প্রমোদ জিঞ্জিরা…।। আহমেদ মনসুর।। পুবাকাশ
গগনে চাঁদের মুখে আকর্ণ হাসি
জলধির বুকে দুধশাদা জোছনার চিকিমিকি
অবারিত জলরাশির মতো আনন্দ ফোয়ারা
জীবনের বসন্ত যেন ফুটেছে শিমুল পলাশ…
বাংলাদেশের প্রথম সারির সিমেন্ট উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেড। কোম্পানির ডিলার আর কর্মকর্তাদের নিয়ে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত নারিকেল জিঞ্জিরা খ্যাত একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে এক চমৎকার আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করে গত ৪ মার্চ। ৪ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত তিনদিনের এ সফরে ৩৩০ জনের বিশাল বহরে কোম্পানির কর্মকর্তা হিশেবে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমারও। এ আজিমুশ্শান আয়োজনের অংশ হতে পেরে সত্যি আমি গর্বিত ও আনন্দিত।
এ ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ ‘এম.ভি বে ওয়ান ক্রুজ’। আন্তর্জাতিক আর ফাইভ স্টার মানের এ প্রমোদতরীতে সেন্টমার্টিন যাত্রাটা আমার জীবনে একটা অবিস্মরণীয় ঘটনা বটে।
জাহাজটির দৈঘর্য ৪৫০ ফুট, প্রস্থ ৫৫ ফুট। এটি ঘণ্টায় ২৪ নটিক্যাল মাইল বেগে চলে। এতে আছে প্রেসিডেন্ট স্যুট, বাংকার বেড কেবিন, টুইন-বেড কেবিন, আরামদায়ক চেয়ারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির আসন। এছাড়া একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ, স্বয়ংক্রিয় ভেন্ডিং মেশিন এবং কয়েন পরিচালিত ঝর্ণাও আছে। যাত্রীদের সেবায় এই জাহাজে আছেন মোট ১৬৭ জন ক্রু, যার মধ্যে ১৭ জন আছেন জাহাজটি পরিচালনার দায়িত্বে।
৪ মার্চ রাত দশটায় পতেঙ্গা এলাকার ১৫ নম্বর বিমানবন্দর ঘাটে নোঙর করা আলোচিত জাহাজটির পাটাতনে পা রাখলে অন্যরকম এক অনুভূতি খেলে যায় পুরো শরীরে। ১১ টায় সিংহের মতো হুংকার দিয়ে চালু হয় ইঞ্জিন। পাঁ পাঁ করে বেজে ওঠে কর্ণবিদারী হুইসেল। জাহাজে ঢুকে আমার জন্য নির্ধারিত ‘ডেক সি’ এর ৪১৭ নম্বর বাংকার বেড কেবিনে ব্যাগটা রেখে উঠে যাই একেবারে জাহাজের খোলা ছাদে।
যাত্রীদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য এর চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী। এক পাশে মহিলাদের নামাজের স্থান, অন্যপাশে পুরুষের। কি অপরূপ দৃশ্য! হিমেল হাওয়া এসে শরীরে পরশ বুলিয়ে যায়। আকাশের দিকে তাকাই। আধখানা চাঁদ আমার পিছু নেয়। অগুণিত তারা। জাহাজের আলোয় তরঙ্গায়িত বঙ্গোপসাগরের মাতাল জনরাশি আমাদের অভিবাদন জানায়।
ষষ্ঠ তলার একপাশে প্রেসিডেন্ট স্যুট অন্যপাশে সুবিশাল জায়গা নিয়ে গানের আসর। মঞ্চে সঙ্গীতের যন্ত্রানুসঙ্গ। সম্মুখে ২৫০ জন যাত্রীর জন্য সারি করে সাজানো সব সোফা। ভিআইপিদের জন্য আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে আরও অনেকগুলো সোফা। রাত বারটার দিকে সঙ্গীত শিল্পীরা মঞ্চে আসেন। শুরু হয় গান। সহকর্মীদের নিয়ে গানের তালে তালে শরীর দোলালাম অনেকক্ষণ।
একটার দিকে জাহাজ কর্তৃপক্ষ নাস্তা দিলো- একটা সেন্ডউইচ, একটা কলা, এক বোতল পানি। খেলাম। রাতের খাবারেরও বন্দোবস্ত ছিলো ওখানে। কিনে খেতে হয়। আমি যদিও বাসা থেকে খেয়ে গিয়েছিলাম। পুরো জাহাজ ঘুরে ঘুরে দেখলাম কিছুক্ষণ। রেলিং ধরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে জোছনা সুধাও পান করেছি দীর্ঘক্ষণ। চাঁদের দুধশাদা আলো এসে রাতের সমুদ্রের পানির সাথে মিতালি পাতায়। কি অদ্ভুত সৌন্দর্য এক! নয়নাভিরাম শুধু নয়, হৃদয়াভিরামও। অপরূপ স্বর্গীয় দৃশ্য। রাত চারটা পর্যন্ত একনাগাড়ে চলেছে সঙ্গীতানুষ্ঠান। গানের পালা সাঙ্গ হলে কেবিনে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই নিদ্রাদেবী এসে আমায় নিয়ে গেল স্বপ্নসাগরের স্বর্ণমন্দিরে।
ঘুম ভাঙে ভোর ছয়টায়। বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে গেলাম। সূর্য তখন সমুদ্র ভেদ করে পুবের আকাশকে লাল আভায় ভরিয়ে দিয়েছে। পানির দিকে তাকালাম। কি নীল! কাকচক্ষু স্বচ্ছ। দূরে তাকালাম। অথৈ জলরাশি ছাড়া আর কিছুই নেই। আমরা তখন গন্তব্য হতে অনেক বেশি দূরে নয় হয়তো। ছবি তুললাম কয়েকটা। এরপর প্রাতকার্য সেরে ব্যাগ ঘুচিয়ে কাঙ্খিত দ্বীপকুলে নামার অপেক্ষায় ক্ষণ গণনা শুরু করি।
সকাল ৭ টায় জাহাজ সেন্টমার্টিনের প্রধান জেটির একটু অদূরে গিয়ে ভিড়ে। এম.ভি মতিন নামের ছোট একটি জাহাজ এসে যাত্রীদের ভাগ করে তুলে নিয়ে জেটিতে নামিয়ে দেয়। আমাদের জন্য নির্ধারিত ময়নামতি রিসোর্টে ব্যাগ রেখে চলে গেলাম হোটেল সী প্রবালে। ডায়মন্ড সিমেন্ট আয়োজিত খাবার-দাবার, চা-নাস্তা, আনন্দ আয়োজন, অনুষ্ঠানাদি সমস্তই হবে সেখানে।
বাবুর্চি, যোগালীসহ আমাদের অগ্রগামী দল একদিন আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। পূর্বের তথা ৩ মার্চ রাত থেকেই রান্নার সমস্ত এন্তেজাম শুরু হয়ে গিয়েছে। ডেকোরেশনের কাজও সম্পন্ন। আমরা ৩৩০ জন সফরসঙ্গীর জন্য নির্ধারিত ছিলো মোট ১২ টি রিসোর্ট। সবগুলো রিসোর্টের প্রবেশ পথে ডায়মন্ড সিমেন্টের ফেস্টুন, ব্যানার টানানো হয়েছে। গোছানো আয়োজন দেখে মনটা ভরে গেলো।
সী প্রবালে গিয়ে দেখি সকালের নাস্তা প্রস্তুত। গরম গরম আলুভাজি, হালুয়া, পরটা আর চা। পুরো আয়োজনের বাজার সদাই সব চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে গেছেন আমাদের অগ্রগামী দল। নাস্তা সেরে সোজা চলে গেলাম প্রধান জেটিতে। ইঞ্জিনচালিত একটি তরী ২,৪০০ টাকা দিয়ে রিজার্ভ করে আমরা ১২ জন সহকর্মী চেপে বসি। সমুদ্রের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম প্রকৃতির অপরুপ দান ছেঁড়াদ্বীপের কাছে। আহা! নয়ন জুড়ানো তার রূপ। প্রেমিক মাত্রই তার প্রেমে মজতে বাধ্য।
পুরো দ্বীপটি ঘুরতে সময় লাগলো এক ঘণ্টার মতো। ইচ্ছেমতো ঘুরাঘুরি, ছবি তোলা হলো। আস্ত একটি তরমুজ কিনে সবাই মিলে খেলাম। স্থানীয়রা গোল সবকিছুকে ‘গুলা’ বলে। তরমুজকে বলে ‘তরমুজগুলা’। এনিয়ে হাসাহাসি হলো। ওখান থেকে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যায়। পেটের ক্ষুধায় অস্থির। সী প্রবাল তথা খাদ্যভান্ডারে গিয়ে দেখি তরকারি আছে ভাত নেই। কোনরকমে পেটে কিছু চালান দিতে পেরে শান্তি। রুমে এসে দিলাম নাক ডাকা ঘুম। ঘুম ভাঙলে দেখি দিনের আলো ফুড়ুৎ। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে প্রবালদ্বীপের বুকে। খাদ্য ভান্ডারে এবেলাতেও নাস্তার ব্যবস্থা আছে। গেলাম। একই কাণ্ড। জিলাপি, বেগুনি শেষ। আছে পেয়াজু আর চা। উপায় কি; তাই গলাধঃকরণ করলাম।
আমার ডাক পড়লো মঞ্চে। ডিলার ও তাদের পরিবারকে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে আনন্দ আয়োজন। মিউজিক চেয়ার। তিন পর্বে তিনজন চ্যাম্পিয়ন হলেন। মঞ্চে দায়িত্বে ছিলাম আমরা তিনজন। শ্রদ্ধেয় ডিজিএম (বিক্রয় ও বিপণন), লেখক ও প্রাবন্ধিক মুহাম্মদ আবদুর রহিম, সহকর্মী রমজান আলী ও আমি। মজা করে একটা ছড়া লিখে ফেললাম ওখানেই। সেটা পড়লাম, খালি গলায় গানও গাইলাম। এছাড়াও গান করেন সৈয়দ রাসেদ হায়াত ও ওসমান চৌধুরী।
এরপর শুরু হলো আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণ পর্ব। আলোচনায় অংশ নেন কোম্পানির মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিশিষ্ট শিল্পপতি জনাব আব্দুল খালেক পারভেজ মহোদয়, মাননীয় পরিচালক খালেদা বেগম, নির্বাহী পরিচালক জনাব খন্দকার জসিম উদ্দিন মহোদয়, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএমসির পরিচালক জনাব আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আব্দুল্লাহ আল জুনায়েদ, জিএম (প্ল্যান্ট) জনাব গোলাম মোস্তফা মহোদয়, জিএম (অর্থ ও হিশাব) জনাব এবিএম কামাল উদ্দিন মহোদয় প্রমুখ। কোম্পানির সব আয়োজনে সবসময় সশরীরে উপস্থিত থাকেন আমাদের সম্মানিত পরিচালক লায়ন আলহাজ্ব মো. হাকিম আলী স্যার। অসুস্থ থাকায় স্যার এবার আসতে পারেননি। আমরা সকলে স্যারের অভাব ভীষণভাবে অনুভব করেছি।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই মিলে রাতের খাবার খেলাম। বনভোজন যাকে বলে তার পূর্ণ স্বাদ পেয়েছি এবার। লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিয়ে সমুদ্রতীরে যে যেখানে পেরেছি গোল হয়ে বসে খেয়ে নেওয়া। কি অপূর্ব দৃশ্য। বাড়াবাড়ি রকমের আলোর ঝলকানি নেই। গগণচুম্বী দালান নেই। প্রকৃতির প্রকৃত আবহ বিরাজিত সবখানে। চারদিকে সৈকত, মাঝখানে সবুজে ঘেরা আশ্চর্য দ্বীপ।
রাত একটা পর্যন্ত সৈকতে ঘুরাঘুরি, আকাশের তারকারাজি দর্শন, গলা ফাটিয়ে কোরাসে গান, সমুদ্রের হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে রুমে গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা। আমরা একই রিসোর্টের দুই রুমে চারজন ছিলাম। জাহিদ ভাই, সানী ভাই ও আমি এক রুমে। পাশের রুমে হায়াত ভাই একা। সুখনিদ্রা হলো না। বিদ্যুৎ ছিলো না। তার উপরে মশার ভয়ানক উপদ্রব। হায়াত ভাইয়ের সাথে রিসোর্টের বাইরে সুন্দর বসার জায়গায় আরাম করে বসে আড্ডা দিলাম দীর্ঘরাত অবদি।
ভোরের দিকে ঘুম হয়েছে খানিক। উঠে খাদ্য ভান্ডারে হাজির হলাম। খিচুড়ি আর চা খেলাম। এরপর গেলাম প্রখ্যাত লেখক, ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ এর সেন্টমার্টিনস্থ বাড়ি ‘সমুদ্র বিলাশে’। সকালের নরম রোদ গায়ে মেখে শীতল, মনোরম আর অনন্য সুন্দর সৈকত উপভোগ করতে করতে আর পছন্দের পোজ দিয়ে ছবি তুলতে তুলতে অগ্রজ কথাশিল্পী হুমায়ূনের রেখে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন দেখি, সমুদ্র বিলাশের সমুখে ছবি তুলি।
রুমে এসে ব্যাগ নিয়ে বের হলাম জাহাজের উদ্দেশ্যে, জেটির দিকে। বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেছে। প্রতিমধ্যে কাঁচা আম কিনলাম অল্প। পুরো দ্বীপের সব আমগাছে আম পাকি পাকি করছে। মৌসুমের এত আগে এখানে আম বড় হওয়ার কারণ বুঝলাম না।
দ্বীপের আরেকটা ব্যাপার আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিলো। কুকুর। এত কুকুর এখানে! সংখ্যায় মানুষের চেয়ে কুকুরের আধিক্য। এদেরকে নাকি একপ্রকার পোষা হচ্ছে। দ্বীপের ময়লা ভক্ষণের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে নাকি এদের। ভালো কথা, তবে কুকুরের উচ্চস্বরের ঘেউ, কামড়াকামড়ি দেখে ভয় লাগে। পর্যটকদের উপর আক্রমণের কোন ঘটনা চোখে পড়েনি যদিও।
যথারীতি আমরা ভাগ হয়ে এম.ভি মতিনে চড়ে বে ওয়ান ক্রুজে উঠলাম। যথাসময়ে এ জাহাজ ছেড়ে দিলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। দিনের সমুদ্রের ভিন্নরূপ দেখলাম। চারদিকে অথৈ নীল পানি। শুধু পানি আর পানি। মঞ্চে যথারীতি গান শুরু হলো। কেউ গান শুনে, কেউ খায়, কেউ ঘুমায়, কেউ তাস খেলে, কেউ ঘুরে বেড়ায়, কেউ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গায়ে হাওয়া লাগায়, কেউ ছবি তুলে। বিচিত্র আনন্দযজ্ঞের এ এক মহাসমারোহ।
সমুদ্রের মাথা গরম নাকি আজ। জাহাজ রোলিং করছে খুব। অনেকে বমি করছে। মাথা ধরেছে কারও কারও। দুপুরে জাহাজেই খেলাম। খেয়ে কেবিনে গিয়ে দিলাম আরামের ঘুম। বিকেলে ঘুম ভাঙে। জাহাজ কর্তৃপক্ষ নাস্তা দিলো। তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। সূর্য ডুবুডুবু। ছাদে গেলাম। সমুদ্রের মাঝখানে বসে সমুদ্রের বুকে সূর্য ডুবে যাওয়ার দৃশ্য অবলোকনের ঘটনা আমাদের জন্য ছিলো বিরল অভিজ্ঞতার উপলক্ষ্য।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। বে ওয়ান ক্রুজ এসে থেমে গেল পতেঙ্গাস্থ ১৫ নম্বর বিমানবন্দর ঘাটে। জেটিতে নোঙর করতে করতে বেজে যায় সাতটা। সারিবদ্ধ হয়ে আমরা একে একে নেমে গেলাম জেটিতে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান মনে পড়ে- আমার যাবার সময় হলো/ দাও বিদায়…
এজিএম কর্পোরেট শ্রী দীপ্তিমান দাশ স্যারের কারে চড়ে বাসায় পৌঁছাই, ঘড়িতে তখন রাত নয়টা।
আহমেদ মনসুর: কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক।