বুদ্ধির বিনাশ নেই


ড. ওবায়দুল করিম


পুবাকাশ


সমাজে কোন পরিবর্তন ঘটে তার পরিবেশ প্রস্তুত থাকলে, যাকে objective condition বা বিষয়গত শর্ত বলা হয়। আবার মানুষকে সে পরিবর্তনের পক্ষে প্রস্তুত করা হচ্ছে subjective condition বা বিষয়ীগত শর্ত। বুদ্ধিজীবীরা মানুষকে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করেন।

এক.

Homo Sapiens অর্থ হলো ‘ বুদ্ধিমান প্রাণী‘। তাই বলে মানুষ মাত্রই বুদ্ধিজীবী ন‘ন। বিদ্বান ও বুদ্ধিমানের অর্থ এক নয়। বিদ্বান মাত্রই বুদ্ধিজীবী ন’ন। বুদ্ধির চর্চা ও প্রয়োগে সামাজিক আলোড়ন বা অর্থনৈতিক বা সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা তৈরী করতে পারেন যাঁরা তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। ইউরোপের রেনেসাঁসে মাইকেল এঞ্জেলো, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, শেক্সপিয়র ছিলেন বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম। এঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি, ভোক্তাবাদ ইত্যাদি আন্দোলনের সূচনা করেছিলো। বাংলার রেনেসাঁসে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা গদ্যরীতির সূচনা করেছিলেন, বিদ্যাসাগর বিধবা বিয়ের প্রচলন করেছিলেন, রামমোহন সতীদাহ প্রথার নিবারণের উদ্গাতা ছিলেন। এঁরা ছিলেন বুদ্ধিজীবী।

দুই.
১৯৪৭ এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা হয়। পাকিস্তানী শাসকদের শহীদ মিনার ভেঙে ফেলায় , আলাউদ্দিন আল আজাদ এর “স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার, ভয় কি …” কবিতা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোড়নের কবিতা। জহির রায়হানের “জীবন থেকে নেয়া” , এক গোছা চাবি, একটি সংসার, একটি দেশ, একটি আন্দোলন, এর রূপক বর্ণনা ছিলো বাঙালীকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করবার এক প্রচেষ্টা। বাঙালী মধ্যবিত্তের বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ছিলো, সহগামী।

 


শহীদ সকল বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা


 

তিন.

যুদ্ধের থাকে দু’টো ফ্রন্ট। একটি সামরিক ও অন্যটি সাংস্কৃতিক। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের আছে দু’টি শাখা। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংস্কৃতিক ও অন্যটি রাজনৈতিক। সাংস্কৃতিক শাখায় জাতীয় চেতনা বোধের জাগৃতির দায়িত্ব ছিল বুদ্ধিজীবীদের। গায়ক, নায়ক, পরিচালক, লেখক, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সবাই বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারা গঠনে পাকিস্তানীদের প্রতিপক্ষ ছিলো। এর সাথে ছিলেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সমাজে কোন পরিবর্তন ঘটে তার পরিবেশ প্রস্তুত থাকলে, যাকে objective condition বা বিষয়গত শর্ত বলা হয়। আবার মানুষকে সে পরিবর্তনের পক্ষে প্রস্তুত করা হচ্ছে subjective condition বা বিষয়ীগত শর্ত। বুদ্ধিজীবীরা মানুষকে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট দেখলে বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামী অস্তিত্ব বোঝা যায়। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীরা ও প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানী শাসকদের নজরে আসে। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বিনাশ করবার অভিপ্রায় থেকে, তালিকা করে বেছে বেছে এদেশীয় খ্যাত বুদ্ধিজীবীদের , রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের সহযোগিতায় হত্যা করে।

চার.
গ্যালিলিও নেই, তাই বলে কি, সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন বন্ধ হয়েছে? নিউটন নেই, তাই বলে কি গাছের ফল এখন মাটিতে পড়েনা। প্রকৃতির নিয়মকে কেউ বদলাতে পারেনা। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে , চাকার ঘূর্ণন শ্লথ করতে পেরেছে, বন্ধ হয়নি। শোককে শক্তিতে পরিণত করবার সাংস্কৃতিক বীজটা বুদ্ধিজীবীরা রোপন করেছেন অনেক আগেই। আর তার ফলেই উঠে দাঁড়িয়েছে স্বদেশ।

শহীদ সকল বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা।


ড. ওবায়দুল করিম : বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, প্রফেসর ( অব:) সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন