যেখানে জলের দুঃখ শস্যের স্বপ্ন একসাথে সংসার গড়ে


শাহজাহান শাজু


পুবাকাশ


কবি মহিবুর রহিমের ‘হাওর বাংলা’র একটি পর্যালোচনা

মহিবুর রহিম ৯০ দশকে বইপড়া আন্দোলনের মাধ্যমে সাহিত্য সংস্কৃতি জগতে প্রবেশ করে স্বকীয় ধারার কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অতি অল্প সময়ের মাঝেই। নয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও এগারোটি গ্রন্থ ইতোমধ্যেই রচনা করেছেন। বাংলা কাব্য জগতের বিদগ্ধজন কবি সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মুহম্মদ নূরুল হুদাসহ অনেকে ইতোমধ্যেই তার কবিতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তার নিরীক্ষা, অনুসন্ধান ও সাধনার ফসল খুঁজে পাওয়া যায় তার আত্মগত শব্দচিত্রময় কাব্যশীলনে । কবিতায় তার প্রাঞ্জলতা জীবন বীক্ষণ সচেতন পাঠক মাত্রেই ধরা পড়ে। আলোচ্য ‘হাওর বাংলা’ কাব্যগ্রন্থে ছন্দের সাথে ভাবের মেলবন্ধন তার নিরীক্ষারই একটি ইতিবাচক ফলাফল।

মহিবুর রহিম শব্দ শিল্পী। সেকারণেই একটা নিজস্ব পোয়েটিক সেন্স তার কবিতার সৌন্দর্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে আপন বৈশিষ্ট্যে। সাথে সাথে প্রতীকী তাৎপর্য তার কবিতার চরনে যেন জ্যোতি ছড়িয়ে রাখে। শস্যের স্বপ্ন দেখার আশায় কবি নদী ভাঙন আর জলের দুঃখকেও বয়ে নিয়ে চলেন জন্ম থেকে প্রাত্যহিক জীবনাচরণে আর অভিজ্ঞতার সাথে আত্মবোধের রূপকল্পে। জীবন দহনকে মন্থন করে যেন নতুন অমৃতের সন্ধানে কবি গ্রহান্তরে বিচরণের মতোই নতুন ধারার কাব্যজগৎ নির্মাণ করে চলেন।
কবির সাতাত্তরটি কবিতার অনবদ্য গ্রন্থ ‘হাওর বাংলা’য় নিজস্বধারার কাব্যিক উচ্চারণে বাংলা ও বাঙালির অহংকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সংগীত রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় কবি নজরুল শিরোনামের কবিতায় চিরায়ত বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য ও ইতিহাস অনেকটা নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে।

‘বঙ্গবন্ধু : অনিবার্য ইশতেহার’ কবিতায় কবির উপলব্ধি- ‘আমি এক দ্রাবিড় যুবকের মতো মাটিতে উপুড় হয়ে/অচ্যুত সেই স্বপ্নকে পুতে রাখলাম।/ কেউ জানে না কীভাবে শতশতাব্দীর বৃক্ষ হয়ে/ পাখি হয়ে, নদী হয়ে এবং চূড়ান্ত অর্থে মানুষ হয়ে/ স্বপ্নের সেই চারাগাছ ঢেকে দিলো/ আমাদের ভূগোলের সবুজ দ্রাঘিমা। কিংবা  অনিবার্য আকাঙ্ক্ষার মাটির চত্বরে/ ঝিম ধরে আছে একটি ফলিত সম্ভাবনার গান/ যেন এক অনিবার্য ইশতেহার/ – হাজার বছর পেরিয়ে আমাদের কন্ঠে জেগে উঠলো /একটি উদাত্ত আহ্বান -/ এবারের সংগ্রাম আামাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম / এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ ‘রবীন্দ্রনাথ’ কবিতায় কবির উচ্চারণ-‘ তাঁর ধ্যানী ছবি ছাড়া পূর্ণ নয় উপমহাদেশ’। ‘নজরুল’ কবিতায় কবির মূল্যায়ন, তিনি  ‘দ্রোহী আর নিরাপোষ  চেতনার অদম্য বিপ­বী’ এবং ‘তার কণ্ঠে মানুষের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাই’।

গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা নাম ভূমিকার কবিতা ‘ হাওর বাংলা ’। ধানের দেশ, গানের দেশ, আউল- বাউল, পীর-ফকির, কৃষিজীবী-মৎসজীবী মাটি-মানুষের আবহমান জনপদ এই ভাটি বাংলা। এই জনপদের নদীবিধৌত পলল সঞ্চিত জীবনবোধের দার্শনিক শৈল্পিক কথনে কবির চেতনা একাকার। হাজার বছরের নদীতীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠা সভ্যতার আবহমান নৈসর্গিক জীবনের অনুভব অনুভূতির কথকতায় কবির বোধ শব্দচিত্রে ভাবময় হয়ে ফুটে উঠেছে।

হাওর বাংলার বর্ণনায় সনেটের ফ্রেমে কবির শৈল্পিক উচ্চারণ

‘জলে ভরা রোদে পোড়া অবিচল দুঃখ-সুখ প্রীতি
চোখের তারার মতো মায়াভরা থোকা থোকা গ্রাম
চাঁদের আলোর মতো ঝিম ধরা নীরব প্রকৃতি
যেখানে ঢেউয়ের সুরে খেলা করে ভাটির সুনাম।’

কাব্যকথা কমল সুগন্ধি ভরিপুর। মহাকবি আলাওলের এই বাণী থেকে বলতে পারি কবিতা ভাবের পদ্মগন্ধময় এক উপলব্ধি। কবিতা কখনো স্পর্শময় কখনো অসীমের আনন্দের আঘ্রাণ ও আস্বাদ। এ-ই যদি হয়, কবিতার সমৃদ্ধ সঞ্চয়; কবিতার আলোচনাও কম আনন্দের নয়। আমি তাই কাব্যরস আস্বাদনে কবির সাথে তার কাব্য বারবার পাঠে একাত্ম হই।
যদি ইতিহাসের কাছে যাই তাহলে ভাটি বাংলার ইতিহাস আবহমান কালের ইতিহাসের সমান বয়সী এবং একইসূত্রে গাঁথা। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত এমনকি আজকের সময়েও যে কোন মাটির কাছাকাছি তরুণ কবির কবিতায় প্রকৃতি কাতরতাই প্রধান প্রবণতা। পুঁজিবাদী যান্ত্রিক সভ্যতার আজকের চলমান সময়েও কবিরা আপন জীবন ও সমাজ অনুষঙ্গের প্রেম প্রকৃতির কাছে আত্মবোধের শব্দ শীলনে নিমগ্ন থাকেন।


কবিও মানুষ। ব্যক্তিগত মানুষ, দৈশিক মানুষ এবং বৈশ্বিক মানুষ। তাই আত্ম অবস্থানে স্থিত, আপন সমাজের হিতবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। জাতীয় চেতনা ঋদ্ধ হয় অধিকারের বোঝাপড়ায়। কবি বিশ্ব মানবতার একজন হয়ে আপন সমাজ আর জীবনের সেতুবন্ধন মিলিয়ে নেয়ার দার্শনিক চেতনা জাগ্রত শব্দ বোধ সৃষ্টি করেন। এইখানেই তার পারম্পর্য আর নিজস্বতা।
এমন স্বতঃস্ফূর্ত স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে মহিবুর রহিমের কবিতায়।
‘যেখানে জলের দুঃখ শস্যের স্বপ্ন এক সাথে সংসার গড়ে’
‘সেইদেশে যেতে যেতে রূপকথা হয়ে যায় প্রতীক্ষার প্রহর
সতেরো হাওর আর তেরো নদী কল্পনার ডানা মেলে উড়ে’। (জলের দুঃখ শস্যের স্বপ্ন)
যেখানে –
‘ধানকন্যা বিছিয়ে রেখেছে শাড়ি সবুজ সোনালি’
ভরিয়ে রেখেছে সেই মায়াময় ঘর গৃহস্থালি।’
সেখানে –
‘হাওর বাওর খালে ঢেউ দেখে বিমোহিত কবি।’ (ধানকন্যা )
তখন কবি সৈয়দ আলী আহসানের কবিতার উপমার শক্তির সাজুয্য খুঁজে পাই মহিবুর রহিমের উচ্চারণে-
‘হিজল মান্দার বনে ফুটে থাকা আশার মুকুল
– – – এখনো আমাকে টানে
কাদাঙ্গীর জলে ভরা নদী
বয়ে চলে কী যে নিরবধি
– – – মাঠ ভরা আশালতা ধান
মানুষের স্বপ্নের সমান’ (শস্য গন্ধী ভোর)

কবি বার বার সেই স্বপ্নের কাছে ফিরে আসেন
‘দূরের বন্দে সূর্য উঠে এলে
মায়াবী ধূলোর ভেতরে
হাঁটতে হাঁটতে কতদিন
স্বপ্নের কাছে ফিরে আসা’ (চিরদিন)
এরই মাঝে ‘মা জননীর গল্প’ বিষণ্নতায় ভরা। অভাবের সংসারে মা প্রতীক্ষারত; বাবা সাম্যবাদী কমিউনিস্ট। তবুও ‘মা’-ই  প্রতিদিন আশার নতুন দিনের দরোজা খুলে দিতেন।
কোন কোন সংসারে পুরুষানুক্রমে জমি আবাদ করে আর গান গেয়ে জীবন সংগ্রামী পনের পুর“ষ ধরে কালচক্রে ভাটির সুনাম ধরে রেখেছে। তাছাড়া বীজের লুকনো স্বপ্নে উড়ালের আগ্রহ – জোহরা তারার গল্প, হৃৎস্পন্দনে আকাশ জয়ের কাহিনি আর অদম্য ডানাতে দীপ্যমান জীবন সঞ্চয় -‘কত ব্যক্তিগত ইচ্ছেরা ছড়িয়েছে  প্রত্যাশার আলো’। -এ সবই নানা অনুষঙ্গে, পাখির নামে কবি মনে ‘সাদা স্বপ্নরেখা এঁকে দেয় পথ।’

কবির চেতনা ‘চিরসবুজ বদ্বীপের মতো সম্ভাবনার বুক।’ কিন্তু তবু্ও ‘কঠিন শূন্যতায় কাঁপছে ভারাক্রান্ত চেতনা।’; ‘অনেক জিজ্ঞাসা ও ব্যক্তিগত চেতনার গভীরে কবির ‘দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিধালিপ্ত চলমান সভ্যতার শিল্পকর্মে।’ এমন সময়ে কবির মেঘেদের সাথে কথা হয়েছিল শান্তির নিঃশ্বাসে। ‘মনে হয় সেই থেকে আমি মেঘ ভালবাসি।’

শতাব্দীর পথের যাত্রী তিনি। আবহমান বাংলার জীবন পথের ঋদ্ধ উচ্চারণে তাই কবির আশাবাদের ঘোড়া থামতে চায় না – ‘সাদা কাগজের মতো প্রতিশ্রুতির শুভ্রতায় সবুজাভ অঙ্গীকার’ – ‘গন্তব্যের স্বপ্ন অহর্নিশ চারপাশে জ্বলে।’
‘একদিন সবুজের সান্নিধ্যে উজ্জ্বল রঙিন আশার অনশ্বর প্রেম’ এখন ‘করতলে রঙিন রোদের মহীরুহ।’ সেই আশাবাদে ‘তবু মৃত দৃশ্যের  ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে আসে প্রেম’। ‘সোনালি ধানের মতো রৌদ্রময় জ্বলে সেই প্রেম’। কবির কাছে প্রেম হলো মুগ্ধতার ছবক আর প্রকৃতি হলো বোধের জননী – তার জন্যেই এই কবির পথচলা যুগান্ত অবধি।

জীবনের গভীরে প্রবেশ করে মহিবুর রহিম সেই হাওরের মানুষকে ভালোবেসে তাঁর কাব্যে তুলে এনেছেন অনন্য জীবনবোধ আর মমতায় স্নিগ্ধ সব পংক্তিমালা। ভাটি বাংলার জীবন দর্শন তাঁর এ কাব্যের অধিকাংশ কবিতায় ঘনিষ্ঠ আন্তরিকতায় আবিষ্কৃত হয়েছে, বাংলা কবিতায় এই বিষয়টি নিয়ে এত ব্যাপক অনুসন্ধান এর আগে সম্ভবত এমনভাবে দেখা যায়নি। ভাটি বাংলার নিজস্ব জীবন, জনমানুষের স্বপ্ন ও প্রকৃতির স্বকীয়তা – সর্বোপরি হাওর জনপদের জীবন দর্শন মহিবুর রহিমের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে অনন্য এক বৈশিষ্ট্য হয়ে ফুটে উঠেছে।

আমি সে কারণেই মহিবুর রহিমকে ভাটি বাংলার দার্শনিক কবি বলতে দ্বিধা করিনি। উদাহরণের আলোয় তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে
‘আঘ্রাণের শেষে মাঠে মাঠে কাটা ধান শেষ হয়ে গেলে
গভীর একটা শূন্যতা পড়ে থাকে নীরব প্রহরে
—————-
রহস্যের ইন্দ্রজাল হাতে জ্বলে উঠে কৃষ্ণপক্ষ চাঁদের আলো
এইশূন্যতার ভিতর খেলা করে কোন একটা অশরীরী সাদা আর কালো
সাদা থেকে ছুটে আসে শতশত পদাতিক ঘোড়া
কালোর পাহাড় ভেঙে ছোটে এরা দিগ্বিদিক।’
(আঘ্রাণের শেষে)
‘মাটি ও মানুষের অবিশ্রাম প্রয়াস জলে-স্থলে
খাল-বিল, হাওর-নদী, আবাদি প্রান্তরে
শস্যের সপক্ষে অনাদী সংগ্রাম।’
(হাওর বর্ণনা)
‘শস্যভরা মাঠের হৃদয়ে
আমাদের স্বপ্নময় গ্রাম। সেই পানির দেশ ভাটি অঞ্চলে
গাছপালার মমতায় ঋদ্ধ আমাদের বাড়ি
– – – – – – – –
আবাদি জমিনগুলো আমার মায়ের স্নেহের আঁচল
নিষ্কলুষ ফসলের জন্য আমাদের চৌদ্দ পুরুষের সংগ্রাম
আব্বা ছিলেন উত্তরাধিকারী একটা যোদ্ধা
সম্মান ও শস্যের জন্য সামান্য আপোষ ছিল না জানা।’
(রূপকথার গল্প না)
‘নদী বহিয়া চলে, কালও বহিয়া চলে
বারঘর একটা উঠান, একটি ইচ্ছে সহস্র পালে’
(তিতাসের নিরবধি ঢেউ)
‘বৈশ্বিক চাহিদা রোদে হয়েছে মলিন
প্রতিদিন বঞ্চনার নোটিশ দিয়ে
আসে কুশলী বাতাস
পরিত্যক্ত কাকতাড়ুয়ার সাথে
সময় ক্রমেই ক্ষীণ করে দিচ্ছে
আশার অঙ্গন।’
(রাখাল জীবন)
‘আদিগন্ত সবুজ প্রান্তরে
যেদিন হারিয়ে গেছে দিনের ভিতরে
যে সময় হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে
যে আনন্দ ঘুমিয়ে পড়েছে নিঃসঙ্গ পাতার গভীরে
আমার কান্নার উচ্ছ্বাসিত ঝর্ণাধারা
পায় না খুঁজেও তারে পলকের তরে।’
(আমার কান্নার ঝর্ণাধারা)
কবির সরল স্বীকারেক্তি-
‘দুঃখের পানিতে সেচ দিয়ে গড়ে তুলি / উত্তরাধিকার চিত্রকল্প আমার’
কবি তার কারণও বর্ণনা করেছেন
‘মাটি বা জলের গন্ধে উদ্বেলিত /আবাদের সবুজ চেতনা/ সৃজনের ছন্দে গাঁথা/ আদিগন্ত শস্যের বন্দনা’
কবির এই আশার জমিনে
‘চাতুযর্য বা কৃত্রিমতা কোনদিন স্পর্শ করে না এই ভূমি।’ ( চাষ দেয়া কবিতার জমি)
তাই  কবির অকপট স্বীকারোক্তি
‘যান্ত্রিকতার শিকল খুলে কোনদিন সেখানে যেতে পারিনি
শুধু তার সুখদ গন্ধ শুঁকেছিলাম’ (ট্রাজেডির শস্যক্ষেত্র)
তাই ‘হাওর বাংলা’র স্বকীয় চেতনাধারী এই কবির কাছে
‘কিচ্ছা শুধু কিচ্ছা নয়
আকাশ সমান ইচ্ছাঘেরা/ কল্পলোক
জীবনেরই চাওয়া পাওয়া রক্তমাখা
হাসি-কান্না দুঃখ- শোক
পরাধীনতায় বাস করে যে
কিংবা কঠিন দাসের জীবন; তাহারও
ইচ্ছেগুলো ভাঙতে পারে লোহার শিকল
এবং একটা বিশাল পাহাড়ও। (ইচ্ছেগুলো)
কারণ, কবি জানেন,
‘মানুষ মাত্রই স্বাধীনচেতা’ কিংবা ‘মৃত্যুকে ভেদ করে উঠে আসে যার ডানা’
এই ভাটি বাংলার জীবন দর্শনের মূল কারণও রয়েছে কবির জীবন গাঁথায়, শৈশব, কৈশোরের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা আর পরিণত জীবনের উপলব্ধিতে। এ বছরের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী আবদুল রাজাক গুরনাহ এঁর মতোই কবি মহিবুর রহিম শেকড় ছেঁড়া নাগরিক যুগ যন্ত্রনায় নষ্টালজিক। খোঁজে আনেন চিরায়ত ভাটি বাংলার জীবন, মনন ও প্রকৃতি। যে জীবন আপন অনুভবের চেতনায় ঋদ্ধ। নিজস্ব দার্শনিক চিন্তায় বয়ে চলে নিরবধি।
কাব্যগ্রন্থের শেষভাগে স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতাগুলো সুখপাঠ্য হয়ে পাঠককে আনন্দ ও অবকাশ (রিলিফ) দেয়। গভীর ভাবে দেখলে ভাটি বাংলার আঞ্চলিক শব্দের গাঁথুনিতেও কবির মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। লোদ, দারকিনা, দঙ্গল, গোপাট ইত্যাদি আঞ্চলিক শব্দের সাথে গ্রামীণ উপমার ব্যবহারে কবির দক্ষতা প্রশংসনীয়।
কিন্তু একটি উপমা,
‘বিপন্ন শস্যের প্রাণ হাতে হাতে তুলে নেয় দুধারি তরবারি’ (আঘ্রাণের শেষে) হয়তো পাঠকের মনকে আচ্ছন্ন কিংবা বিপন্ন করে তুলে। দু’ এক জায়গায় মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েছে। যেমন ২৪ ও ২৫ পৃষ্ঠায় গেথে ও চত্ত্বর হবে গেঁথে ও চত্বর। কিন্তু একথা সত্য যে এসব খুঁটিনাটি বিষয় একান্তই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে বলেই হয়েছে।
আমরা বলতে পারি, কবিতা কুসুমের স্ফুটন কেন্দ্র কমবেশি দুর্গেয়। আর রহস্যময় বলেই পাঠকের কাছে কবিতা যেমন ইন্দ্রিয়জ হয়েও অতীন্দ্রিয় আনন্দ দেয়, কবির কাছেও বোধহয়।
মহিবুর রহিম সম্পর্কে বলা যায়, হাওর বাংলার সহজ সৌন্দর্যের মাঝেই তিনি এনেছেন ভিন্ন মাত্রা। আঙ্গিক ও ভাবগত নিজস্বতার নিরিখে দিয়েছেন যৌক্তিক দার্শনিক চেতনা যা সত্যের অধিক সত্যকে করেছে প্রস্ফুটিত। আর তাই এ কাব্য পাঠককে আলোড়িত আন্দোলিত করবে এটাই স্বাভাবিক। স্বতন্ত্র শৈলীতে ‘হাওর বাংলা’ কবিতা প্রেমীদের কাছে সাফল্যের লাবণ্য প্রভা ছড়াবে নিঃসন্দেহে। চেতনাঋদ্ধ আবহমান বাংলার শাশ্বত রূপ দার্শনিক বোধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সম্ভবত প্রথম মহিবুর রহিমের ‘হাওর বাংলা’ কাব্যেই।


শাহজাহান শাজু : লেখক ও অধ্যাপক।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন