ফার্ক-ইপি, আলফানসো ক্যানো ও একটি দীর্ঘশ্বাস

পাহাড়ী ভট্টাচার্য

“আমি চাইলেই তোমাকে কিনে দিতে পারি
একসেট সোনার গহনা,
নিদেনপক্ষে নাকের নোলক একখানা;
তুমি নীল মখমল শাড়ি পড়ে
সারা ঘরময় হেঁটে বেড়াবে রাজহাঁস
কিন্তু,
তার আগে চাই সমাজতন্ত্র!”
– নির্মলেন্দু গুণ।

হয়তো এমনই পণ ছিল প্রিয়তমার কাছে তাঁর, তাঁদের কারো কারো। গণমানুষের ভাগ্য ও সেই সাথে একটি দেশের খোল-নলচে ও ভবিতব্য আমূল বদলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি ও তাঁর সতীর্থগণ। গত ক’দিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছিল তাঁর কথা, তাঁদের অনেকেরই কথা।

স্বভাবতই, আমার আগ্রহের অন্যতম ক্ষেত্র বাংলাদেশ ও বিশ্বের বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনীতি। সময় পেলেই এবিষয়ের কনটেন্ট, যে কোন রিডিং ম্যাটেরিয়াল আমি গোগ্রাসে গিলি! আমাদের স্বদেশ ও বিপ্লবী ধারার রাজনীতির খোঁজ-খবর করতে গিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার বাম ধারার আন্দোলনের সর্বশেষ গতি-প্রকৃতি, হাল-হকিকৎ তত্ব-তালাশের সুবাদে দৈবাৎ তাঁর ও তাঁদের প্রসঙ্গ।

“The woods are lovely, dark & deep
But I have promise to keep
And miles to go before I Sleep
And miles to go before I Sleep.”
-Robert Frost.

তিনি, ছবির সাদাকালো মানুষটি, গুইলেরমো লিঁও সানচেজ ভারগাস। রেভল্যুশনারী আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া বা ফার্ক-ইপি-র সবচেয়ে মেধাবী, যোগ্য, কৌশলী, আদর্শবান গেরিলা নেতাদের একজন। তাঁর সংক্ষিপ্ত, গোপন পার্টি-নাম ছিল আলফানসো ক্যানো। দীর্ঘ চার দশক কলম্বিয়ার শাসকগোষ্টীর, সেনাবাহিনীর এবং সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন প্রশাসনের ঘুম কেড়ে নেয়া ক্যানো ছিলেন তার শত্রুদের কাছে “মোস্ট ইলিউসিভ এন্ড ওয়ান্টেড”!

বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, গায়িকা শাকিরা কিংবা ফুটবলার ভালদেরামো-র সুবাদে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরের দেশ কলম্বিয়া আমাদের কাছে সুপরিচিত। আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় ৮ গুন বড় দেশ কলম্বিয়া। আজ অন্য এক কলম্বিয়া-র কথা।

বিপুল সবুজাভ পাহাড়-সারি, আন্দিজ পর্বতমালা আর আমাজন-বেস্টিত কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটা-য় এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে আলফানসো ক্যানোর জন্ম, ১৯৪৮ সালের ২২ জুলাই। শৈশব থেকেই শান্ত, ধীর-স্হির, মেধাবী ক্যানো ছিলেন মূলত নিভৃতচারী এক নি:সঙ্গ বালক। পড়াশুনায় মনোযোগী ক্যানো আইন ও নৃবিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্য ১৯৬৮-তে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব কলম্বিয়ায় ভর্তি হন। এখানেই, পরে তিনি অধ্যাপনায়ও যুক্ত হন।

এসময়, মধ্য ‘৬০-এর দশকে, কম্যুনিস্ট আন্দোলন বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী ভূমিকায় আবির্ভূত হতে থাকে। চীনে, রাশিয়ায়, কিউবায়, ভেনিজুয়েলায়, ভারতের নকশালবাড়িতে, পুর্ব ইউরোপের দেশে দেশে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও মাওবাদ গণমানুষের ভাগ্য বদল কিংবা উপনিবেশবাদ-শোষন-আধিপত্য-পরাধীনতা তথা শৃঙ্খলমুক্তির অনিবার্য ও অনুসরণযোগ্য পথ ও পাথেয় হিসাবে হাজার হাজার তরুন-যুবদের আকৃষ্ট করতে থাকে। এহেন পটভূমিতে ও তার ধারাবাহিকতায়, আলফানসো ক্যানো প্রথমে কলম্বিয়ান কম্যুনিষ্ট ইয়থ, পরে কম্যুনিষ্ট পার্টি অব কলম্বিয়া-পিসিসি এবং পরিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবোধ অধ্যাপনা ও নিশ্চিত মধ্যবিত্তের সু-রক্ষিত জীবন ছেড়ে বিপ্লবী দল ফার্ক-এর কষ্টসহিষ্নুতার-আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন, ঝুঁকিপূর্ণ গোপন বিপ্লবী রাজনীতি ও বিপদ সঙ্কুল সশস্র সংগ্রাম-এর পথ বেছে নেন।

ফার্ক-ইপি, কলম্বিয়ার ৫০ বছরের পুরনো একটি বিপ্লবী বামপন্হী দল। মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ধারায়, সাইমন বলিভার, মাও জে দং, চে গোভারা ও ক্যাস্ট্রোর অনুসরনে বিপ্লব সংগঠিত করে, সশস্র কৃষক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অঙ্গীকার করে জন্ম নেয়া দলটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন ম্যানুয়েল মারুলান্ডা ও জ্যাকোবো এরিনাস। দলটির, একসময় ১৮,০০০ নারী-পুরুষ সদস্যের এক বিরাট বাহিনি গড়ে উঠেছিল। কলম্বিয়ার প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষ, পশ্চাদপদ জনগোষ্টী যারা দু:শাসন, বৈষম্য, অগনতান্ত্রিক মার্কিন মদদপুষ্ট স্বৈরতন্ত্রের বিরূদ্ধে, তারা ফার্কের নেতৃত্বে ও বিপ্লবে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখত।

রাউল রেয়িস, পাবলো কাটাটুম্বো, ইভান রিয়োস প্রমুখেরা ফার্কের বিভিন্ন সময়ের উল্লেখযোগ্য নেতা ও গেরিলা প্রধানের দায়িত্বে থাকলেও মূলত আলফানসো ক্যানোকেই সংগঠনটি বিস্তারে সিদ্ধহস্ত নেতা, নিখুঁত কৌশলী পরিকল্পক ও সর্বাধিক সফল একজন গেরিলা যোদ্ধা এবং কমান্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্যানো ফার্ক গেরিলাদলের তাত্বিক নেতা, শিক্ষক, যোদ্ধা ও মুখপাত্র ছিলেন। কলম্বিয়ার গহীন জঙ্গলে ফার্কবাহিনীর সদস্যদের সশস্র-প্রশিক্ষণ, রাজনৈতিক স্টাডি সার্কেল পরিচালনা, কলম্বিয়ান সেনা ও প্যারা-মিলিটারীর বিরুদ্ধে অপারেশন, কাউন্টার-ইন্টিলিজেন্স,দেশব্যাপী ফার্ক-বেজ ক্যাম্পগুলো কো-অর্ডিনেট করা, পলাতক জীবন অক্ষুন্ন রেখে ৪ দশককাল বিপ্লবী তৎপরতায় নেতৃত্বদান এবং তাঁর প্রতি অনুসারীদের প্রবল ভালবাসা, আনুগত্য ও সৃষ্ট নিজস্ব গ্রহনযোগ্যতা তাঁকে প্রবাদতুল্য করেছে। আরবান ও কান্ট্রিসাইড গেরিলা ওয়্যরফেয়ারে সিদ্ধহস্ত ক্যানো তৃণমুল থেকে শুরু করে ওপরের স্তরে ফার্ক-ট্রুপস গঠন, কলম্বিয়ার নাগরিক সমাজের মধ্যে ভিত্তি তৈরীতে ছিলেন সফল এক বিপ্লবী। প্রতিবেশী ভেনিজুয়লা, পেরু, বলিভিয়া, কিউবা, এমনকি ব্রাজিল জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনের একটি “রেড করিডোর” গঠনেও তিনি সচেষ্ট ছিলেন।

স্মর্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৮১-১৯৮৩ পর্যন্ত একবার গ্রেফতার হয়ে বোগোটার লা মাচেলো পেনিটেনারীতে কারাবন্ধি অবস্হায় জেলে তিনি গড়ে তোলেন বড় একটি পাঠাগার। মুক্তি পেয়েই পুণর্বার ফিরে যান আন্ডারগ্রাুউন্ডে, ফার্ক সংগঠনের কাজে । সেই থেকে ৪০ বছর প্রায় গ্রেফতার এড়ানো তুখোড় গেরিলা কমান্ডার ক্যানোকে ধরার জন্য মার্কিন-কলাম্বিয়ান যৌথ অসংখ্য হাই প্রোফাইল সেনা কম্বিং অপারেশন পরিচালিত হয়। ২০০৮ সালে সহযোদ্ধা রাউল রেইস এবং ইভান রিয়োসের মৃত্যুর পর ক্যানো অনেকটা একা হয়ে পড়েন। এ সময় সরকারের শান্তি আলোচনায়, ফার্কেের হয়ে মধ্যস্হতা করতে পার্শ্ববর্ত্তী কিউবায় একাধিক মতবিনিময় সভা আয়োজনের নেপথ্যে ভুমিকাও ছিল ক্যানোর।

২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যনুয়েল সান্টোস-এর নেতৃত্বাধীন কলম্বিয়ান সরকার মার্কিন সহযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদী “অপারেশন অডিসিস” পরিচালনা করে। উন্নত প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ট্রেসিং, যুগপৎ স্হল ও আকাশপথে বোমারু বিমান ও সেনা হেলিকপ্টার সমেত এ অপারেশনে ক্যানো ও ফার্ক গেরিলাদের ওপর ভয়াবহ হামলা পরিচালিত হয়। আহত ক্যানো টলিমা বেজ থেকে পালিয়ে কাউকা’য় আস্রয় নেন। চিরুনী তল্লাশীতে একটি ক্যাম্প থেকে উদ্ধার হয় ক্যানোর ট্রেডমার্ক-মোটা ফ্রেমের চশমা। তারই সূত্র ধরে চিন্হিত করা হয় তাঁর অবস্হান। গ্রেফতার হন ক্যানোকে সর্বক্ষণ পাহারা দেয়া ১০ জন ফার্ক যোদ্ধার একজন, ইফরেইন গুজম্যান। তার সুত্রে, পরিশেষে, রাষ্ট্রীয় সৈন্যবাহিনী ক্রমাগত বোমাবর্ষনে ৪ নভেম্বর ২০১১-তে হত্যা করে এ কিংবদন্তি বিপ্লবীকে।

২০১৬ তে ফার্ক, সরকারের সাথে শান্তিচুক্তিতে উপনীত হয়। কলম্বিয়ার মূল ধারার রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের কথা দলটির। ক্যানোর মৃত্যু ও সম্পাদিত শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে কলম্বিয়ার রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ রক্তপাত ও বিপ্লবী বামধারার আপাত অবসান হলেও মুক্তি নিশ্চিত হয়নি এককালের এ স্প্যানিশ-উপনিবেশিক রাষ্ট্রটির ব্যাপক জনগনের।

ব্যক্তিগতভাবে, আলফানসো ক্যানোের মৃত্যু আমাকে পীড়িত করে। আমি একান্ত আত্মমগ্নতায়, কখনোবা অলক্ষ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলি অব্যক্ত অনুভবে, বেদনায়। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাসের একটি দৃশ্যের মতন জাদুবাস্তবতাময় একটি সবুজাভ পাহাড় ও গভীর বনের পটভুমিতে একদল হিংস্র হায়েনার আক্রমন, বারুদের গন্ধ, ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখা, হেলিকপ্টার থেকে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ এর সামনে জীবন-স্বদেশ ও সভ্যতা বাঁচাতে প্রত্যয়ী, দ্রুতগামী এক আশ্রয়-সন্ধানী মহামানবকে আমি প্রত্যক্ষ করি, দেখি তার করূণ পরিসমাপ্তিও-যে মৃত্যুর মৃত্যু নেই!

পাহাড়ী ভট্টাচার্য: কবি ও প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন