রাজীব রাহুল
জানলায় দাঁড়িয়ে থমকে যাওয়া শহরটা দেখছে পরিমল। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর। এমন দিন তাকে দেখতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি । ব্যস্ত নগরটা একদম সুনশান। ঘুমিয়ে গেছে। কোথাও কোন কোলাহল নেই। উঁচু আকাঙ্ক্ষার মোহগ্রস্ত মানুষগুলো পালিয়ে গেছে ঘরের ঠিকানায়।
পরিমল নিজের সাথে বিড়বিড় করে। আহারে ঘর। মানুষের জন্মানোর পর থেকে আস্তে আস্তে দুটো শব্দ করোটিতে গেঁথে নেয়। ঘর আর সংসার। আসলে মানুষ শেষ পর্যন্ত বড্ড একা। আসা যাওয়ার মাঝখানে মানুষকে দক্ষ অভিনেতা ভূমিকায় অবির্তন হতে হয়।
গত শুক্রবার বৃদ্ধ আশ্রমে বারান্দায় চুপিচুপি এসেছিলো নয়ন। ছেলেকে দেখে বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠলো। বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়েছিলো। তখন অদূরে রাস্তায় পুলিশের জীপ আওয়াজ ভেসে আসে ‘ আপনারা ঘরে থাকুন, বের হলে দূরত্ব বজায় রাখুন’।
তখনো বুঝতে পারেনি পরিমল ছেলের শরীরে মরণ ছোবল মারছে। ছেলেটা দেশের নামকরা ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক। চারবছর পর বাবাকে বৃদ্ধ আশ্রমে এসে দেখিয়ে গেলো মরণের পথ। নিজের ছেলের বউয়ের অমানবিক নির্যাতনেও আত্মহত্যা করতে পারেনি পরিমল।
আজ নয়নের অকালে চলে যাওয়া তাঁর নয়নে জল গড়ায় না। কারণ তাকেও চলে যেতে হবে। ছেলেটা জেনেশুনেই তাকে সংসার নামক নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে গেছে। তাতে পরিমল চিন্তিত নয়। সে ভাবছে এই আশ্রমের নব্বই জন বৃদ্ধকে নিয়ে। পরিমল মারা গেলে আশ্রমটা লকডাউন হবে। তখন তারা কোথায় যাবে। তাহলে কিভাবে বাঁচানো যায় তাদের। যদিও সে এই কদিন কারো সস্পৃহে যায় নি।
সে চুপচাপ দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় আসে। তারপর অপেক্ষা। যে কাজ এতোদিন সে করেনি। কিন্তু না লকডাউনে তাঁর দেখা নেই। যাকে সে খুঁজতে বেড়িয়েছে। রাস্তার মাঝখানে আইলাইনারের ওপর বসে কাঁপছে সে। হঠাৎ তার আসার শব্দ কানে আসে। পরিমলের চোখ দুটো ঝলমল করে ওঠে। তারপর এক লাফে তাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা। কিন্তু না ততক্ষণে পণ্যবাহী ট্রাক পরিমলের মল বের করে দিয়েছে পেট থেকে। দ্বিখণ্ডিত মাথাটার চোখ দুটো চেয়ে আছে আকাশে জ্বলজ্বল করা চাঁদের দিকে।
রাজীব রাহুল : তরুণ কথাকার।