১২৩ তম জন্ম জয়ন্তী
মানুষ নজরুল : বাঙালির ঐতিহ্য স্তম্ভ
মুজিব রাহমান
পুবাকাশ
পুরুষোত্তম সত্য বিদ্রোহ-বাহী এই কবির বাহন কখনো তাজী বোররাক আর কখনো বা উচ্চৈশ্রবা। এবং এভাবেই দুই সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে তাঁর সাহিত্যকর্ম বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কাছে অবিভাজ্য একক সত্তায় স্থিত।
সর্বধর্মীয় সাংস্কৃতিক চর্চায় বাঙলা ও বাঙালির ঐতিহ্য স্তম্ভ কবি কাজী নজরুল ইসলাম। হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের চেতনার অভিন্নতা যাঁকে মডেল বাঙালিতে উন্নীত করেছে তিনি নজরুল। মণ্ডপে মণ্ডপে আজও তাঁরই গান গীত হয়।
রমজান শেষে ঈদের আগে আগে তাঁরই গান বেজে উঠে।
যতদিন না আমাদের চেতনার আকাশ নজরুলের আলোয় উদ্ভাসিত হবে আমাদের গত্যন্তর নেই।
গত শতকের বাংলাভাষী মানুষের কাছে নজরুল এক ঐতিহাসিক নাম। নিন্দাবাদের বৃন্দাবনে নিজেকে শাহানশাহ ভাবতে কখনো কুণ্ঠিত হতেন না কবি। সকল সংকীর্ণতা ও হীনম্মন্যতার বিপ্রতীপে নজরুল ছিলেন বিশ্বমানব। বাংলা মায়ের এই বিদ্রোহী কবি বিশ্ব ইতিহাসের বহুল পরিচিত দ্রোহী কবিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়দের একজন। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় বুদ্ধিবৃত্তিক অনানুগত্য ও অবাধ্যতার ইতিহাসে কবি নজরুল এক প্রোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহসে যে কবি লিখেছেন, লড়াই করেছেন নিরন্তর তিনি নজরুল। কুণ্ঠাবিহীন সত্য তাঁর কণ্ঠে চিরকালের আবেদন নিয়ে উচ্চারিত হতো। তাঁর নিজের ভাষায়:
‘মোদের চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল
বক্ষ ভরা বাক্,
কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন
নিত্য কালের ডাক।’
পুরুষোত্তম সত্য বিদ্রোহ-বাহী এই কবির বাহন কখনো তাজী বোররাক আর কখনো বা উচ্চৈশ্রবা। এবং এভাবেই দুই সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে তাঁর সাহিত্যকর্ম বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কাছে অবিভাজ্য একক সত্তায় স্থিত।
যুদ্ধবাজদের নিশ্চিহ্ন করে শান্ত উদার শান্তির পৃথিবী নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর কবির অন্য নাম নজরুল। কাজী নজরুল ইসলাম। যুগমানব নজরুল স্বাধীনতা, বিপ্লব, যৌবন ও মানুষের কবি। কেবল তাঁর সমকালের কবি ছিলেন না তিনি। অনাদিকালেরও কবি তিনি। মৃত্তিকা-সংলগ্ন তথা ‘মাটির কাছাকাছি’ থাকা মানুষ নজরুল। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী কবি নজরুল। মুটে-মজুর-কুলি-কৃষক এককথায় সকল দেহাতি মানুষের প্রতি দরদী কবি-ব্যক্তিত্ব নজরুল।
সে-জন্যে তাঁর উচ্চারণের কশাঘাতে জর্জরিত হতে হয় অত্যাচারী জমিদারকে এবং অবিবেচক শোষককে আর নিষ্ঠুর মহাজনকে। কবির শ্লেষ এখানে ছুরির ফলার মত ঝিকিয়ে উঠেছে:
‘তুমি শুয়ে রবে তে-তলার ‘পরে আমরা রহিব নিচে
অথচ তোমারে দেবতা বলিব সে ভরসা আজ মিছে।’
গভীরভাবে মানবতবাদী এ-কবি তাঁর উচ্চারণ ও কর্মপ্রবাহে কোন দূরত্ব রচনা করেননি।
তাঁর কৃষক-চৈতন্য, তাঁর মুসলিম পরিবারে জন্ম, তাঁর অসাম্প্রদায়িকতার দিক, তাঁর ঔপনিবেশিক শাসন-বিরোধিতার দিক, তাঁর তুমুল রাজনৈতিক সচেতনতা, তাঁর গণমুক্তির অভিযাত্রা, হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির ব্যাপক গভীর যৌথতা তাঁর বোধকে বিবেচনাকে কালের রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যে নজরুলই বোধ করি সবচেয়ে লড়াকু এবং উপনিবেশবাদ-বিরোধী লেখক যাঁকে সামান্যতম ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতা স্পর্শ করেনি।
নজরুল ইউরোকেন্দ্রিকতার বিপরীতে ব্যাপকভাবে এশিয়চেতনার প্রতিনিধি। তুমুলভাবে এশীয়। নজরুল দশের কথা বলেছেন আর দশজনের ভাবনামূলকে নিবিড় মমতায় স্পর্শও করেছেন। তাঁর রচিত কোরাসসমূহ তাঁর সামষ্টিক চেতনার প্রতিফলন।
ইন্দ্রিয়-জাগর উচ্চারণে, সাম্যবাদী-মার্কসবাদী কবিতায় এবং ইসলামচেতন কবিতায় তাঁর প্রভাব
বিপুলভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
নজরুল স্বঘোষিতভাবেই
বিপ্লব-বিদ্রোহ-পরিবর্তনের অঙ্গীকৃত প্রতিনিধি।
মানুষের ইতিহাস নির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা মানুষের। মানুষকে এ-জন্যে মানবিক হবার শর্ত পূরণ করতে হয়। মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ হতে হয়।
সামগ্রিকভাবে জীবনকে দেখতে হবে। জীবন বহু কৌণিক ও বহুপার্শ্ববিশিষ্ট। জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিক বা একপার্শ্বিক বিবেচনা জীবনকে আচ্ছন্ন করে দিলে সর্বগ্রাসী এক অন্ধতা জীবনকে পেয়ে বসে। যা মানবজাতির জন্যে, মানুষের জন্যে ক্ষতিকর, ব্যাপকভাবে অনিষ্টকর। এ-জন্যে নজরুল চেয়েছেন মানুষ আরও শিক্ষিত হোক, অধিকতর স্পষ্টভাষী হোক এবং সাংস্কৃতিকভাবে আরও বেশি সচেতন হোক। সবকিছুই হোক মানবিকতার জোরে।
একথা অবিসংবাদিত যে, ব্লেক উচ্চারিত Mind forged manacles তথা সংস্কারের নিগড় ভাঙ্গার কবি নজরুল।
পণ্যায়নের এ-বিশ্বগ্রামে দাঁড়িয়ে মানুষ যাতে আর পণ্য বিবেচিত না হয় সে-জন্যে নজরুল মানুষকে সাবধান করেছেন।
বলেছেন:
ফলের ঝুড়ি হলেই চলবে না। বহন করাই সব কিছু নয়। রসাস্বাদনও গুরুত্বপূর্ণ।
জলে-ডোবা নুড়ি পাথর হলে চলবে না। জলগ্রহণের ক্ষমতারহিত পাথরের জীবন মানুষের জীবন নয়।
মানুষের অবস্থা আজ নুড়ি পাথরের অবস্থা। পাথরের দশা।
‘ফল বহিয়াছো, পাওনিকো রস, হায়রে ফলের ঝুড়ি
লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায়নাকো নুড়ি।’
মানুষকে তিনি গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতাসম্পন্ন মানবিক মানুষ হিসেবে দেখেছেন। ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখলেই যেমন ধর্মের পবিত্রতা রক্ষা করা সম্ভব তেমনি মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে মানুষকেও জাতিগত বর্ণগত ও ধর্মগত বিভেদ-বিভাজনের ঊর্ধে উঠে মনুষ্যত্ববোধে উজ্জীবিত মানবিক মানুষ হবার জন্যে অনুক্ষণ অনুপ্রাণিত করেছেন নজরুল।
পৃথিবী ব্যাপি ডিকে অব সিভিলাইজেশান, ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন ইত্যাদি চর্চার এ দুঃসময়ে মানুষ নিয়ে কেউ ভাবছে না। ইউরোপের কথা, রাশার কথা উচ্চারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ ধ্বংসের চর্চা তারাই করছে। মানুষই করছে।
মানুষই অস্ত্রের জোরে নাকচ করে দিতে চাইছে শুভবাদী সব ভাবনা। শক্তিকেই সর্বস্ব ভেবে, স্বার্থবুদ্ধিকেই একমাত্র মোক্ষ জ্ঞান করে মানুষের রক্তে স্নান করছে পৃথিবীর নানা অঞ্চলের মানুষ।
পৃথিবীর তাবৎ মঙ্গলচিন্তার পরিণাম ধ্বংশ ও বিনাশ হতে পারে না। মানুষের শুভচিন্তা ও শুভবোধ অবিনাশী। শুভত্বের পক্ষে সব কালের সব মানুষের গান গেয়েছেন নজরুল। বলেছেন:
নাই দেশ কাল… অভেদ ধর্ম জাতি…
তাঁর আহবান সর্বজনীন, সর্বকালিক।
যখন তিনি লিখেন:
‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।
একজনে দিলে ব্যথা–
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা – সকলের অপমান।’
মানুষের স্বার্থবুদ্ধিজাত লোভ মানুষকে অমানুষে রূপান্তরিত করে।
নজরুলের উচ্চারণ স্মর্তব্য:
‘বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।’
নজরুলের সব কথার একটিই গন্তব্য।
যেখানে তাঁর দিলখোলা উচ্চারণ :
‘গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ [ মানুষ]
ধর্ম নির্বিশেষে সামষ্টিক সমতার কথা এমন করে আর কোন কবি বলেছেন বলে জানা নেই:
‘গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিশ্চান
গাহি সাম্যের গান।’ [সাম্যবাদী]
সর্বোপরি, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ কবিতায় কবির
পরম জিজ্ঞাসা:
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
এই ধিক্কার যিনি উচ্চারণ করেন তিনি জেনেছিলেন যে তাঁর প্রকৃত পরিচয়ের সামগ্রিকতা প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাসে রচিত হয়নি, বরং তা প্রোথিত আছে তাঁর দেশমৃত্তিকা, নিসর্গপ্রকৃতি ও আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে-উত্তরাধিকারে: তিনি বাঙালি। মানব ধর্ম ও দেশ-কালের হাত ধরেই এই সিন্থেসিসে উপনীত হতে পেরেছিলেন কবি।
মনের দরোজা-জানালা খোলা মানবিক মানুষ যার যুক্তির মধুরতা ও জ্ঞানের আলো এমন এক মানবিক আভা-বিভা তৈরি করবে যা anti-humanism-এর পক্ষে দাঁড়াতে বিপুল শক্তি ও সামর্থ্য যোগায়। নজরুলের গান ও কবিতা, রবীন্দ্রনাথের দর্শন একই অভিন্ন মানুষের কথা বলছে। যে মানুষ প্রথমে মানুষ শেষেও মানুষ। চূড়ান্ত বিচারেও অভেদপন্থী মানুষ। মানবিকতা তাঁর ধর্ম-দর্শন। পাশবিকতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই চির চলিষ্ণু।
সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের মৃত্যুতে পুত্রহারা মায়ের ক্রন্দন ও বেদনা আর সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর স্বামীর প্রয়াণে স্ত্রীর শোকার্ত হাহাকার যে হৃদয়বিদারক দৃশ্য সৃষ্টি করে তা সবিস্তার বর্ণনা করে কবি লিখেছেন:
‘ভগবান! তুমি চাহিতে পার কি ঐ দুটি নারী পানে?
জানি না, তোমায় বাঁচাবে কে যদি ওরা অভিশাপ হানে!’
এ-ভাবে ভগবানকেও মানুষের অভিশাপের পাত্র করে দেখিয়েছেন নজরুল।
কতোটা মানবিকতা ও সমানুভূতি কবিকে এমন উচ্চারণে বাধ্য করেছে তা সহজেই অনুমেয়।
৭৭ বছরের জীবন পরিসরে তাঁর সাহিত্য চর্চার কাল (১৯১৯ – ১৯৪২= ২৩) মাত্র ২৩ বছর। এ দু’যুগের কাছাকাছি সময় হাবিলদার কবি নজরুলের ধর্মের নাম ছিল – মানব ধর্ম। আর এক শতাব্দ পরে ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল কবি এরশাদ এটিকে রাষ্ট্রধর্মে রূপান্তরিত করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের রক্তে রচিত রাষ্ট্রটিকে জেরবার করে দিয়ে গেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের এক মিলন-মোহনায় দাঁড়িয়ে সকল প্রকার সংকীর্ণ বিভেদবুদ্ধির ঊর্ধে উঠে যে শান্তিপূর্ণ জাগতিক সহাবস্থান কবির আরাধ্য ছিল তা আজও অধরা। এ-কারণেও নজরুল আজ আরও অধিকতর প্রাসঙ্গিক।
মুজিব রাহমান: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ।