রেফায়েত কবির শাওন
হলফ করে বলতে পারি এখন হলিউড থেকে বলিউডের জনপ্রিয়তা বেশি। নাহলে মাদাম তুসোর মোমের জগতে শাহরুখ খানের পাশে এত ভীড় থাকত না। এমনকি জেমস বন্ড খ্যাত ডেনিয়েল ক্রেগ নিয়ে ক্রেজ এতটা না যতটা বলিউডের নায়ক নায়িকাদের নিয়ে। অন্যদের দোষ দিয়ে আর লাভ কি ঐশ্বরিয়া ক্যাটরিনারকে দেখে জীবনের সায়াহ্ন পর্বে থাকা আমাদেরও যে কিঞ্চিত চিত্ত চাঞ্চল্য হয়নি তা বললে সত্যের যথেষ্ঠ অপলাপ হবে বই কি। তবে কাছে গিয়ে আর তাদের সথে ছবি তুলতে মন চাইল না। ফরাসি রমনি মাদাম তুসোর শিষ্যদের শিল্পিত হাত মূর্তিগুলোকে অসম্ভব বাস্তব করে তুলেছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। এতটুকু ছোঁয়ায় বুঝলাম, এই ঠান্ডা দেহে প্রাণের অস্তিত্ব নেই। আত্মাবিহীন দেহগুলোতে শারিরিক সৌন্দর্য়ের কিছুটা পাওয়া যায়, কিন্তু তাদের শিল্প সম্ভার শুধু কর্মেই পাওয়া সম্ভব।
ফ্রান্স থেকে লন্ডন প্রদর্শনী করতে এসে নেপোলিয়নের সময়ের যুদ্ধের কারণে আটকে যান এই মেরি তুসো, পরে এখানেই থিতু হন। তাঁর মৃত্যূর পর পরিবারের সদস্যরা কিছুদিন চালিয়েছেন মোমের মুর্তির প্রদর্শনী। পরে পারিবারিক কলহে বিক্রি করে দেন ব্যবসা। তারপর অনেক হাতবদল হয়, যুদ্ধেও ক্ষতিগ্রস্থ হয় অনেক মোমের মূর্তি। এ মূহুর্তে তুসো মিউজিয়ামের মালিকানা একটি বেসরকারি কোম্পানীর হাতে, যার আবার কিছুটা মালিকানা দুবাইর এক কম্পানীর। মাদাম তুসোর মৃত্যূর শতবর্ষ পরেও মানুষ এখনও বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে তাঁর সৃষ্টি কর্মের আইডিয়া দেখে। কালে কালে তুসো মিউজিয়াম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। তবে লন্ডনেরটি আকারে আর সৃষ্টি সম্ভারে এখনও শ্রেষ্ঠ।
ঢোকার পথটি সাদামাটা। কিছুটা বিবর্ণ লাল দেয়ালের দালানে ঢুকতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন করিডোর। তারপর উঁচু ধাপের সিড়ি। প্রথমেই অভিবাদন জানাবে মাদাম তুসোর নিজের অবয়বে তৈরি মোমের্ মূর্তি। শুনেছি তিনি নিজেই নিজের মূর্তি গড়েছেন। তবে আস্তে আস্তে সিড়ি বেয়ে উঠতেই অবাক হতে হবে, শুধু মোমের তেরি শিল্পকর্মের জন্য নয়, এই বিল্ডিঙের বিস্ময়কর আর্কিটেকচারের জন্য। তির চিহ্ন অনূসরণ করে কখনো সিঁড়ি ভেঙে উঠছেন তো, কখনো নামছেন। কখনো হুট করেই পৌঁছে যাচ্ছেন বিশাল খোলা হলরুমে, বর্ণিল আলোতে দেখছেন রাজনীতি আর চলচিত্রের রঙমঞ্চের নায়ক নায়িকাদের ঘিরে থাকা ভক্তকূল। তারপরেই ছোট গলিপথ পেরিয়ে পৌছুচ্ছেন কোন অন্ধকার প্রোকোষ্ঠে, যেখানে শিল্পকর্মে প্রতিফলিত কোন দূ:খ গাঁথা।
বিস্ময়ের ধাক্কা খেলাম যখন লন্ডনের আ্ইকনিক কাল টেক্সির আদলে তৈরি Spirit of London’ ট্রেনে চড়ে বসলাম। অদ্ভূত এই ট্রেন যাত্রায় ট্রেনটি কখনো সরল রেখায় চলে, কখনো সবেগে উপরে উঠে আবার কখনো হয় এর দ্রুত পতন। চলন্ত ট্রেনের এই উথ্থান পতনের মধ্যেই আপনি দেখবেন বৃটেনের ইতিহাসের ঐশ্বর্য়্য আর দারিদ্রের উথ্থান পতন – মোমের শিল্পকর্ম, বিস্ময়কর আলো আর শব্দবিন্যাসে এখান থেকে জানা যায় সেসব ঐতিহাসিক কাহিনী, সেইসব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, যা লন্ডনকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নগরে পরিণত করেছে। ভাল লাগল দেখে যে মাদাম তুসো বৃটেনের বিশ্বজয়ের কাহিনীর পাশাপাশি, টিউডর ইংলেন্ডের প্লেগ আর মহামারির চিত্রও তুলে ধরেছেন এখানে। আমরা যারা অতীত বলতে শুধু গর্ব আর অহংকারের কাহিনী বুঝি তাদের জন্য ব্যাপারটা অভিনবই বটে।
তুসো মিউজিয়ামের আরেক আকর্ষন শার্লক হোম এক্সপিরিয়েন্স। মিউজিয়ামের ভেতরেই একটি পুরোন মত দরজা খুলে ঢুকে পড়ুন এই বিশেষ কক্ষে – বেকার স্ট্রিটের সেই বাড়ি যেন, যেখানে গোয়েন্দাকাহীনির গুরু বসে আছেন, সাথে তার শিষ্য ডাক্তার ওয়াটসন। তাদের সাথে শুরু হোক রহস্য সমাধান। সত্যি বলতে কি, মাদাম তুসো মিউজিয়ামে সেলিব্রিটিদের ননীর পুতুল দেখার চেয়ে, শার্লক হোম এক্সপিরিয়েন্স আর স্পিরিট অব লন্ডন ট্যুর আমার কাছে ভাল লেগেছে।
লন্ডনবাসি অক্সফোর্ড সার্কাস এলাকাটাকে বলে শপিং ডিস্ট্রিক্ট। বিশাল এলাকা – এমন নয় যে এখানে প্রচুর মার্কেট আছে – আসলে এখানে একেকটি ব্র্যাটন্ড শপই একেকটি মার্কেটের সমান। দলের সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। আমি আর এ যাত্রায় আমার কলিগ লিয়াকত আলি ভাই উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম – মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে জাতী ধর্ম ভাষা বর্ণ কোন সমস্যাই নয়। কোন দোকানে হয়ত জোব্বা পরা আরব কিনছে তো আফ্রিকার কোন কৃষ্ঞাঙ্গ বিক্রী করছে। কোথাও ক্যাশ কাউন্টারে বসে আছে কোন এশিয়ান আর সাদা ইউরোপিয়ানরা কাজ করছে সেলস ম্যান হিসেবে। মানব বৈচি্ত্রে্র এই অসাধারণ সহাবস্থান আমাদের মুগ্ধ করল।
তবে, এই সহাবস্থানের কারণ শুধু লন্ডনবাসীর উদারতা নয়, ব্যবসায়িক বুদ্ধিও বটে। ইংরেজি ভাষা যেমন পৃথিবীর সব ভাষা সংস্কৃতির শব্দ গ্রহণ করে প্রতিনিয়ত নিজকে সমৃদ্ধ করছে তেমনি লন্ডন শহরও টুরিস্টদের আকর্ষন করেই সমৃদ্ধ করছে এর অর্থনীতি। গত বিশ বছরে শুধু একবার থাই্ল্যান্ডের ব্যাংকক লন্ডনকে ছাড়াতে পেরেছে টুরিস্ট আকর্ষণে। এর কারণ শুধু ইতিহাস খ্যাত পুরোন দালানগুলো নয়, এরা লন্ডনকে করেছে পৃথিবীর সব জায়গার সেরা জিনিষের পণ্যাগার। কোয়ালিটি কন্ট্রোল এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত, পৃথিবীর সব প্রান্তের মানূষ লন্ডন থেকে শপিং করতে নিরাপদ বোধ করে।
লর্ডস এ ম্যাচ দেখতে না পারার দূ:খ এ জীবনে ভুলব না, যাও দূধের সাধ ঘোলে মেটাতে ওভালে গেলাম তাতেও বাধ সাধল বৃষ্টি। মাসাধিককাল ধরে অস্বাভাবিক গরমে ধুঁকছে লন্ডন, যে বৃষ্টি লন্ডনবাসির অসম্ভব অপছন্দ, তার অপেক্ষায় ত্রাহি অবস্থা এখন। এতদিন তাদের দোয়া কবুল হয় না, বিধাতা ওদের প্রার্থনার জবাব দিয়ে, বারি বর্ষণের জন্য আমাদের ওভালে ক্রিকেট দেখার দিনটিই বেছে নিলেন। ওভাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কাছে বাস থেকে নামতেই এক বৃদ্ধা হাতে ধরিয়ে দিলেন সারে ক্রিকেট একাডেমির রোমশ টুপি। ম্যাচ আরম্ভ হতে এখনও কিছু সময় বাকি। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্টেডিয়ামগুলো শুধু খেলার জন্যই বিখ্যাত নয় এদের নির্মাণশৈলিও পর্য়টক আকর্ষণের অন্যতম কারণ। ওভাল স্টেডিয়ামটিও তাই, লর্ডসের মত বিশাল আর ব্যাপক না হলেও এর শিল্পিত ডিজাইন আকর্ষনীয়। স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরে ডিনার সারলাম। এডুকেশন এক্সেলেন্সের সামিরা আপা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে থেকে নিয়ে এসেছেন ভিন্ন স্বাদের খাবার।
উদোর পূর্তির পর, ঢুকে পরলাম ডিম্বাকৃতির মাঠের গ্যালারিতে। বৃষ্টিও থেমেছে কিছুক্ষণ। খেলা শুরু হল। হৈ হৈ রৈ রৈ করে দেখছি চার ছক্কার উৎসব – মাঠের খেলা, গ্যালারীর উল্লাস, চিয়ার লিডারদের নৃত্য। আস্তে আস্তে কিসের গন্ধে যেন বাতাস ভারি হয়ে উঠল। সভ্য ভদ্র ইংরেজদের হাতে উঠে এসেছে বর্ণীল সূরাপাত্র। রাত যত গভীর হচ্ছে, দ্রাক্ষারসের ক্রিয়া বেড়ে চলল। এতক্ষন চলছিল চার ছক্কা উইকেটে চিৎকার, আর এখন অনেকে রসময় চোখে টি ব্রেকেও ছক্কা দেখছে। স্যুট টাই পরা সাহেব সুবোদের বেতাল নৃত্যগিতে গ্যালারি পূর্ণ। মাঠের খেলা দেখব না গ্যালারির সার্কাস দেখব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সমস্যার সমধান দিল বৃষ্টি। যেতে যেতে বার্ণার্ড শ’র কথা মনে পড়ল “Alcohol is the Anesthesia by which we endure the operation of life”
রেফায়ত কবির শাওন:প্রভাষক,ইংরেজি,সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজ। চট্টগ্রাম।