখানে তিনি মূলত যারা ঐতিহ্যবাদী ধারার নন এমন মুসলিম চিন্তক, লেখক ও কর্মবীরদের তার বইয়ের বিষয় হিসাবে নির্বাচন করেছেন। কিন্তু অঞ্চল, চিন্তা ও রচনার প্রকরণ এবং কর্মপদ্ধতির দিক থেকে এদের মধ্যে রয়েছে অনেক বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা। এই বহুমাত্রিক ও বহুবাচনিক বিষয় ও ব্যক্তিত্বের সমাহারের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষায় ইসলামকেন্দ্রিক চিন্তা ও কর্মের পরিধি অনেক বিস্তৃত করেছেন। ভাবনা ও তৎপরতার বিভিন্ন প্রকরণ ও প্রণালীর পরিসরকে নিঃসন্দেহে প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করেছেন।
এই বই দুটি বিগত প্রায় দেড়শ বছরের মুসলিম চিন্তা ও কর্মের একটি সংকলন। মুসলিম বিশ্বে পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক প্রসার ও প্রভাবের মোকাবেলায় মুসলিম চিন্তক, সংস্কারক ও পুনরুজ্জীবনকারী বিভিন্ন প্রতিনিধিকে এই বইতে স্থান দেয়া হয়েছে। মূলত উনিশ শতকের মধ্যপর্ব থেকে একুশ শতকের সূচনা পর্যন্ত আধুনিক এবং উত্তরাধুনিক কালপর্ব এই বইতে বিধৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তি মূলত পশ্চিমা জ্ঞানকান্ডকে অনুসরণ করে। এদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম একথার সাক্ষ্য বহন করে। এদেশের লেখালেখি, বই এবং পত্র-পত্রিকাও প্রধানত এই পাশ্চাত্য শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রভাবাধীন। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের বেলায় একথা আরো সত্য।
শুধুমাত্র মাদরাসা ও মসজিদ ভিত্তিক জ্ঞানচর্চায় ইসলামের জ্ঞানকান্ডের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও পার্থিব জ্ঞানচর্চার মধ্যে একটি বিশাল দূরত্ব দৃশ্যমান। পর্যাপ্ত মিথষ্ক্রিয়া নেই এই দুই পরিসরের মধ্যে। জ্ঞানতাত্ত্বিক এই বিভাজন ও বিভক্তি নিয়েই এদেশ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
এই বিভাজিত ও পরস্পর-বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টায় যারা সাম্প্রতিক কালে তৎপর তাঁদের অন্যতম একজন হলেন ডা. ফাহমিদ-উর-রহমান। তাঁর ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ গ্রন্থ দুটি এই পরিস্থিতির আলোকেই লিখিত।
এদেশের জ্ঞানকান্ডের প্রাধিকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এই বই দুটি লেখা হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও দর্শনকে বিশ্ব মুসলিম চিন্তা ও দর্শনের আলোকে রুপান্তরের একটি প্রয়াস হল এই বই দুটি। কাজেই যেসব তরুণ জ্ঞানান্বেষীরা পাশ্চাত্য আধুনিক ও উত্তর আধুনিক বিভিন্ন চিন্তা কাঠামোর সঙ্গে নিজেদেরকে নিয়মিত পরিচিত করছেন, অনুশীলন করছেন তাদের সামনে এই বই দুটি আধুনিক ও উত্তরাধুনিক কালের ইসলামের জ্ঞানভান্ডারের একটি সুনির্বাচিত ও সুসংবদ্ধ বয়ান হাজির করেছে।

ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বই দুটির প্রকাশনা বাংলা ভাষায় ইসলামকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তির পুনর্গঠনে মাইলফলক হয়ে থাকবে। বায়ান্নো থেকে একাত্তর হয়ে পঁচাত্তর পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক সেক্যুলার ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। এর ফলে ইসলামকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতি ক্রমাগত নাগরিক ও আধুনিক শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির কাছে প্রান্তিক ও উপেক্ষিত হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতির উত্তরণে বিগত শতকের নব্বই দশক থেকে যেসব ইসলামকেন্দ্রিক চিন্তক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী অক্লান্ত মেধাশ্রম দিয়ে অবদান রেখে যাচ্ছেন ফাহমিদ-উর-রহমান তাদের অন্যতম।

প্রবীণ কলামিস্ট এবনে গোলাম সামাদের পরে যাদের রচনা এই ক্ষেত্রে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করছে ফাহমিদ-উর-রহমান নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বইয়ের দুটি খন্ডের মাধ্যমে তিনি বাংলাভাষী পাঠকদের সামনে ৫০ জন সেরা মুসলিম চিন্তানায়ক ও কর্মবীরকে পেশ করেছেন। বাংলাভাষী পাঠকদের জ্ঞান ও কর্মপদ্ধতির দিগন্ত এতে নিঃসন্দেহে বিস্তৃত হয়েছে।

বাঙালি মুসলমানকে বুঝে নিতে হবে কারা তাদের অথেনটিক ও অর্গ্যানিক বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কৃতিকর্মী। ইউরোকেন্দ্রিক ও ইন্দোকেন্দ্রিক জ্ঞানকাঠামোর কারাগার থেকে তাদের নিজেদেরকে মুক্ত করতে হবে। আর এই মুক্তি সংগ্রামে ফাহমিদ-উর-রহমানদের মত মনীষার রচনা দিকনির্দেশক হয়ে উঠছে।

চার. উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’বই প্রসঙ্গে কয়েক নোক্তা ক্রিটিকাল পাঠ প্রতিক্রিয়া

“তাজদীদ” এর বাংলা পরিভাষা কি ‘পুনর্জাগরণ’ না ‘নবজাগরণ’: ইসলামকেন্দ্রিক চিন্তক ও ব্যক্তিত্বদের তত্ত্বচিন্তা ও কর্ম বিষয়ে গবেষক ও লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান তার ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ গ্রন্থদ্বয় লিখেছেন। তিনি এর প্রথম খন্ডের ভূমিকায় তার এই বই লেখার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন:
“মুসলিম সমাজে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া, ধনবাদী আধুনিকতা ও নানাবিধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপাদান ‘ইসলামী পুনর্জাগরণবাদ’ বিকাশের অন্যতম পূর্বলক্ষণ হলেও ঐতিহাসিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নিজের অন্তর্শক্তি ও প্রাণশক্তির জোরে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলামের জেগে ওঠার এক নিজস্ব প্রবণতাও রয়েছে, যাকে আমরা বলি তাজদীদ। এই তাজদীদও ইসলামী পুনর্জাগরণবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।”
তাহলে দেখা যাচ্ছে তিনি উপনিবেশ ও উপনিবেশ উত্তর কালের মুসলিম চিন্তক ও ব্যক্তিত্বদের যেসব তত্ত্ব ও কর্ম নিয়ে এই বইতে আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছেন সেসবকে তিনি ইসলামের এই ধারাবাহিক তাজদীদি ধারার অন্তর্ভুক্ত বলে খুব সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তিনি তাজদীদ প্রত্যয়ের জন্য যে বাংলা পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন সেটি হল “পুনর্জাগরণ”। অথচ তাজদীদ ধারণাটি আসলে অনেক ব্যাপক। এর মধ্যে যেসব নুয়ান্স বা গূঢ়ার্থ সুপ্ত রয়েছে তা যতটা না “ইহইয়া” বা “পুনর্জাগরণ” বাচক তার চাইতে বেশি “নবজাগরণ” বা “পুনর্গঠন” বাচক কিংবা “ইসলাহ” বা “সংস্কার” বাচক।
কাজেই তাজদীদকে শুধুমাত্র “পুনর্জাগরণ” অর্থে ব্যবহার বা প্রয়োগ করলে তা এক সংকুচিত এবং সীমিত দ্যোতনা ও তাৎপর্য বহন করে। যা যে সকল উনিশ ও বিশ শতকের মুসলিম চিন্তক ও কর্মবীরকে এই বইতে উপস্থাপন করা হয়েছে তাদের তত্ত্ব ও কর্মকান্ডের বিভিন্ন ও বিচিত্রমুখী প্রকরণ ও প্রণালীকে ধারণ করতে পারে না।

যেমন উপমহাদেশের দেওবন্দী-কওমী এবং জাজিরাতুল আরবের সালাফী-ওয়াহাবি আলেমরা হলেন যথার্থ অর্থে “পুনর্জাগরণবাদী”। কিন্তু উপমহাদেশের কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবাল হলেন “নবজীবনবাদী” বা “পুনর্গঠনবাদী”। মিশরের মুহাম্মদ আবদুহু এবং সিরিয়ার রশিদ রিদা আবার ইসলাহী বা “সংস্কারবাদী”।

মোট কথা হল তাজদীদ একটি লোডেড বা গর্ভবতী পরিভাষা। এটি মোটেই একমাত্রিক কিংবা এককাট্টা নয়। এরও রয়েছে ডিসকার্সিভ ডেপথ ও রেঞ্জ বা বয়ানীয় গভীরতা ও ব্যাপ্তি। এভাবে তাজদীদ পরিভাষার অবিনির্মাণ করলে তা এক বিপুল ও বিচিত্র জ্ঞানকান্ডিক পরিসরণ বা প্যারাডাইম শিফটের সূচনা করে।
ফাহমিদ-উর-রহমানের লেখা ভূমিকা পাঠ করে তার বয়ানের দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি নজরে আসে সেটি হল তিনি ইসলামের ইতিহাসের গতিধারাকে কিছুটা একজন প্রাচ্যবাদীর মত ইউরোপীয় ইতিহাসের গতিধারার আলোকে পূর্বনির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ আধুনিক ইউরোপের ঢঙে মুসলিম বিশ্বেও ইউরোপীয় রেনেসাঁর মত একটা কিছু ঘটেছে বা ঘটবে বলে তিনি একটি প্রত্যাশাকে বহন করেছেন। কিন্তু মুসলিম ইতিহাসের গতিধারা তো স্বতন্ত্র। এর রয়েছে এক ভিন্ন জ্ঞানকান্ডিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য। আখলাকী ও আখিরাতী ভিন্নমাত্রার মূল্যবোধ ও বিবেকী বিবেচনা মাথায় রেখে একে অগ্রসর হতে হয়। ফলে এর গতিপথ ও পদ্ধতিতে ইউরোপের ইতিহাসের একরৈখিক পুনরাবৃত্তি হবে না বলে মনে হয়।
‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বইদ্বয়ের বয়ানটি মূলত সংকলন ও সারাংশ ধর্মী। গবেষক ও লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান এক্ষেত্রে এক বিশাল মেধাশ্রমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পঞ্চাশ জন চিন্তক, লেখক ও কর্মবীরের উপরে নিবন্ধ লিখতে গিয়ে তাকে প্রাইমারী ও সেকেন্ডারি সোর্স মিলিয়ে ব্যাপক পঠন-পাঠন ও গবেষণা করতে হয়েছে। এরপরে পঠিত ও গবেষণাকৃত বিষয় ও ব্যক্তিত্বের তত্ত্ব এবং কর্মের সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনার জন্য এক দুষ্কর সারাংশ ও সংকলন ধর্মী বয়ান হাজির করতে হয়েছে। তথ্য ও তত্ত্বের মাঝে বুনতে হয়েছে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন। এ এক মহাকৃতির গার্গান্টুয়ান বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। ফাহমিদ-উর-রহমান অত্যন্ত পরিশ্রম করে এই কাজটি অনেক বছর ধরে সম্পন্ন করেছেন। এই বই দুইটি এই ব্যাপক পঠন-পাঠন, গবেষণা এবং লেখালেখির ফসল। বাংলা ভাষায় এই ধরনের বড় ক্যানভাসের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ বেশ বিরলই বলা যায়। এই উপকারী কাজের জন্য সম্মানিত লেখক বাংলা ভাষার মননশীল পাঠকসমাজের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার ন্যায্য দাবীদার।
আশা করব যে মননশীল পাঠকেরা এই বই পড়ে এখানে সংকলিত বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের চিন্তা ও কর্ম নিয়ে আরো বিস্তৃত পঠন-পাঠন ও বিশ্লেষণ-মূল্যায়নে উদ্বুদ্ধ হবেন। তারা এখানে অন্তর্ভুক্ত চিন্তক ও কর্মবীরদের বিভিন্ন প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে এদেরকে বিভিন্ন বর্গে ও শ্রেণিতে বিভক্ত করবেন। এইসব বিভিন্ন প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন তা নির্ধারণ করবেন। যেমন এদের মধ্যে অন্তর ও আন্ত মোলাকাত ও মোকাবেলা উভয় দিকগুলোই চিহ্নিত করবেন। তুলনামূলক এবং আপেক্ষিক আলোচনা ও পর্যালোচনার সূত্রপাত করবেন। আর যারা নিজেরাই চিন্তা ও কর্মের এই ধারাগুলিতে অবদান রাখতে চান তাদের কাজ হবে এদের চিন্তা ও কাজের আপডেট ও আপগ্রেড করার চেষ্টা করা। আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে হয়তো লেখক নিজেও ভবিষ্যত কোনো সংস্করণে এই বই দুটিতে অন্তর্ভুক্ত চিন্তা ও কর্মমালার উপরে পদ্ধতিগতভাবে বর্গ বিভাগ ও শ্রেণিকরণ প্রয়োগ করে এখানে বিধৃত সময়ের মূল প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যগুলি পাঠকদের সামনে চিহ্নিত ও উপস্থাপন করবেন। যাতে করে সাধারণ পাঠকের জন্য এই বইয়ের ব্যাপক ও বিচিত্র বিষয়বস্তু থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষা ও দীক্ষার ফায়দা গ্রহণ করা আরো সহজতর হয়ে যায়।

পাঁচ. ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ও ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’: দুটি বই নিয়ে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইতে আহমদ ছফা আম ও খাস উভয় ধরনের বাঙালি মুসলমানের মন সম্পর্কে একটি সামষ্টিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপহার দিয়েছেন। আলবৎ এই বিশ্লেষণ বাঙালি মুসলমানের মানস সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ও হীনমন্য চিত্র এঁকেছে। কিন্তু এই বিশ্লেষণ যতই একরৈখিক বা একমাত্রিক হোক না কেন এই বিশ্লেষণের মধ্যে আহমদ ছফা পুরোপুরি হাজির আছেন। এটি বাঙালি মুসলমানের মন সম্পর্কে একান্ত তারই নিজস্ব বিশ্লেষণ ও বয়ান। এই লেখায় তার ইডিওসিনক্র্যাটিক সাইকোএনালিটিক ডিসকোর্স পাওয়া যায়—যা থেকে তার চিন্তার ধরন ও কাঠামো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছফার বক্তব্য/কন্টেন্ট নিয়ে আমার বা আপনার আপত্তি থাকতে পারে; কিন্তু তার এই স্বকীয় বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত মৌলিকতা ও অনন্যতাকে আমাদের কৃতিত্ব দিতেই হবে।
পক্ষান্তরে ডা. ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বইতে আমরা প্রথমত পাই এমন একটা মুসলিম মনের চিত্র যেটি কেবলমাত্র বাঙালি মুসলমানের মনের চিত্র নয়; এটি একটি বৃহত্তর মুসলিম মনের চিত্র—যার ভেতরে দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশ, আরব বিশ্ব ও পাশ্চাত্যের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে; বাংলাদেশের একটি ক্ষীণ অস্তিত্বও সেখানে আছে বটে। দ্বিতীয়ত তিনি ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বলতে যা উপস্থাপন করেছেন তা আসলে খাস কয়েকজন মুসলিম মনীষীর চিন্তার একটি সংকলন; এখানে আম মুসলিমদের সামষ্টিক চিন্তা বা মানস জগতের কোন প্রতিচিত্র পাওয়া যায় না; এটি এই কারণে একটি একক ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রীক আলাদা আলাদা ব্যষ্টিক চিত্র; এখানে উত্তর আধুনিক কালের আম ও খাস উভয় ধরনের মুসলিম মনের কোন সামষ্টিক বা সম্পূর্ণ চিত্র গরহাজির। আর সেইসঙ্গে এই লেখায় লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান নিজে যেন এই পঁচিশজন মনীষার চিন্তার আড়ালেই চুপিসারে থেকে গেছেন; উত্তর আধুনিক মুসলিম মন সম্পর্কে তার নিজস্ব সামষ্টিক বিশ্লেষণ বা বয়ান কী—সেটার হদিস আর পাঠকরা শেষপর্যন্ত করতে পারেন না। অন্যান্যদের চিন্তার একটি মহার্ঘ্য সংকলন হিশেবেই বইটি হাজির থাকে শেষপর্যন্ত। লেখককে ছাপিয়ে ওঠে লেখকের নির্বাচিত চিন্তকবৃন্দ ও তাদের বয়ান। লেখক হয়ে যান অদৃশ্য।

ছফার বইটিতে ছফা হাজির থাকেন বইটির ষোল আনা জুড়ে। আর ফাহমিদের বইটিতে তার নির্বাচিত মনীষীরা প্রবল প্রতাপের সাথে হাজির থাকেন, কিন্তু তিনি থাকেন নেপথ্যে। এটিই হল এই দুই বইয়ের প্রধানতম পদ্ধতিগত পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য।
আহমদ ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইতে বাঙালি মুসলমানের মানস গঠনের একটি ইতিবৃত্ত হাজির করেছেন। তিনি এই মানসকে অস্থিরচিত্ত, পল্লবগ্রাহী, উপরিতলীয়, অনুকরণপ্রিয়, অমৌলিক, মহত্বহীন এবং হীনমন্য ইত্যাদি নেতিবাচক অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন। তার চিত্তাকর্ষক ভাষায় এই প্রস্তাবনার সপক্ষে একটি যুক্তিতথ্য বিন্যাস তিনি উপস্থাপন করেছেন—যা এখন পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের মানস গঠন সম্পর্কে একটি প্রভাবশালী বয়ান হিশেবে বাঙালি সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানকান্ডে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

আহমদ ছফার এই বয়ান বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও ভাব প্রক্রিয়ার একটি নেতিবাচক প্রণালী সম্পর্কে আলোকপাত করেছে একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এটি এই বিষয়ের সম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। এই মানস দুর্বলতাকে অতিক্রম করার একটি প্রচেষ্টাও বাঙালি মুসলমানের মনে সর্বকালে হাজির ছিল এবং এখনো আছে বৈকি। তাহলে এখন প্রশ্ন হল কিভাবে এই ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক মানস দুর্বলতা অতিক্রম করে বাঙালি মুসলমান বিংশ শতক পেরিয়ে এখন একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে?

এই প্রশ্নের একটি উত্তর আমরা পেতে পারি ডা. ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ গ্রন্থে। এই বইতে ফাহমিদ-উর-রহমান বাঙালি মুসলমানের চেতনাজগতের পুষ্টি সাধনে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পথনক্সা এঁকেছেন।

এই পথনক্সাটি মোটেই একরৈখিক বা একমাত্রিক নয়। এই বয়ান একটি সাঙ্কলিক পথনক্সা উপস্থাপন করেছে উত্তর আধুনিক বাঙালি মুসলিম মননের জন্য। এই পথনক্সার বয়ানে যেমন রয়েছে স্বাদেশিক স্বাতন্ত্র্যবাদী মননশীলদের অংশগ্রহণ, তেমনি সেখানে রয়েছে উপমহাদেশ, মুসলিম বিশ্ব ও এমনকি পাশ্চাত্যের বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক মাননিক নায়কদের আনুপাতিক অবস্থান ও উপস্থিতি। কাজেই এই বইয়ে বাঙালি মুসলিম মনের জন্য যে বয়ানমালা প্রস্তাব করা হয়েছে তা একটি আশাবাদী ও গঠনমূলক স্থানিক ও আন্তর্জাতিক বয়ান; যার ভেতর দিয়ে বাঙালি মুসলমানের মন আহমদ ছফা বর্ণিত চৈন্তিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতাগুলি অতিক্রম করে একটি বৈশ্বিক মুসলিম মাননিক পথনক্সায় নিজের স্থানাঙ্ক নির্ণয় করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।
আমরা শুধু আরেকটু প্রত্যাশা করতে পারি যে এই সাঙ্কলিক বয়ানমালায় অদূর ভবিষ্যতে ডা. ফাহমিদ-উর-রহমান সহ আরো অন্যান্য সাম্প্রতিক বাঙালি মুসলিম চিন্তকরা তাদের নিজস্ব বয়ান নিয়ে সগৌরবে হাজির থাকবেন, স্থান পাবেন। তাহলে এই বয়ানটি আরো বেশি আত্মনির্ভরশীল ও স্থানিক প্রেক্ষিতের জন্য অভিযোজিত এবং উপযোগী (Contextualized) বলে প্রতীয়মান হবে।
বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির পদ্ধতি মূলত ইতিহাস ও সাহিত্য নির্ভর। ইতিহাস ও সাহিত্যের পদ্ধতিও মূলত বর্ণনামূলক, ব্যক্তির জীবনী ভিত্তিক অথবা রাজবংশ ভিত্তিক বা সাধারণভাবে বংশানুক্রমিক।
খুব কম ক্ষেত্রেই এদেশে বুদ্ধিবৃত্তির দার্শনিক পদ্ধতি অনুসৃত হতে দেখা যায়। যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তির মূল স্রোত ইতিহাস ও সাহিত্য নির্ভর, সেহেতু ইতিহাস বা সাহিত্য দার্শনিক ভাবে যদি উপস্থাপিত হয়েও থাকে তবে তা মূলত মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি নির্ভর। জ্ঞানতাত্ত্বিক বা অস্তিত্বতাত্ত্বিক পদ্ধতির ব্যবহার বড় কদাচিৎ দেখা যায়; প্রায় নাই বললেই চলে।
যেমন ধরুন আহমদ ছফার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। এটির বিশ্লেষণ পদ্ধতি মনস্তাত্ত্বিক এবং এই কারণে এটি গতানুগতিক বর্ণনামূলক বা জীবনীমূলক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। সেকারণে এই বইটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তির পদ্ধতিগত ধারায় একটি সেলিব্রেটেড মাইলফলক হয়ে উঠেছে। এর কন্টেন্ট নিয়ে আমার বা আপনার আপত্তি থাকতে পারে। সেটা চিন্তার মৌলিক প্যারাডাইমের দিক থেকে। কিন্তু ডিসকোর্সের পদ্ধতিগত দিক থেকে এর স্বাতন্ত্র্য ও অনন্যতাকে ক্রেডিট দিতেই হবে।
অপরদিকে ডা. ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ কন্টেন্টের দিক থেকে বাঙালি মুসলিমের সামনে হাজির করেছে অনেক অনুসরণীয় চিন্তামালাকে; তা সে যদিও মূলত আমদানিকৃত ভিনদেশী চিন্তা; তবে অল্প কয়েকটি দেশীয় চিন্তা সেখানে তাদের ক্ষীণ অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে বটে। হয়ত এমন একটি যুক্তি লেখক দেখাতে চাইবেন যে মুসলিম চিন্তা এত আন্তর্জাতিক যে একে দেশী-বিদেশী এই বিভক্তির আলোকে না দেখাই ভাল।
যাহোক ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বইয়ের কন্টেন্টের মাহাত্ম্য নিয়ে আপাতত কোন প্রশ্ন না তুলেও এই বইয়ের পরিবেশন পদ্ধতিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই বই কিন্তু মোটা দাগে বলতে গেলে বর্ণনামূলক ও জীবনীভিত্তিক পদ্ধতিকেই অবলম্বন করেছে; অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রচলিত ইতিহাস ও সাহিত্য নির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাকেই অনুসরণ করেছে; জ্ঞানতাত্ত্বিক বা অস্তিত্বতাত্ত্বিক কিংবা এমনকি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বা ডিসকার্সিভ মেথডলজিতে এর মূল্যবান কন্টেন্টকে উপস্থাপন করেনি।

ছয়. ইসলামিকতার বয়ানে উত্তরআধুনিকতা
‘উত্তরআধুনিকতা’ বইতে ফাহমিদ-উর-রহমান তিনটি থিমের অধীনে বিষয়বস্তুর বিন্যাস করেছেন—উত্তরআধুনিকতা, ওরিয়েন্টালিজম এবং সভ্যতার দ্বন্দ্ব।
প্রথম থিম উত্তরআধুনিকতার অধীনে তিনি সাতটি নিবন্ধ সন্নিবিষ্ট করেছেন। আর এই থিমটিকে তিনি প্রাধিকার দিয়েছেন তার বয়ান প্রণয়নের ক্ষেত্রে। এমনকি বইয়ের শিরোনাম দিয়েছেন এই থিমের দ্বারাই। কাজেই এই থিমটি যে তার বয়ান প্রণয়নে নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে সেটি সহজেই বোধগম্য।
উত্তরআধুনিকতা নিয়ে ফাহমিদ-উর-রহমানের এই বয়ান প্রায় দুই দশক আগে তিনি প্রণয়ন করেছিলেন। সেটির একটি পরিমার্জিত এবং পরিবর্ধিত সংস্করণ তিনি হাজির করেছেন এই নতুন দ্বিতীয় সংস্করণে।
উত্তরআধুনিকতার বয়ান প্রণয়ন করতে গিয়ে তিনি অনিবার্যভাবেই শুরু করেছেন আধুনিকতার বয়ান দিয়ে। কারণ আধুনিকতার বয়ানের ধারাক্রমেই উত্তরআধুনিকতার উৎপত্তি ও বিকাশ। সময়ের দিক থেকে এই দুটি প্রত্যয়ের মধ্যে রয়েছে একটি পরম্পরা। আবার ধারণাগত দিক থেকেও এই দুটির মধ্যে রয়েছে একটি সম্পর্ক। উত্তরআধুনিকতা মূলত আধুনিকতার পর্যালোচনা ও সমালোচনা। এই পর্যালোচনা থেকে যদিও কোনো উত্তরণের সম্ভাবনা তৈরি হয় না বলেই ফাহমিদ-উর-রহমান মনে করেন।
দুটি ধারণাই যে পশ্চিমকেন্দ্রিক সেটিও লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান পরিস্ফুট করেছেন। পশ্চিম থেকে এই দুই বিশ্ববীক্ষার এদেশে আগমনের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কৃত্রিমতা ও আরোপণ উল্লেখ করতেও তিনি ভোলেন নি। আর দুটি পর্যায়েই তিনি ইসলামিকতার বৃত্তে অবস্থান গ্রহণ করে এই কৃত্রিম আরোপণকে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করেছেন।

মোলাকাত ও মোকাবেলা করেছেন। বিচার ও মূল্যায়ণ করেছেন।
লক্ষ্যণীয় যে তিনি সময়রেখাগত এবং ধারণাগত রেফারেন্স পয়েন্ট কিংবা উল্লেখবিন্দু আহরণ করেছেন মূলত পশ্চিমা এই দুটি ধারণা-নির্ভর পরিভাষা ও প্রত্যয়কাঠামো থেকে। কিন্তু তিনি ইসলামিকতা নির্ভর একটি প্রতিকল্প বা বিকল্প সবসময় সমান্তরাল বা বিপ্রতীপে হাজির রেখেছেন। এর মধ্য দিয়ে ফাহমিদ-উর-রহমান আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতার ধারাবাহিক বয়ানসমষ্টিকে চৈন্তিকভাবে প্রতিহত অথবা প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন।

তার এই ইসলামিকতার বয়ান তিনি প্রণয়ন করেছেন ইসলামের ধ্রুপদী সময়কালের সোনালি উৎকর্ষের আলোকে। পরে সেখানে যুক্ত করেছেন অবক্ষয় ও পতন পরবর্তী তাজদীদের বয়ান ও প্রতিবয়ান। যেখানে তার প্রিয় অনুষঙ্গ হিশেবে উল্লেখিত হয়েছেন আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল—তার তাজদীদি তাহজীব, তমদ্দুন ও আদব। তবে লেখক ফাহমিদ নিজেই উল্লেখ করেছেন যে তার বয়ান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি পাকিস্তানী নৃতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবি আকবর এস. আহমেদের রচনা দ্বারা প্রভূত প্রভাবিত হয়েছেন।

বাংলা অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষিতের ক্ষেত্রে এই তাজদীদের ধারায় যুক্ত করেছেন মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মুন্সী মেহেরুল্লাহ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আবুল মনসুর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, সৈয়দ আলী আশরাফ, ফররুখ আহমদ, এবনে গোলাম সামাদ, মওলানা মুহীউদ্দীন খান প্রমুখের নাম, রচনা ও কর্মকান্ড।

এভাবে তিনি ইসলামিকতার মহাবয়ানের অন্তর্ভুক্ত একটি স্থান-কাল সাপেক্ষ নিজস্ব অনুবয়ানও প্রণয়ন করেছেন। আর সেটিই উদ্ভাসিত ও উন্মোচিত হয়েছে সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির বয়ানকার হিশেবে ফাহমিদ-উর-রহমানের একান্ত আপন বয়ান কিংবা বিশ্ববীক্ষা হিশেবে। একে তিনি এই দেশের প্রেক্ষিতে নিজস্ব আধুনিকতা এবং উত্তরআধুনিকতা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
লেখকের এই মহাবয়ান ও অনুবয়ানে অবগাহন করলেই পাঠক এক পরিব্রাজনের অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞা আহরণ করে সমৃদ্ধ হতে পারবেন।
‘উত্তরআধুনিকতা’ বইয়ে ফাহমিদ-উর-রহমান আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতা বিষয়ে একটি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি সাধারণত তার অন্যান্য মেজর বইগুলিতে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের চিন্তাকে উপস্থাপন করে থাকেন। সেসব বইয়ে তার আলোচ্য ব্যক্তিত্ব ও বিষয় প্রবলভাবে হাজির থাকলেও লেখক নিজে ততটা হাজির থাকেন না। কিন্তু ‘উত্তরআধুনিকতা’ বইটি একদিকে যেমন ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রিক নয় তেমনি এখানে আলোচ্য মূল বিষয়ের সূত্রে ভাবুক ও লেখক ফাহমিদ-উর-রহমানের নিজস্ব অবস্থান ও বীক্ষা উন্মোচিত হয়েছে।
তিনটি থিম আশ্রয় করে এই বইতে ফাহমিদ-উর-রহমানের আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতা বিষয়ে জোরালো অবস্থান উঠে এসেছে। তিনি শুরুতেই অত্যন্ত তীব্রভাবে দেখিয়েছেন যে এদেশে আধুনিকতা এসেছিল ঔপনিবেশিকতার সূত্রে। কাজেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ঔপনিবেশিক শাসনকে অব্যাহত রাখার বাসনা। সেই সঙ্গে ছিল দেশীয় একটি শ্রেণির সমর্থন ও অতিউৎসাহ। উনিশ শতকে এরা ছিল মূলত কলকাতা নগর ভিত্তিক এবং বর্ণ হিন্দু।
আর বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশভাগের পরে ঢাকাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সেখানে কলকাতার প্রভাব ছিল ব্যাপক ও গভীর। ষাট দশকে ঢাকায় বুদ্ধদেব বসু কৃত ফরাসি আধুনিক কবি শার্ল বোদলেয়ারের বাংলা অনুবাদ নিয়ে ঢাকার উঠতি কবি সাহিত্যিকদের অতিউৎসাহকে ফাহমিদ যথার্থভাবে একটা উপরিতলীয় ফ্যাশন হিশেবেই দেখিয়েছেন। এর ফলে জসীম উদ‌্দীনের দেশীয় লোকজ বীক্ষা উপেক্ষিত হয়েছে। আবার অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান কিংবা সৈয়দ আলী আশরাফ প্রমুখদের অনুসৃত ইসলামিকতা ভিত্তিক আধুনিকতা যথেষ্ট দৃষ্টিগোচর হয়নি। কলকাতার তিরিশ দশকের পঞ্চপান্ডবদের অনুরণনেই ঢাকার মেধাবী তরুণরা তাদের স্যালভেশন খুঁজেছিল।
একইভাবে বিশ শতকের নব্বই দশকে উত্তরআধুনিকতা কলকাতা হয়ে ঢাকার তরুণ সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির মহলে এসে হাজির হয়েছিল। এটিও একটি পশ্চিমকেন্দ্রিক ধারণা। ঢাকার নব্য তরুণরা এটিকে নিয়েও মেতে উঠল। অথচ এই ধারণাটি মার্কসবাদসহ পশ্চিমা আধুনিকতার একটি পর্যালোচনা ও সমালোচনা হলেও এতে উত্তরণের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। আর বাংলাদেশের মত একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক মুসলিম প্রধান দেশের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তি একে গ্রহণ করার জন্য কতটুকু অনুকূল ও প্রস্তুত সেই বিবেচনাটুকু ফাহমিদ মনে করেন যে এই তরুণরা করেনি। তারাও উত্তরআধুনিকতার চোখধাঁধানো ফ্যাশনে প্লাবিত হয়েছে।
অথচ এসব প্রত্যয়গুলিকে দেশীয় প্রেক্ষিতে পাঠ ও বিবেচনা করলে দেখা যাবে এসবের কাঁধে ভর দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে নিও-লিবারেল কিংবা নিও-কন গ্লোবালাইজেশনের বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের প্রজেক্টগুলি। যার নাম কখনো ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’, ‘প্রজেক্ট ফর নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ অথবা ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ ইত্যাদি। অর্থাৎ উত্তর-ঔপনিবেশিক কালে একটি নয়া ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ ও হায়ারার্কি বজায় রাখার মতাদর্শিক কাঠামো হিশেবে এই প্রত্যয়গুলি ব্যবহৃত হচ্ছে। তাহলে এগুলির প্রতি অবিবেচকের মত অতিউৎসাহ দেখাবার এত কি আছে?
ফাহমিদ-উর-রহমান এদেশের তরুণদেরকে এসব ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন হবার তাগিদ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে যা করা যেতে পারে তা হল এদেশের জন্য উপযোগী একটি আধুনিকতা কিংবা উত্তরআধুনিকতার উদ্ভাবন ও বিকাশ। আর সেখানে ইসলামিকতার একটা বড় ভূমিকা থাকবে নিশ্চয়ই।

ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘উত্তরআধুনিকতা’ বইটির দ্বিতীয় থিম হল ওরিয়েন্টালিজম। এই থিমের অধীনে চারটি নিবন্ধ লিখিত হয়েছে। নিবন্ধগুলিতে ওরিয়েন্টালিজম ধারণার উত্থান, প্রচার ও প্রভাব নিয়ে আলোচনার সূত্রে ফাহমিদ-উর-রহমান শুধু বর্ণনামূলক বয়ান দেননি; বরঞ্চ তিনি এই প্রত্যয়ের উত্থানকে স্বাগত জানালেও এই প্রসঙ্গে অভিমত জানিয়েছেন যে এই প্রত্যয়টি আসলে খুব নতুন কিছু নয়। তিনি মনে করেন যে এই প্রত্যয়ের উদ্ভাবক এডওয়ার্ড সাঈদের আগেই উনিশ শতকে প্যান-ইসলামিস্ট জামালউদ্দীন আফগানী এবং বিশ শতকে প্রাচ্যের কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল একই কথা বলেছেন। তিনি এও মনে করেন যে এই বিষয়ে এরা দুজন যা বলেছেন তা মাত্রা ও গুণে আরো ব্যাপক ও শক্তিমান।

এডওয়ার্ড সাঈদ ওরিয়েন্টালিজমের পর্যালোচনা ও সমালোচনা করলেও তার লেখা থেকে কোনো বিকল্প তৈরি হয় না। কিন্তু আফগানী ও ইকবাল শুধু পশ্চিমা সম্রাজ্যবাদের সমালোচকই ছিলেন না; তারা এর বিকল্প এক ইসলামী সভ্যতার রূপরেখাও তুলে ধরেছিলেন। সুতরাং ফাহমিদ উর রহমান প্রশ্ন তুলছেন যে সাঈদকে নিয়ে এত মাতামাতির কি আছে? এর পেছনেও আছে এদেশীয় শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির হীনমন্যতা, পশ্চিমপ্রীতি এবং ছুপা ইসলামোফোবিয়া।

এই একই কথা ফাহমিদ-উর-রহমান দেখাতে চেয়েছেন এডওয়ার্ড সাঈদের সঙ্গে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মুন্সী মেহেরুল্লাহ এবং সৈয়দ আলী আশরাফের চিন্তা ও কাজের তুলনা করে। ফাহমিদ বলতে চেয়েছেন যে সাঈদ যা বলেছেন তার অনেক আগেই এই তিনজন এর চেয়ে অনেক বেশি বলেছেন ও করেছেন। আর এই তিনজন শুধু ক্রিটিকই করেননি, এরা হাতে কলমে কাজ করে নিজ নিজ রূপে একটি ইসলামী বিকল্প কাঠামো পরিস্ফুট করেছেন।
তাহলে বাঙালি মুসলমান তরুণেরা কেন এদেরকে ভুলে গিয়ে, উপেক্ষা করে, অবজ্ঞা করে ঐ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়ে সবরকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করা, মিডিয়াতে প্রচার ও পরিচিতি লাভ করা সাঈদের জন্য মেতে ওঠে? এখানেও রয়েছে সাঈদের পশ্চিমায়িত জীবনশৈলীর আড়ালে মুখ লুকিয়ে কথিত ইসলামী “মোল্লা”, “মৌলবাদী”, “সন্ত্রাসবাদী”, “জঙ্গী” ইত্যাদি তকমা থেকে পালানোর এক চেষ্টা।
ফাহমিদ-উর-রহমান ওরিয়েন্টালিজমের যে ক্রিটিক করেছেন তা অভূতপূর্ব। এখানে তিনি যে সাহস এবং মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছেন তা অনন্য এবং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। প্রাচ্যবাদের সমালোচনা কেন সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান হয়ে থাকবে? কেন সেখানে পাল্টা বয়ান ও কর্মপন্থা আরো মূর্ত ও জোরালো হয়ে উঠবে না? কেন নিজস্ব সমাজ ও সভ্যতা থেকেই এসবের উৎপত্তি ও বিকাশ যারা করেছেন তাদেরকে আমরা স্মরণীয় বরণীয় করে তুলবো না? এসব অত্যন্ত জরুরী ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তিনি সাহস ও আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে তুলে ধরে একটি বড় কাজ করেছেন। তার এই রচনার মাধ্যমে এদেশের বাঙালি মুসলিমদের একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বিশ্ববীক্ষা এবং কর্মকৌশল উপস্থাপিত হয়েছে। এর জন্য তিনি অবশ্যই আমাদের অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতার দাবীদার।
ফাহমিদের এই সাহসী প্রশ্নাবলীর আলোকে একটা কথা বলা প্রয়োজন। যেসব ইউরোকেন্দ্রিক লেখক ও চিন্তকেরা এখনো এদেশের বুদ্ধিবৃত্তি এবং সাহিত্যে আধুনিকতা, উত্তরআধুনিকতা, ওরিয়েন্টালিজম ইত্যাদি প্রত্যয়কে মাথায় তুলে মাতামাতি করছেন তাদের হীনমন্যতা ও অতিচালাকি চিহ্নিত করে তাদেরকে উন্মোচিত করা প্রয়োজন।
গ্রামসি, লাকাঁ, ফুকো, দেরিদা, সাঈদ প্রমুখকে যারা সংকট থেকে উত্তরণের নিদান মনে করে দিবারাত্রি উতলা থাকছেন তাদের হুঁশ ফিরে আসা দরকার। অথবা একই চেতনায় স্থানীয় ও লোকজ জ্ঞানের পুনরুদ্ধারের নামে চৈতন্য, নিতাই ও লালনের ভেতরে বিভিন্ন মাম্বো জাম্বো তত্ত্ব আরোপ করা সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।
মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মুন্সী মেহেরুল্লাহ এবং সৈয়দ আলী আশরাফ প্রমুখদের এভাবে ভুলিয়ে দিয়ে গৌণ করে দেয়াকে মেনে নেয়া যায় না।

ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘উত্তরআধুনিকতা’ বইটির তৃতীয় থিম হল ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’। এই থিমের অধীনে তিনি সাতটি নিবন্ধ লিখেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যামুয়েল পি হান্টিংটন ‘দ্যা ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন্স’ নামক একটি বই লিখেছিলেন। সেই বইতে হান্টিংটন ঠান্ডা যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থাকে বিদ্যমান সভ্যতাগুলির মধ্যে সংঘাত আকারে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এটি ‘সভ্যতার সংঘাত’ কিংবা ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ তত্ত্ব নামে বিপুলভাবে আলোচিত হয়েছে। ১৯৯০-৯১ সাল থেকে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রথম পর্ব থেকে শুরু করে আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে উদীয়মান মুসলিম সভ্যতার যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে তা হান্টিংটনের থিসিসের প্রতি অনেককেই আগ্রহী করে তুলেছে।
ফাহমিদ-উর-রহমানও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই তত্ত্বের আলোকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতন পরবর্তী বিশ্ব ইতিহাসের একটি বয়ান তার ‘উত্তরআধুনিকতা’ বইয়ের তৃতীয় থিমের অধীনে উপস্থাপন করেছেন। তিনি হান্টিংটনের তত্ত্ব থেকে পশ্চিমা সভ্যতা ও ইসলামীয় সভ্যতার দ্বন্দ্বটিতে মূলত দৃষ্টিপাত করেছেন।
তার আলোচ্য সময়কালের শুরু হিশেবে ধরা যায় বিশ শতকের নব্বই দশক আর শেষ হিশেবে ধরা যায় ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ পরবর্তী আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ পরবর্তী ২০০৩-৪ সাল পর্যন্ত। সমকালের এইসব ঘটনার একটা বিবরণী পাওয়া যায় তার এই নিবন্ধগুলিতে। তবে আলোচনার প্রয়োজনে তিনি আরো দূর অতীতে চলে যেতেও কুণ্ঠা বোধ করেন নি। তার আলোচনা ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে আবর্তিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশ ও বৃহৎ বঙ্গও এই আলোচনায় প্রায়শই উঠে এসেছে।


পশ্চিমা সভ্যতাকে তিনি ইসলামীয় সভ্যতার পাটাতন থেকে দেখেছেন ও মূল্যায়ণ করেছেন। তিনি একে আধুনিক যুক্তি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্প বিপ্লবের আধার হিশেবে দেখেছেন। কিন্তু একইসঙ্গে এর ইতিহাসে ক্রুসেড, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, পুঁজিবাদ, শোষণ, লুণ্ঠন, যুদ্ধ-মহাযুদ্ধ, গণহত্যা ইত্যাদির প্রতি আরো বেশি করে ফোকাস করেছেন। কারণ মুসলিম সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে পাশ্চাত্য সভ্যতার এসব চারিত্রই বেশি প্রাসঙ্গিক ও প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি তিনি পাশ্চাত্য কিভাবে মুসলিম সভ্যতাকে বরাবর দেখে এসেছে সেটিরও এক বিশ্বাসযোগ্য চিত্র তুলে ধরেছেন।
পাশ্চাত্য সভ্যতা মুসলিম সভ্যতার উপরে আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। কিন্তু মুসলিম সভ্যতাও তার অন্তর্নিহিত সংস্কার ও পুনর্জীবনী শক্তি সঞ্চয় করে বারবার এই প্রক্রিয়ার বিপরীতে জেগে উঠেছে। এই জাগরণমূলক তৎপরতাকে কখনো প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মান্ধ, মধ্যযুগীয়, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গী ইত্যাদি তকমা দিয়ে গৌণ ও অন্যায্য কিংবা বর্বর হিশেবে দেখাবার চেষ্টা করেছে এই পশ্চিমা সভ্যতা।
পশ্চিম ও ইসলামের এই সভ্যতাগত সম্পর্ককে ফাহমিদ উর রহমান বিস্তারিত তথ্যের সন্নিবেশ করে উপস্থাপন করেছেন। তিনি এটি ঘটনার বর্ণনা আকারে করেছেন; আবার মাঝেমাঝে এই দুই সভ্যতার মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির বিপরীতমুখী পার্থক্যগুলির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আকারেও করেছেন।
এই ঘটনাপুঞ্জের বিস্তারিত তথ্যসমেত বিবরণ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফাহমিদ-উর-রহমান ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতার প্রতি তার আনুগত্য, সমর্থন ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তিনি ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতার সংকটভেদী পুনরুত্থান ও পুনর্জাগরণের জন্য তার উন্মুখ বেদনা ও আশাবাদ পরিস্ফুট করেছেন। ইসলামের প্রতি তার তীব্র আস্থা ও বিশ্বাস তার প্রতিটি নিবন্ধের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে অনুস্যূত হয়ে আছে।
তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক নেতিবাচকতার সমালোচনা করে সেসব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিবাচক অনুষঙ্গগুলির প্রতি তার আগ্রহ প্রকাশ করতে কুণ্ঠিত হননি। এসব ক্ষেত্রে তিনি ইসলামের যে রূপরেখাটি বারবার সামনে নিয়ে আসেন সেটির সূত্র হিশেবে উল্লেখ করেন জামালউদ্দীন আফগানী, মুহাম্মদ আবদুহু, মুহাম্মদ ইকবাল, মুহাম্মদ আসাদ, আলী শরীয়তী, হাসান আল তুরাবি, মুরাদ হফম্যান প্রমুখের চিন্তা ও নির্দেশনা।
এছাড়া বঙ্গদেশের প্রেক্ষিতে পুনশ্চ উচ্চারণ করেন তীতুমীর এবং হাজী শরিয়তুল্লাহ-দের তৃণমৌলিক ইসলামীয় সংস্কার আন্দোলনের কথা। উপমহাদেশ, আরব উপদ্বীপ এবং উত্তর আফ্রিকার প্রেক্ষিতে তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, শায়খ আবদুল ওয়াহাব, সানুসী, মাহদী এবং উমর আল মুখতারের সাহসী ভূমিকার কথা। এসবের মধ্য দিয়ে তার একটি ইসলামপছন্দ প্রবণতা ও ঝোঁক পরিস্কার হয়ে ওঠে। যেখানে আধুনিকতাবাদী এবং প্যান-ইসলামিস্টদের অনেকেই স্বাগতম ও সক্রিয়; কিন্তু ঐতিহ্যবাদী উলামাদের অংশগ্রহণ হয়তো তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।
উপসংহার হিশেবে বলা যায়—’উত্তরআধুনিকতা’ বইটি পাঠের পর পাঠকের মনে উত্তরআধুনিকতা, ওরিয়েন্টালিজম এবং সভ্যতার দ্ব্বন্দ্বের বয়ানসমূহের মধ্য দিয়ে ফাহমিদ-উর-রহমানের ইসলামিকতার রূপরেখাটি অনেকটাই পরিস্ফুট হয়। আর সেটি হল এমন এক ইসলামিকতা—যা একধরনের দেশীয় আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতার অনুসন্ধানে নিবেদিত; এবং যা এমন এক ইসলামিকতা—যেখানে আধুনিকতাবাদী ও প্যান-ইসলামিস্ট তাত্ত্বিক ও কর্মবীরদের এক সমন্বয়ী সমাবেশ ঘটেছে বলে মনে হয়।

সাত. বাংলা ভাষায় আলীয়া

ইজেতবেগোভিচের পরিচিতি রচনা  বসনিয়ার রাষ্ট্রনায়ক ও চিন্তক আলীয়া ইজেতবেগোভিচের নাম অনেকেই শুনেছেন। বিশেষ করে গত শতকের নব্বই দশকে তিনি প্রায়ই আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনাম হতেন। কারণ তার নেতৃত্বেই বসনিয়ার মুসলিমেরা সার্বিয়দের কাছ থেকে আজাদী আদায়ের সংগ্রাম করেছিল। যা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিসত্তাগত নিপীড়নের এক নির্মম অধ্যায় শেষে ১৯৯৫ সালে ডেটন চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এই অধ্যায়ের একটা প্রশমন শুরু হয়েছিল।

আলীয়া এই জাতিসত্তাগত স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তার আগে থেকেই তিনি পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের কমিউনিস্ট শাসনের প্রেক্ষাপটে বসনীয় মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য ও আজাদী নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ চিন্তাকান্ডের উদ্ভাবনা করেছিলেন। পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিতান্ত্রিক বস্তুবাদ, প্রাণহীন খ্রিস্টবাদ এবং পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদ, নাস্তিক্যবাদ ও চাপাপড়া অর্থোডক্স খ্রিস্টবাদের বিরানভূমিতে বসনীয় মুসলিমদের মুক্তির জন্য ইসলামভিত্তিক এক জীবনবীক্ষা রচনা করেছিলেন। তার এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর স্নায়ূযুদ্ধকালীন ইসলামি জীবনবীক্ষা বলকানের স্থানীয় প্রেক্ষাপটের জন্য যেমন উপযুক্ত ছিল তেমনি এর ভেতরে তিনি সার্বিক উম্মাহ ও বিশ্বের সংকট উত্তরণের এক পথনির্দেশ দেখাতে পেরেছেন। এখানেই তার অনন্য বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্ব। তার সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্বে রাজনৈতিক ও দার্শনিক এই দুই সত্তার চমৎকার ও বিরল সম্মিলন দেখা গিয়েছিল। যে কারণে তার চিন্তা ও কর্ম তার মৃত্যুর পরে আজও বিশ্বমুসলিমকে পথ দেখায়।
এই মহান পূর্ব ইউরোপীয়/বলকান বসনীয় মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক ও দার্শনিকের উপরে একটি নাতিদীর্ঘ বই লিখেছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির বিশ্লেষক ও লেখক ডা. ফাহমিদ উর রহমান। তার এই বইটিকে আলীয়ার উপরে লেখা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিকৃতি বলা যায়। বইটির নির্বিশেষ সংবাদী ভাষা ও গদ্যরীতি এই বিষয়ে আগ্রহী যে কোনো পাঠকের জন্য সহজে প্রবেশ্য ও বোধগম্য হয়েছে।

বিশেষ করে তরুণ ইসলামিস্ট কর্মী ও তত্ত্বসন্ধানী—যারা সনাতন ও ঐতিহ্যবাদী আহলে ইলমের বৃত্তের বাইরে ইসলামের ‘পুনর্জীবনবাদী’ কিংবা ‘নবজীবনবাদী’ ভাষ্যকে বেশি আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য মনে করেন—তাদের কাছে আলীয়ার উপরে লেখা এই বইটি আগ্রহ জাগানিয়া হবে মনে করেই হয়তো এটি লেখা হয়েছে।

ফলে বইটির আকার, বিষয়, পরিধি এবং আলোচনার যেটুকু ব্যাপ্তি ও গভীরতা তা সেই আঙ্গিকের দিকে খেয়াল রেখেই নির্বাচন করা হয়েছে। এটিকে একধরনের হ্যান্ডি প্যাম্ফলেট বলা যেতে পারে। কারণ এখানে নির্বাচিত বিষয়ের ইতিবাচক প্রতিবেদন ও উপস্থাপনই মুখ্য উদ্দেশ্য। নির্বাচিত বিষয় ও বিষয়ী সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন কিংবা পর্যালোচনা এই বইয়ের উদ্দেশ্য নয়। সমকালীন স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে বিষয় ও বিষয়ীর প্রাসঙ্গিকতা ও প্রায়োগিকতার বিবেচনাও এখানে গৌণ। এই ধরনের বইয়ের মূল লক্ষ্য হল নির্বাচিত বিষয় ও বিষয়ীর একধরনের পক্ষীঅক্ষি পরিচিতি। সেদিক থেকে এই বই খুব কার্যকর ও সফল হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রাখে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।



মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত: কবি ও সমাজ চিন্তক।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন