মুজিব রাহমান
‘…ভাষাও সংসার-সমাজ সংসর্গেই অধিগত হয়।’
‘শব্দের অর্থপরিবর্তনকাহিনী বিচিত্র এবং মনোরম। ইহা হইতে মানবমনের চিন্তাধারার বিবিধ ও বিচিত্র বিসর্পণের নির্দেশ পাওয়া যায়।’
[ভাষার ইতিবৃত্ত – সুকুমার সেন ; পৃষ্ঠা ১৫, ৫৬]
অভিধান রচনা এবং পাঠের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষামূলক। গ্রিক ভাষায় প্রথম অভিধান রচনা করেছিলেন Apollonius। অভিধানটি ছিল হোমারিয় বিষয় সংক্রান্ত শব্দকোষ। রোমানরা যাতে ইলিয়াড-অডিসি এবং গ্রিক সাহিত্য এবং হোমারিয় শব্দভাণ্ডার সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্যেই লেখা হয়েছিল এই পরিভাষাকোষ বা নির্ঘণ্ট জাতীয় অভিধানটি। আজও বিদ্যমান আছে এ অভিধান।
ভাষিক পর্যবেক্ষণ এই সাক্ষ্য দেয় যে, আদিকাল থেকেই মানুষ শব্দ থেকে বস্তুমুখি হয় এবং নাম থেকে জিনিসটির প্রকৃতি ও স্বভাব জানার দিকে অগ্রসর হয় (Men pass from words to things, from names to natures)। বস্তু, নাম, স্বভাব, বৈশিষ্ট্য শব্দের অচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে অভিধানের মজ্জারুপে কাজ করে।
স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্যাচর্চার অংশ হিসেবে বাঙালির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি বহু সংখ্যক অভিধান, পরিভাষাকোষ ও চরিতাভিধান প্রকাশ করেছে। ভাষাশিক্ষার প্রধান দুটি কার্যকর নিয়ামক ব্যাকরণ ও অভিধান। এ ক্ষেত্রেও বাংলা একাডেমির অবদান অনস্বীকার্য।
যেকোন ভাষার অভিধানে শব্দকে চারভাবে দেখা যেতে পারে।
১. শব্দ বস্তুসংক্রান্ত :
শব্দ লেখ্যচিহ্ন বা লেখার উপযোগী সূচকচিহ্ন। বানান এবং উচ্চারণের ক্ষেত্রে যাদের সমরূপতা আবশ্যক, যদিও এই সারূপ্য নানান রকমফের বা ভিন্নতা দ্বারা প্রায়শই বিনষ্ট ও বিকৃত হয়ে যায়।
২. শব্দ হচ্ছে ভাষার অংশ বা ব্যাকরণের পদ:
ভাষায় একটি শব্দ অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে পদগুচ্ছ অথবা বাক্যের কাঠামো অনুযায়ী। শব্দটি বাক্যে কি ভূমিকা পালন করছে তার ওপর নির্ভর করছে শব্দটির পদ-পদান্তর। শব্দটি বিশেষ্য না বিশেষণ, ক্রিয়া না অব্যয় কিংবা কীভাবে পদান্তর ঘটছে এসবের ওপর শব্দের ভবিতব্য নির্ভর করছে।
৩. শব্দ হচ্ছে চিহ্ন :
শব্দ হচ্ছে প্রতীকচিহ্ন বা সূচকচিহ্ন। শব্দাবলীর অর্থ আছে। এক নয় একাধিক। এই অর্থগুলো নানাভাবে সম্পৃক্ত। আবার একই শব্দের অর্থের নানান ভেদ ও তারতম্য আছে। কখনো কখনো একটি শব্দের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি অর্থও থাকতে পারে। শব্দের সক্ষমতার এবং প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে অর্থের সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনাগুলো। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সক্ষমতাও শব্দের অর্থকে নানা মাত্রা ও ভিন্নতা প্রদান করতে পারে।
৪. শব্দ ব্যবহারসিদ্ধ ও প্রচলসম্মত :
শব্দ প্রাকৃতিক জিনিষগুলোকেই নির্দেশ করে। কিন্তু শব্দ নিজে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক নয়। শব্দরাজি মানুষের বানানো প্রতীক বা চিহ্ন। এ কারণেই প্রত্যেকটি শব্দের একটি ইতিহাস আছে যেমনটি আছে মানুষের তৈরি সকল জিনিসের। জিনিসটির উদ্ভব স্থান ও সময়, এবং সংস্কৃতিগত যাত্রা যার ভেতর দিয়ে জিনিসটিকে নির্দেশকৃত শব্দটির নানান রূপান্তর সাধিত হয়ে থাকে। যে আদি শব্দমূল হতে শব্দটির উদ্ভব অর্থাৎ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত উৎপত্তি, তার সঙ্গে সুপ্রযুক্ত উপসর্গ, অনুসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি, সন্ধি, সমাস ইত্যাদি মিলে শব্দের যে ইতিহাসটি গড়ে ওঠে সেখানেই মর্মরিত হয়ে ওঠে শব্দ বিশেষের পদান্তর, বানান, উচ্চারণ ইত্যাদি। উপরন্তু মূলগত শব্দটিই বলে দেয় অর্থান্তর এবং শব্দটির ভূত ও ভবিষ্যত। শব্দটি কতো প্রাচীন বা কতোটা নবীন, কতোটা প্রচল বা একেবারেই অচল কিনা, কিংবা শব্দটি কথ্য নাকি ভাষার বিশিষ্ট প্রয়োগবহুল নাকি তার আছে কোন অমার্জিত ও অশিষ্ট প্রয়োগ।
একটি ভালো অভিধান এ চারটি শিরোনামাধীন অজস্র প্রশ্নের উত্তর উপস্থাপন করে। অভিধান পড়ুয়াকে একটি শব্দ সম্পর্কে এই চার ধরনের তথ্য জেনে বুঝেই অগ্রসর হতে হয়। আর এ জন্যে অভিধানকে বলা হয় স্বাবলম্বন-যুগিয়ে বই – a self-help book। শব্দের উৎপত্তি, তার পদ-পদান্তর, অর্থের রকমফের, শব্দটির ব্যবহারগত ইতিহাসের হালচাল, বাক্যে শব্দটির প্রয়োগ ইত্যাদি অভিধান পাঠককে একটি ভাষার সমকালীন পাঠকে উন্নীত করতে পারে।
অভিধানের জগতে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত জামিল চৌধুরী সম্পাদিত এক বলিহারি কীর্তির নাম আধুনিক বাংলা অভিধান!
এ যাবত কালের ব্যবহারোপযোগিতায় ভালো অভিধান বলতে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-কে বোঝাতো। কিন্তু ২০১৬ সালে একটি ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হলো। কিনতে চাইলাম ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। দেখিয়ে দেয়া হলো একাডেমির স্টলে থরে থরে সাজিয়ে রাখা আধুনিক বাংলা অভিধান। এবং জানালো ব্যবহারিক বাংলা অভিধান আপাতত মুদ্রিত হচ্ছে না। কাজেই, নূতন অভিধানটিই কিনতে হলো।
সাম্প্রতিক অর্থে আধুনিক হতে গেলেও পড়া-লেখা ও জানাশোনার একটা ন্যূনতম বিস্তার ও গভীরতা থাকা আবশ্যক। অতীতে সংকলিত অভিধান সমূহের ভুক্তিসমূহ না দেখে ইচ্ছেমত কোন দিগগজ পণ্ডিত ভাষার শব্দাবলী নিয়ে যথেচ্ছাচার করতে পারেন না। দেশে একটি সর্ববাদীসম্মত অভিধান সংকলনের প্রয়োজনীয়তাকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। আমাদের দেশের বরেণ্য ভাষাবিজ্ঞানীদের ভাষাবিষয়ক বিবেচনাসমূহ গ্রাহ্য না করা একধরনের উন্নাসিকতার নামান্তর। যার কারণে প্রতিষ্ঠিত অনেক শব্দ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে যায়। দিন কয়েক আগে ফেইস বুকে ‘গরু’ শব্দটির বানান নিয়ে এমনই এক দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড প্রত্যক্ষ করতে হল। অথচ ব্যাকরণগতভাবে ব্যাপারটি ছিল অনেক আগ থেকেই মীমাংসিত।
জ্ঞানতাপস ভাষাচার্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক গ্রন্থের ৭৭ সংখ্যক পৃষ্ঠায় ‘উদ্বৃত্ত স্বর’ বিষয়ক আলোচনায় ‘গরু’ শব্দটির পরিবর্তিত রূপগুলো দেখিয়েছেন। পূর্ববর্তী ৭৪ পৃষ্ঠায় ‘প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার স্বরধ্বনির বাঙ্গালায় বিবর্তন’ তিনি তুলে ধরেছেন। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার পদান্তস্থিত স্বর আধুনিক বাঙ্গালায় প্রায়শ লোপ পায়।
উদাহরণ দেখিয়েছেন –
প্রাচীন ভারতীয় আর্য গোরূপ
প্রাকৃত গোরূঅ > গোরু
বাঙ্গালা গরু
নানান উদাহরণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।
শব্দসম্ভারের বিপুলতায়, ব্যুৎপত্তির বিশুদ্ধতায়, অর্থনির্ণয়ের পুঙখানুপুঙখতায় ১৯১৭ সালের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ প্রকাশিত হয় জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের দুই খণ্ডে বিভক্ত ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’। এক লক্ষ পনের হাজার শব্দসম্বলিত এই অভিধানের দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়েছিল প্রথম প্রকাশের কুড়ি বছর পরে ১৯৩৭ সালে। এই অভিধানের ভুক্তিতেও বাংলা শব্দ ‘গরু’-ই পাই। সংস্কৃতি ও লোকাচারের বিষয়টিকেও অভিধান সংকলককে গ্রাহ্য করতে হয়।
আরো পরে ১৯৩০ সালে একটি কেজো অভিধান প্রণয়ন করেছিলেন রাজশেখর বসু। অভিধানটির নাম ‘চলন্তিকা আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান।’ এই অভিধানের ভুক্তিতেও মূল শব্দটি ‘গরু’ গোরু নয়।
আমি জানি না বিদ্যাবাচস্পতি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর চেয়ে বড় কোন ভাষাবিদ এই জামিল চৌধুরী কিনা!
ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের পরিমার্জিত সংস্করণের প্রয়োজনীয়তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। অথচ, বাংলা একাডেমি কর্তৃক এই অভিধানটির মুদ্রণ বন্ধ করে আধুনিক বাংলা অভিধান একচেটিয়া বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্য আমি বুঝতে অক্ষম।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের প্রধান সম্পাদক ছিলেন ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক। স্বরবর্ণ অংশ সংকলনের কাজ তিনি করেছেন।
শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি ছিলেন সম্পাদক। তিনি ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ ও পরিমার্জিত সংস্করণের কাজ করেছেন।
সহযোগী সম্পাদক ছিলেন স্বরোচিষ সরকার। তিনি পরিমার্জিত সংস্করণের কাজ করেছেন।
এই সম্পাদক ত্রয়ের হাত ছুঁয়ে যে অভিধান সেটিই ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। অভিধানতাত্ত্বিক যেকোন বিচার ও বিবিবেচনায় এই অভিধানটির গ্রহণযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত কম প্রশ্ন সাপেক্ষ। একটি সার্থক অভিধান হিসেবে এটি বহু সমাদৃত।
একবিংশ শতাব্দে এসেও যেকোন বাংলা অভিধান সংকলন করতে বসলে বিংশ শতাব্দের একভাষী বাংলা অভিধানের মধ্যে তিনটি অভিধানকে বিবেচনায় রাখতেই হয়। এগুলো হচ্ছে যথাক্রমে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ এবং রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’।
অবশ্য, দুশো বছরেরও অধিক কাল আগে ১৮১৮ সালে প্রথম প্রকাশিত একভাষী নিখাদ বাংলা শব্দার্থ অভিধানের নাম ছিল ‘বঙ্গভাষাভিধান’। অভিধানকার ছিলেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ।
একজন সাধারণ পাঠক হয়েও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বাংলা একেডেমি অভিধান শব্দের আগে আধুনিক বিশেষণ প্রয়োগ করা সত্ত্বেও অনেক বেশি অনাধুনিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এ অভিধান নিয়ে সবিস্তার আলোচনা খুবই জরুরি হয়ে ওঠেছে। সবিস্তার আলোচনায় বোঝা যায় , এ অভিধানের সঙ্গে যুক্ত সম্পাদনা সহযোগীসহ সকলেই More Catholic than the Pope।
বাংলা একাডেমি অভিধান রচনার ক্ষেত্রে যে ধারাবাহিক ইতিহাস সৃষ্টির পথরেখা তৈরি করেছে সে পথে আধুনিক বাংলা অভিধানটি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের পর যে নূতন মাত্রা যুক্ত করে অধিকতর সমৃদ্ধ অভিধান হিসেবে পরিগণিত হবে বলে স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল তা মাঠে মারা গেছে।নিয়মের ইচ্ছাধীন অনুবর্তী হয়ে কখনো ব্যবহার করছি ‘বিমান’ থেকে বৈমানিক আবার ‘বিচার’ থেকে বৈচারিক না বলে বিচারিক। অসংখ্য স্ববিরোধে ভরা আমাদের ভাষাচর্চা।
সবচেয়ে বড় কথা দেশের কোন স্বীকৃত ভাষাচার্য কিংবা ভাষা বিশেষজ্ঞকে এ অভিধানের সঙ্গে সংযুক্ত না দেখে একটা কিছু আঁচ করা যায় বইকি!
দেশের ভাষাতাত্ত্বিক, ধ্বনিবিজ্ঞানী, এবং অভিধান সংকলনে বিশেষজ্ঞবৃন্দ এ ক্ষেত্রে বড় ও সময়োপযোগী ভূমিকা পালন করতে পারতেন কিন্তু সেটি দখা যায়নি। অথচ আজকাল একটি ভাল অভিধান মানে এ বিষয়ের বিশিষ্টজনদের একটি টিম ওয়ার্ক বা সমবেত প্রয়াসের সম্প্রসারণ। দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে কোন শব্দটি ভুল আর কোন শব্দটি শুদ্ধ, ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ অথচ বহুল প্রচলিত এ শব্দগুলো সম্পর্কে একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি কী অভিধানে তার সুস্পষ্ট ব্যাখা উপস্থাপিত হওয়া দরকার। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিকল্প বানান বিষয়ে সুনির্দিষ্ট, সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ থাকাও জরুরি। আমরা ব্যাকরণ মানবো না প্রচল মানবো, ব্যাকরণ মানলে কোন ব্যাকরণ মানবো। প্রচল মানলে কোন কোন শব্দের ক্ষেত্রে বা কোন বৃহত্তর নির্দেশনার আলোকে মানবো – এসব বিষয় সুনির্দিষ্টকরণ প্রয়োজন। অন্যথায়, কথ্য এবং লিখিত দু ক্ষেত্রেই ভাষিক নৈরাজ্যের সীমা-পরিসীমা থাকবে না।
বাংলা ভাষার সৌধপ্রতিম বিবর্তনমূলক অভিধানের সম্পাদক বরেণ্য গবেষক, লেখক ও জীবনীকার গোলাম মুরশিদ। তিনি তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলা ভাষার উদ্ভব ও অন্যান্য’ বিষয়ক গ্রন্থে ‘বাঁধন-ছেঁড়া বাংলা বানান’ শীর্ষক প্রবন্ধে নিম্নাক্তভাবে তাঁর চরম খেদ প্রকাশ করেছেন –
” ‘দুখিনী বাংলা বানান’ নামে একটি প্রবন্ধে আমি লিখেছিলাম যে, প্রচলিত বাংলা বানান-রীতির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কালে একটা প্রচণ্ড পাণ্ডিতিক অভ্যুত্থান হয়েছে। এই অভ্যুত্থানে কামানের বদলে কলম ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে এর ফল কিছু কম দৃশ্যগোচর হয়নি। বস্তুত, এর ধাক্কায় এতোদিনকার বাংলা বানান নীতিভ্রষ্ট হয়ে রাতারাতি একটস বিভ্রান্তির চেহারা নিয়েছে। এই বিভ্রান্তির চেহারা কী ভয়ানক হতে পারে, সে সম্পর্কে আমি লিখেছিলাম ‘সরকারি সহকারি কর্মচারি’ নামক আর-একটি প্রবন্ধে। এখন দেখতে পাচ্ছি যে, দ্বিতীয় প্রবন্ধে আমি যে-আশঙ্কার কালো মেঘ বাংলা বানানের সমস্ত আকাশ ছেয়ে ফেলেছে।সত্যি বলতে কি, বানান সংস্কারের এই দমকা হাওয়া এরই মধ্যে বাংলা বানানের সাজানো বাগানের লতাপাতা থেকে আরম্ভ করে মহীরুহ পর্যন্ত সবকিছুকে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে।”
উল্লিখিত প্রবন্ধটির শেষ অনুচ্ছেদটিও আমি উদ্ধৃত করতে চাই –
” বিদেশী শব্দের বানানে তুলনামূলক যে-স্বাধীনতা আছে, দেশী শব্দের ক্ষেত্রে অতোটা স্বাধীনতা নেই। এই শব্দগুলোর যে-বানান বহু কাল ধরে প্রচলিত আছে, সেই বানানই অনুসরণ করার রীতি চালু আছে। যেমন, ‘ভীড়’ অথবা ‘তীর’ (তীর-ধনুক)। হ্রস্ব ি- কার দিয়ে লেখার কোনো কারণ নেই। কারণ দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে লেখার রীতিই চলে এসেছে। সম্প্রতি অবশ্য দীর্ঘ স্বর খেদানোর হুজুগে হ্রস্ব ই-কার দিয়ে ‘ভিড়’ এবং ‘তির’ লেখার রীতি চালু হয়েছে। নামবাচক শব্দের শেষে দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে সেগুলোকে বিশেষণে পরিণত করার রীতি বাংলা ভাষার একটি স্বীকৃত নিয়ম। যেমন, ‘জাপান’ থেকে জাপানী, ‘বাদাম’ থেকে বাদামী, ‘পশম’ থেকে পশমী/ পসমী। এখন এই বিশেষণগুলো দীর্ঘ-ঈ-বর্জিত। এর ফলে এ শব্দগুলো লিখতে, পড়তে অথবা বুঝতে কারোও কোনো বাড়তি সুবিধে হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও এই অনাবশ্যক পরিবর্তন এসেছে। বস্তুত, দীর্ঘকাল ধরে বানানের যে-ঐতিহ্য গড়ে ওঠেছে, তার পরিবর্তন অপ্রয়োজনীয় এবং অবাঞ্চিত।”
আশা করেছিলাম, ব্যবহারিক বাংলা অভিধানটি আরও সমৃদ্ধ হয়ে বেরুবে, নূতন শব্দ-সম্ভার যুক্ত হবে, সংযোজিত হবে বিদেশি নামের উচ্চারণ ও প্রতিবর্ণীকরণের অংশ। বিকল্প বানানও নির্দেশ করা হবে।
একটি শব্দের বিবর্তন প্রক্রিয়া জানা একজন অভিধান সংকলকের জন্য একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানির নূতন নক্ষত্র আবিষ্কারের মত আনন্দের। একেবারে ভুল শব্দটিও কীভাবে কালের বিবর্তনে প্রয়োগের পথ ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় সেকথা বলতে গিয়ে বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানের প্রধান সম্পাদক গোলাম মুরশিদ লিখেছেন –
“আনুমানিক ১৫৫০ সালে চণ্ডীদাস লিখেছিলেন, ‘সাধ বহু করে বিহি করে অনুবাদ।’ এখানে অনুবাদ কথাটার মানে প্রতিকূলতা। আনুমানিক ১৬৫০ সালে মাধবাচার্য্য অনুবাদ লেখেন প্রশংসা অর্থে, ‘ধন্য ধন্য করিয়া করিল অনুবাদ।’ একই সময়ে বিজয় গুপ্ত অনুবাদ কথাটা লেখেন অপরাধ বা দোষ অর্থে, ‘ নাহি দোষ অনুবাদ খেমা করো আমা।’ আনুমানিক একই সময়ে জ্ঞানদাসও অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার অর্থ করেছেন বাসনা, ‘মনে ছিল অনুবাদ পুরাল মনের সাধ।’
অনুবাদ অর্থ বিতর্কও হয়, যেমন, বাদ-অনুবাদ। বর্ণনা অর্থেও অনুবাদ শব্দটা ব্যবহৃত হয়, যেমন, গুণানুবাদ। কিন্তু একেবারে ভুল অর্থে অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করেছেন অক্ষয়কুমার দত্ত, ১৮৪২ সালে। তিনি এ শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন ‘তরজমা’ অর্থাৎ ‘ট্রান্সলেশন’। এখন আমরা এই ভুল অর্থেই অনুবাদ শব্দটা ব্যবহার করি।”
(বিবর্তনমূলক অভিধান কী করে হলো? ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, দৈনিক প্রথম আলো)
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি অভিধান সংকলন করতে গেলে ধর্ম বিষয়ে একটি পক্ষপাতহীন সম্পর্কের মনোভঙ্গি শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা নির্দেশে খুবই জরুরি। শব্দের ধর্ম নেই। কিন্তু একটি শব্দ যখন ধর্ম বাহিত হয়ে ভাষায় স্থান করে নেয় তখন অনেক সময় শব্দটি একটি বিশেষ সংবেদনশীলতা পেয়ে যায়। সে কারণে অভিধান সংকলককেও একটি নির্দোষ ধর্মনিরপেক্ষ দূরত্ব বজায় রেখে শব্দটির অর্থ ও ব্যাখ্যা নির্দেশ করতে হয়। যে বিষয়টি আধুনিক বাংলা অভিধান সঙ্কলকের পক্ষে যথাযথ গুরুত্বে ও নির্দোষ দূরত্বে দাঁড়িয়ে করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দৃষ্টান্ত হিসেবে দুটি শব্দ নেয়া যাক:
১. আবে-জমজম : মুসলমানদের কাছে অতি পবিত্র বলে বিবেচিত মক্কা নগরীতে অবস্থিত জমজম কূপের পানি।
[পৃষ্ঠা-১৫৯]
২.গঙ্গাজল :১. গঙ্গা-নদীর পবিত্র জল। ২. গঙ্গার জলের মতো নির্মলচিত্ত দুই নারীর সখিত্বসূচক সম্পর্ক।
[পৃষ্ঠা-৩৭৮]
এখানে সঙ্গতভাবেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, আবে-জমজমের পানির ক্ষেত্রে তা শুধুই মুসলমানদের কাছে পবিত্র।
অন্যদিকে গঙ্গাজলের ক্ষেত্রে কি এর পবিত্রতার সর্বজনীন সম্মতি প্রতিষ্ঠিত! তা কি সব ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র! এ প্রশ্ন যুক্তি-প্রবণ যেকোন মানুষকেই বিব্রত করতে পারে।
এ ধরণের অজস্র উদাহরণ এ অভিধানে ছড়িয়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে Oxford Collocations Dictionary -এর আদলে বাংলা ভাষায় একটি সমাবিষ্ট শব্দের অভিধান সংকলন ও প্রকাশের কথাও উত্থাপন করছি।
ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় এ ধরনের অভিধান ভাষার শক্তিমত্তাকে তুলে ধরে। কোন বিশেষ্যের আগে কোন কোন বিশেষণ বসতে পারে, কোন বিশেষ্যের আগে কোন ক্রিয়াপদটি সুপ্রযুক্ত সমাবিষ্ট শব্দের অভিধানে এসবের চমৎকার সন্নিবেশ থাকে। বাংলা ভাষায় আমার জানা মতে, এ ধরনের কোন অভিধান অদ্যাবধি নেই।
‘মূর্খ’ এই বিশেষণ পদটির আগে কী কী বিশেষণ বসাতে পারি, অর্থাৎ বিশেষণের বিশেষণ হিসেবে কোন বিশেষণ পদটি সবচেয়ে বেশি অতিশায়ন ঘটিয়ে চমৎকার শব্দযোগ তৈরি করবে সমাবিষ্ট শব্দের অভিধান আমাদেরকে এ বিষয়ে যারপরনাই সাহায্য করতে পারে। যেমন – সাধারণত আমরা লিখি আকাট মূর্খ, গোমূর্খ, হস্তীমূর্খ , মহামূর্খ, নিরেট মূর্খ ইত্যাদি। কিন্তু আমরা কখনো প্রকট মূর্খ বলি না। ‘দারিদ্র্য’ বিশেষ্য পদটির আগে আমরা কোন কোন বিশেষণ বসাতে পারি। আমরা সাধারণত প্রকট দারিদ্র, চরম দারিদ্র্য , নিদারুণ দারিদ্র্য ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করি।
কিন্তু কখনো উৎকট দারিদ্র্য বলি না। এ প্রসঙ্গে সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান-প্রণেতা আবু ইসহাকের ভূমিকা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করতে চাই।
তিনি তাঁর দুই খণ্ডে ( স্বরবর্ণ অংশ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ : ক থেকে ঞ) লিখিত (অসমাপ্ত) উল্লিখিত অনন্য অভিধানটির ভূমিকায় লিখেছেন –
” ধরা যাক একটি বিশেষ স্থানের বা সময়ের ‘অন্ধকার’-এর যথাযথ বর্ণনা দিতে হবে। স্মৃতির কোঠা হাতড়ে হয়তো ‘অন্ধকার’-এর কয়েকটা বিশেষণ – কালো, গাঢ়, ঘন, ঘুরঘুট্টি, নিশ্চিদ্র, ভয়ঙ্কর, সুনিবিড় পাওয়া গেল। ‘চোখ’-এর বর্ণনার জন্যে মনে পড়ছে – অপলক, কটা, কুতকুতে, ছলছলে, তন্দ্রালু, নিমীলিত, পটলচেরা। ‘অন্ধকার’ ও ‘চোখ’-এর আরো অনেক বিশেষণ আছে, যা জানা নেই, বা অনেকগুলোই জানা আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কোন অভিধান থেকেই ঠিক মনের মতো বা মানানসই বিশেষণটি চয়ন করা সম্ভব নয়। কারণ বিশেষিত করতে হবে এমন শব্দ এবং শব্দটির প্রয়োগযোগ্য বিশেষণগুলো বর্ণের ক্রমানুসারে বা বিষয়ের বিভিন্নতা অনুযায়ী প্রচলিত অভিধানের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে আছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে নতুন এই অভিধানে বিশেষ্য-শব্দ ‘অন্ধকার’-কে বিশেষিত করতে পারে এমন এক শ’ সাতাশিটি বিশেষণ বর্ণানুক্রমে মূল শব্দ ‘অন্ধকার’-এর অনুচ্ছেদে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের রচনা থেকে বিশেষণযুক্ত ‘অন্ধকার’-এর প্রয়োগ-উদাহরণ হিসেবে পঁয়তাল্লিশটি বাক্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
ভাষার চমৎকারিত্ব ও সৌন্দর্য অনেকখানি নির্ভর করে বিশেষণের সুষ্ঠু প্রয়োগের ওপর। তাই যে কোনো ধরনের লেখালেখির সাথে যাঁরা জড়িত ( যেমন- কবি, কথাশিল্পী, বক্তা, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইত্যাদি) তাঁরা লিখতে বসে সঠিক বিশেষণের জন্যে বা মনের মতো বিশেষণ তাৎক্ষণিকভাবে মনে না আসার কারণে লেখা থামিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন বা প্রচলিত অভিধান হাতড়ে অযথা হয়রান হন ও সময় নষ্ট করেন। তাঁদের এই প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখেই অভিধানটি সংকলিত হয়েছে।”
বাংলা অভিধান রচনার ক্ষেত্রে যে অভিনিবেশ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন তাঁর কিছুটা ছায়াপাত আমরা আবু ইসহাকে প্রত্যক্ষ করি। ক থেকে ঞ অংশের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন –
‘অভিধানটির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করতে আরো অনেক সময় লাগবে। সম্পূর্ণ অভিধানটির পৃষ্ঠাসংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে হয়।’
স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে একটানা তিরিশ বছর অমানুষিক পরিশ্রমের ফসল তাঁর এই বিশেষণে বিশেষিত শব্দের অভিধান। ১৯৯৩ সালে অভিধানটির স্বরবর্ণ অংশ প্রকাশ কালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ এবং ১৯৯৮ সালে ব্যঞ্জন বর্ণ ক থেকে ঞ অংশ প্রকাশকালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ডক্টর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন দুজনই অভিধানটি সম্পর্কে উচ্চাশা পোষণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবু ইসহাকের মৃত্যুর পর এই আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে কোন উদযোগ নেয়া হয়েছিল কিনা আমরা জানি না।
অভিধানে শব্দের সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ ছাড়াও প্রয়োজনানুসারে শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করার প্রবণতা জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানেও লক্ষণীয়।
ব্যবহারিক বাংলা অভিধান ও আধুনিক বাংলা অভিধান থেকে শব্দ সংজ্ঞায়নের দু একটি উদাহরণ নেয়া যেতে পারে।
ব্যবহারিক বাংলা অভিধান দোয়েল শব্দটির সংজ্ঞায় লিখেছে-
দোয়েল, দয়েল, দহিয়াল [ দোয়েল, -, দোহিয়াল] বি
সুমধুর গায়ক পাখি বিশেষ; বাংলাদেশের জাতীয় পাখি; magpie-robin ( কোথায় ডাকে দোয়েল শ্যামা – সদ)।{স. দধিয়াল>(পাখিটির দুই পাশে দধির মতো সাদা দাগ থাকার জন্য এমন নাম); আঞ্চ. দইয়াল}
[পৃষ্ঠা-৬২৭]
আধুনিক বাংলা অভিধান দোয়েলের সংজ্ঞায়নে লিখেছে –
দোয়েল /দোয়েল/ [বা.] বি. ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিচরণ করে এমন লম্বা ঠোঁট ও চোখা লেজ বিশিষ্ট সাদাকালো ছোটো গায়কপাখি, বাংলাদেশের জাতীয় পাখি।
[পৃষ্ঠা-৬৭৬]
দু অভিধানে প্রদত্ত সংজ্ঞা দুটো থেকে দুটো অভিধানের অভ্যন্তরীণ শক্তিমত্তার দিকটি যেমন বোঝা যায় তেমনি বোঝা যায় অভিধান শুধু অর্থ প্রদানের বাইরেও অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
বাংলা একাডেমি যদি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানকেই ভিত্তি ধরে বিশেষজ্ঞ ভাষাবিদদের সমন্বয়ে সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পরিবর্ধনের কাজটি করতো তাহলে একটি বড় কাজ হতো। প্রতিদিনকার কাজে ব্যবহৃত একটি ভালো একভাষী বাংলা অভিধানের প্রয়োজনীয়তার ইয়ত্তা নেই। আজও স্কুল-কলেজের ছাত্র-শিক্ষকবৃন্দ জানেন না indoor games -এর বাংলা কী লিখবেন। কারণ স্পষ্ট। বাংলা অভিধানগুলোতে এমন কোন ভুক্তি নেই। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে কিংবা আধুনিক বাংলা অভিধান কোনটিতেই ‘অন্তরঙ্গন ক্রীড়া’ বা ‘অন্তঃক্রীড়া’ বলে কোন ভুক্তি নেই।
আমাদের নাগালের ভেতর ইংরেজি ভাষার শিক্ষার্থী-বান্ধব অভিধানের ধরনের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। ব্যাকরণগত নানা জটিলতা নিরসনপূর্বক প্রতিটি ভুক্তির অধীন পর্যাপ্ত সংখ্যক দৃষ্টান্ত বাক্যে ঠাসা তাঁদের শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত অভিধানগুলো। আমাকে কোনো শিক্ষার্থী ভাল একটি ইংরেজি ব্যাকরণ ও ইংরেজি অভিধানের কথা জিজ্ঞেস করলে আমি অনায়াস নিচে উল্লিখিত যেকোন একটি অভিধানের কথা বলে দিতে পারি।
Oxford Advanced Learner’s Dictionary বা অতি সহজবোধ্য Collins Cobuild English Dictionary for Advanced Learners অথবা Longman Dictionary of Contemporary English বা Cambridge Dictionary of Advanced Learners। ঠিক কীভাবে একটি একভাষিক অভিধান শব্দগত ও ব্যাকরণগতভাবে একটি ভাষা শিক্ষাদানের মোক্ষম উপায়ে পরিণত হতে পারে উপরের অভিধানগুলো এ নজির বহন করছে।
আজকের দিনে একটি ভালো অভিধান মানেই ভাষাতাত্ত্বিক, ধ্বনিতত্ত্ববিদ, বিশিষ্টজনদের একটি টিম ওয়ার্ক বা সমবেত প্রয়াস। মূলত, অভিধানের শেষে ও মাঝে ভাষা ও ব্যাকরণের প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যাবলি ও নির্দেশনা একটি অভিধানকে অত্যাশ্যক করে তুলতে পারে তার ব্যবহারকারীদের জন্য।
উপর্যুক্ত অভিধানসমূহের যেকোন একটি অভিধানের গুণ ও মানসম্পন্ন একটি বাংলা অভিধান রচনা আজও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
‘বাংলা শব্দার্থতত্ত্বের অন্যতম দিক-নির্দেশক পরম শ্রদ্ধেয় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র স্মৃতির উদ্দেশে’ নিবেদিত ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত কথাসাহিত্যিক ও শব্দার্থবিদ আবু ইসহাক সঙ্কলিত ও সম্পাদিত পূর্বে উল্লিখিত অভিধানটির নামই সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই ভিন্ন ধারার অভিধানটির কাজ সম্পন্ন করা গেলে সৃজনশীল বাঙালির জন্য একটি বড় কাজ হবে।
শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর অভিধানের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় একশ বছরের অধিক কাল আগে আশাবাদ ব্যক্ত করে গেছেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন উচ্চ শিক্ষিত, বিবিধ জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ও বহুভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ একত্র মিলে সমবায়িক শ্রমে ও মেধায় অসামান্য এক অভিধান সংকলন সম্ভব হয়ে ওঠবে। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানকে যদি এমন কোন আধুনিক বাংলা অভিধান প্রতিস্থাপিত করতো তাহলে কারোই কোন খেদ থাকতো না।
শতবর্ষ আগে লিখিত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানটির প্রথম সংস্করণের ভূমিকার শেষ বাক্যটি উদ্ধৃত করে শেষ করছি –
“সে দিন আসিবে, যে দিন মারে সাহেবের নূতন ইংরেজী শাব্দিক অভিধান ( Murray’s New English Dictionary) সঙ্কলনের ন্যায় একজন লোকের সম্পাদকতায়, দুইশত সহকারী সম্পাদকের সহযোগিতায় এবং এক সহস্র পাঠক বা শব্দসঙ্কলনকারীর পরিশ্রমে বাঙ্গালা ভাষার সর্ব্বাঙ্গসুন্দর বৃহত্তম শাব্দিক অভিধান সম্পাদিত হইবে। কিন্তু বাঙ্গালার সেদিন তখনই আসিবে, যখন জ্ঞানবৃদ্ধ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তর্দৃষ্টি, বাচস্পতির কর্ম্মশক্তি এবং হরিনাথদের বহু-ভাষাজ্ঞান বঙ্গভাষারূপ সাগরসঙ্গমে আসিয়া একত্র মিলিত হইবে।”
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা ভাষার বাংলাদেশে দেশমাতৃকার যথাযথ সংস্কৃতির ছায়ায় জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের কাঙ্ক্ষিত বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে এদেশের অগ্রগণ্য, অঙ্গীকৃত ব্যাকরণবিদ, ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক সকলের মিলিত মনীষা ও প্রজ্ঞায় বানানে-উচ্চারণে স্থানিক সংস্কৃতির কাদা-মাটি-জলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার ব্যবহারকারীর জন্য কখন একটি নিজস্ব অভিধান সংকলিত হবে সে আশায় ‘গর্ভিণী নারীর মতো মনেপ্রাণে প্রতীক্ষায়’ আছি।
মুজিব রাহমান:সহযোগী অধ্যাপক,ইংরেজি বিভাগ,চট্টগ্রাম কলেজ।