ভাষা ও বাঁচা।। ওবায়দুল করিম।। পুবাকাশ

১.
ভাষার দুই রূপ, লেখ্য ও কথ্য বা লেখায় ও কথায়। ভাষার জন্য শব্দ দরকার। শব্দ, অবশ্যই অর্থবহ হতে হবে। অর্থবহ শব্দ তৈরির জন্য, স্বরযন্ত্র সামর্থ্য সম্পন্ন হতে হবে। প্রাণী জগতে মানুষেরই একমাত্র অর্থবহ শব্দ তৈরি করার সামর্থ্য আছে। আর এজন্য প্রয়োজন ছিলো এপ ম্যান থেকে হোমো সেপিয়েন্স এ রূপান্তর, যার ফলে মানুষের স্বরযন্ত্র অর্থবহ শব্দ তৈরি করার উপযোগী হয়। লক্ষ্য করবার বিষয়,উৎপন্ন শব্দ অর্থবহ হতে হবে। এর অর্থ হলো শব্দটির অর্থ অন্যজনের কাছেও একই অর্থ জানান দিবে। সোজা কথায় শব্দটির অর্থ, অন্য মানুষেরা শেয়ার করবেন।

উদাহরণ দিয়ে বলি। কোন দপ্তরে মানুষের দাপ্তরিক কাজ কি ভাষায় যোগাযোগ ছাড়া সম্ভব? এই কাজের জন্য ভাষার লেখ্য রূপের প্রয়োজন। কোন শব্দের লেখ্য রূপ দেয়া হবে কিভাবে? তো দরকার চিহ্নের বা প্রতীকের। অ,আ,ই,ঈ বা A,B, C,D, হলো চিহ্ন বা প্রতীক।এক চিহ্নের পরে আরেক চিহ্ন দিয়ে এক শব্দ তৈরি হয় যা, ঐ চিহ্ন ব্যবহার করে কিছু মানুষ নিজেদের মাঝে ভাবের,চিন্তার,ধ্যান-ধারণার আদান-প্রদান করে। এইযে কিছু মানুষের সামাজিক সম্পর্ক,তা ভাষার কারণেই টিকে আছে। যে কথা বললাম, দপ্তরের কোন কাজই হবেনা ভাষা ছাড়া, তেমনি হবেনা,উৎপাদন,ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধূলা ইত্যাদি।পরিবার, রাষ্ট্র কোন কিছুই ভাষার শেয়ারিং ছাড়া সম্ভব নয়। এজন্য ভাষাকে অনেকেই উৎপাদিকা শক্তি বা উৎপাদনের উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ভাষার কথ্য বা কথার রূপ সভ্যতা তৈরি করেনা-প্রয়োজন লেখ্য বা লেখার রূপের। সভ্যতা মানে, শুধু দালান-কোঠা নয়, ঐ জনপদের বিশ্বাস,আচার-আচরণ, সংগীত , এক কথায় সমগ্র জীবন প্রণালী। বিশ্বাস,আইন-কানুন,রীতি-নীতি কি ভাষার সাহায্য ছাড়া স্টোর বা সঞ্চিত রাখা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা বিকিরণ করা সম্ভব? ভাষা সভ্যতার উন্মেষ ও পরিবর্তনের নিয়ামক।

যখন কোন নৃবিজ্ঞানী, এথনিক মাইনরিটি সমাজে গবেষণা করেন, তখন এঁদের ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা করেন আগে। ঐ সংস্কৃতির জ্ঞান-বিজ্ঞান সঞ্চিত আছে অক্ষরের পরে অক্ষরে গঠিত শব্দ ও বাক্যে।
হিব্রু ভাষা ছিলো মৃত ভাষা। ইজরাইলিরা একে জীবন্ত করেছেন। এতে তাঁরা তাঁদের অতীত কিছুটা হলেও উদ্ধার করেছেন।

ভাষা একটি জাতির সামগ্রিক জীবন-ব্যবস্থা কে ধারণ করে।ভাষা হারিয়ে গেলে ওই জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও হারিয়ে যায়।কোন জাতিকে ধ্বংস করতে , ঐ জাতির ভাষা ভুলিয়ে দিলেই হলো। পাকিস্তানী শাসকেরা তাই চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু ব্যর্থ হলো তারা।
Lingua franca হিসেবে যাঁরা ইংরেজীকে গ্রহণ করতে চাইলোনা,তাঁরা Esperanto বলে কৃত্তিম ভাষা তৈরি করলেন।

তৈরি করার চেষ্টা অব্যাহত আছে Euro-English এর।
পৃথিবীর সমস্ত ভাষার জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সঞ্চিত করবার জন্য এসেছে, ষোল বিটের কোডিং সিস্টেম। কম্পিউটার এর ভাষাও কৃত্রিম। সি++, ভিজুয়াল বেসিক ইত্যাদি একধরনের ভাষাই- মেশিনের সাথে যোগাযোগের জন্য মানুষের তৈরি ভাষা। এ ভাষা না থাকলে, জড় মেশিনকে ব্যবহার করে আমাদের দৈনন্দিন অনেক কাজই সম্ভব হতোনা।
তো ভাষাই হলো সভ্যতার বাহন।এর যত্ন ও সংরক্ষণ অতীব জরুরী।

২.
ভাষার পরিবর্তন,সামাজিক পরিবর্তনের কারণে হতে পারে, আবার ভাষার কারণে সামাজিক পরিবর্তনও হতে পারে। আমরা ভারতের ক্ষেত্রে তাই দেখি।

ইংরেজরা ভারতকে উপনিবেশে পরিণত করার পরে, প্রয়োজন হয় ভারতের পুরোনো জমিতে মালিকানা স্বত্বহীন এশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন। ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন না করলে, ইংরেজরা শোষণ ও সম্পদ স্থানান্তরকে নিরঙ্কুশ করতে পারেনা। অর্থনীতি বলে, উৎপাদনের জন্য দরকার, জমি,পুঁজি,শ্রম-শক্তি ও সংগঠনের। জমিতে ব্যক্তি মালিকানা না থাকলে , পুঁজিবাদের- তা বিকৃত বা পরিপূর্ণ যাইহোকনা কেন- উদ্ভব ঘটে? এর সাথে প্রয়োজন শ্রেণী বিন্যাসের। ভারতে না ছিলো সামন্ততান্ত্রিক না পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। শ্রেণী ব্যবস্থা ,জমির মালিকানাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত না হওয়ায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ হয়নি। অথচ মধ্যবিত্তের উদ্ভব ও বিকাশ পুঁজিবাদের সহগামী। ইংরেজদের দরকার ছিলো, নিয়মিত খাজনা আদায় হওয়া, জমির মালিক, জমিদারী ব্যবস্থার সৃষ্টি।কালো বা বাদামী চামড়ার মধ্যবিত্ত তৈরি করা,যাঁরা চিন্তা-চেতনায় ইংরেজ হবে এবং ইংরেজদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট হবে। এই শ্রেণীই বাবু শ্রেণী হিসেবে পরিচিতি পায়। আর এসব কারণেই ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী আইন প্রবর্তন করা হয়।

এই বাবুদের যদি চিন্তা-চেতনায় ইংরেজ বানাতে হয়, তাহলে ফারসি ভাষায় তা সম্ভব নয়। ফারসি ভাষায় রুমি, খৈয়াম বা জরাথুস্ট্রবাদ শেখানো যায়, শেখানো যায়না,জাতীয়তাবাদ,গণতন্ত্র, পার্লামেন্টারি পদ্ধতি, আধুনিক বিচার ব্যবস্থা, ভারতের সংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসের বিপরীতে ইউরোপীয় বিশ্বাস। আর এগুলো শেখানোর জন্য , ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজি প্রচলন করা হয় ,১৮৩৫ সালের ইংলিশ এডুকেশন আইনের মাধ্যমে। এ আইনের ফলে, ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজী হয় শিক্ষা, প্রশাসনিক, আদালতের, বলতে গেলে সামগ্রীক নিয়ামক। ফলে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভারতে বেঙ্গল রেনেসাঁস আন্দোলন সৃষ্টি করে। এতে বিধবা বিয়ের প্রচলন হয়, সতীদাহ প্রথার হয় নিবারণ। ভারতে তৈরি হয়, আমলাতন্ত্র, পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার।ভারতীয়রা জানতে পারে তাঁরা একটি জাতি। আজ পর্যন্ত ইংরেজরা আসার পরে যত পরিবর্তন,তা সম্ভব হতোনা ইংরেজীর যদি প্রবর্তন না হতো। আমাদের আজকের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্ব মূলতঃ,  ইংরেজি ভাষার প্রচলনের ফল।

বলা হয়ে থাকে, প্রতিটি সমাজেই থাকে, মূল্যবোধ, আইন-কানুন, রীতিনীতি, ধর্ম, রাজনৈতিক আদর্শ ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো জনপদের ভাষা ছাড়া কি কোন জনগোষ্ঠীকে সামাজিকীকরণ করা যায়।আর সামাজিকীকরণ ছাড়া, সমাজ সচল থাকে?
না, নিশ্চয়ই না। ভাষা এক বাহন, যার উপর সমাজ ও সভ্যতা নির্মিত হয়।

ড. ওবায়দুল করিম: বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী, প্রফেসর, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন