সূচি
পদাবলী
নদীর জাতক- খৈয়াম কাদের
ইনসমনিয়া-র রাত- পাহাড়ী ভট্টাচার্য
পানি- মুহাম্মদ জামালুদ্দীন
রক্তমাংসহীন কঠিন বৃষ্টি- শাকিল রিয়াজ
বরষার গান- মাঈন উদ্দিন জাহেদ
বর্ষা- রুহুল কাদের
অভিশাপ – চৌধুরী শাহজাহান
বর্ষায় শ্যামাঙ্গিনী- তৌফিক জহুর
সাদা চেরিফুল- আবু জাফর সিকদার
জানালায় বৃষ্টির ছোট বোন- নাসির উদ্দিন আহমদ
লা-মিজারেবল- মাশরুরা লাকী
অপরাধী মেঘ- আহমেদ মনসুর
বিষ্টি বিলাপ- মোসলেহ্ মহসিন
আষাঢ়ে গল্প
কোন এক শ্রাবণে- নন্দিতা চক্রবর্তী
বাউন্ডুলে বীর- পান্থজন জাহাঙ্গীর
লজ্জাবতীর সমুদ্রস্নান- আবদুল কাইয়ুম মাসুদ
বর্ষা ভাবনা
জলপদ্যের শব্দমালা- তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলার বর্ষা ও কিছু শৈশব- শামসুদ্দীন শিশির
বৃষ্টি দেশে বিদেশে- নাজমুন নাহার
এক গুমোট প্রহর- সুলতানা কাজী
পদাবলী
নদীর জাতক- খৈয়াম কাদের
আমি এক নদীর জাতক–
জানি জলের শরীরে কতো
রূপের ঝলক আর
স্রোতের ছন্দে কতো
নন্দন থাকে।
বর্ষাবাহিত বন্যার থৈ থৈ ঢেউ
সুরের শরদে ভণে
নদীবাসী জীবনের গান
নবীন পলিতে সাজে
স্নানসিক্ত মাটি।
কিন্তু এর পাশে থাকে
আরেক স্বরূপ বিরূপ কান্তির
মায়া;বানের পানিতে ডোবে
ফসলের ক্ষেত ভাঙ্গনে হারিয়ে যায়
বসত-বেসাতী এবং
জিরাতের ঠাঁই।
গেরস্ত উদ্বাস্তু হয়
লুণ্ঠিত হয়ে যায়
ফলদ সংসার
যেনো পরাশক্তির
চাপানো যুদ্ধের
সে এক সর্ববিনাশী ক্ষয়।
তবুও বর্ষা চাই বর্ষা আসে
প্রলয়-প্লাবন ঘেষে
হৃদয়ের ঘাটে ভাসে
মনবিলাসের নাও।
ইনসমনিয়া-র রাত- পাহাড়ী ভট্টাচার্য
শ্রাবনের জলে ভেজা মধ্য-দুপুরে থমকে থাকে না সময়
দাঁড়কাকের মতন। জলমগ্ন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসে দ্রূততায়, পলেস্তরা-খসা বাড়ির দেয়ালে, আঙিনায় হিম
রাত নামে মেঘময়। আকাশের ক্রন্দনে, অযুত অশ্রুপাতে জলাদ্র হতে থাকে প্রকৃতি, পতঙ্গ ও মানুষ, বেখেয়ালে।
প্রমত্ত বর্ষা-দিনে, গাছেদের ছায়ারা ক্রমশ দূরে সরে যায়
পরিযায়ী মেঘে ঢাকে নতজানু চাঁদ, নক্ষত্রেরা জ্যোৎস্না ও জোনাকির সাথে লুকায়, বনবিথী পাতে ফাঁদ,প্রগাঢ় নির্জনতার। বজ্রপাতে ছত্রভঙ্গ নৈশব্দেরা, ঝড়-জলে।
এইসব বর্ষন-মুখর দিন স্মৃতিতে বেঁচে থাকে গভীর ঘুম হয়ে কত, সাথে নিয়ে ইনসমনিয়া-র নির্ঘুম রাত যত!
পানি- মুহাম্মদ জামালুদ্দীন
বাদলা দিনে ভ্যাপসা গরম
একি আজব কৃষ্টি
এই কড়া রােদ, একটুকু মেঘ
একটু পরেই বৃষ্টি।
বৃষ্টি হলে হতেই থাকে
আবার হঠাৎ বন্ধ
মৌসুম এখন বর্ষা কিবা
গ্রীষ্ম শরৎ দ্বন্দ্ব।
আবার দেখি ঝম ঝমাঝম
বৃষ্টি হলেই শুরু
হয়না দেরী বানের তােড়ে
দেশটা ভাসছে পুরাে।
বানের তােড়ে গেরাম ভাসে
শহর এবং বন্দর
চাকার শহর টাকার শহর
ঢাকায় পানির টক্কর।
রক্তমাংসহীন কঠিন বৃষ্টি- শাকিল রিয়াজ
আজও বৃষ্টি। ধ্বনিময় নয়, কঠিন প্রপাত।
স্বপ্নকে পাশে রেখে একলা ঘুমায় ঘুম
ঘুমের উত্তাপে ফেটে যায় কার ডিম?
কার চারাগাছ বেড়ে ওঠে?
বৃষ্টিতে কার ব্যাঙের ছাতার মতো গজায় বুক?
তার ডাকনাম মনে আছে শুধু।
বহুদিন আগে তার নামের গন্ধে স্বপ্ন বিব্রত হতো
তখনও ঘুম একা, আড়মোড়া নেই, হাইগুলো পড়ার টেবিলে
চোখের পাপড়িতে কিছু আঁধার ছড়ানো ছিল
কিছু বৃষ্টিপাত ছিল বর্ষা মৌসুমের অনেক বাইরে
আর আহ্লাদিনী, মনে হতো
এ শরীরে ক্ষীণ মদ হয়ে প্রবাহিত সেই আগ্নেয় বালিকা।
আজও রক্তে তার মাত্রা রয়ে গেছে
তাপমাত্রায় তারই উত্তাপ, জ্বর
তারই দুই মেঘের বৃন্ততে আমার বর্ষাকাল।
ঘুমগুলো অবিন্যস্ত, স্বপ্নছাড়া,কাঁচা
ঘুম ছেনে কী বানাতে পারি? বনিতা?
তুমি তো তেমন নও, তুমি তো অন্ধকার ঠেকিয়ে
স্বপ্ন কেড়ে নেবার প্রিয় সন্ত্রাসী ছিলে
তবে আজ কেন ঘুমের উত্তাপে ফেটে যায় বোধ
আর মাঝরাতে ঘুমভাঙা বিছানায়
কেন মনে হয় নেই, কোনো কিছু নেই
রক্তমাংসহীন এক কঠিন বৃষ্টি ছাড়া?
বরষার গান- মাঈন উদ্দিন জাহেদ
মাতাল বরষণে প্রকৃতি উচ্ছ্বাস;
নাচে পাতা পাখি মন যে উদাস।
সবুজে বান ডাকে, প্রাণে দোলা,
আয় না সাথী ধরি গান বাউলা।
এমনো বরষণে নাচলো সখী
বাউলা প্রাণ যখন আনন্দপাখী;
সুরের ছোঁয়া দিয়ে জাগায় সারা-
আয় সাথী গাই গান- প্রাণ হরা।
মাতালো বরষণে জাগলো ধরা
নাচে মন নাচে প্রাণ-
সে যে কার ইশারা? কার ইশারা?
প্রকৃতি উছল হাওয়া- বয় নিরন্তর
মাতাল করা যেনো হৃদয়-অন্তর ;
বন্ধুরা! গাই চল বরষার গীত-
উছল আবেগ যেন প্রাণসংগীত
উছল জীবনে যেন দোহাঁ-সংগীত।
বর্ষা- রুহুল কাদের
ব্যাঙ ডাকলেই সব বেদনাবিধুর লাগে
বিরহ জাগে না।
মনের ধ্যানী বক কাঁদে…
বিষণ্ন ঠোঁটে তুলে আনে মাটির নীরস কর্দম।
কদম ফুলের ফোলানো কেশরে
ঝুলে থাকা বৃষ্টিবিন্দু
লক্ষ্যহীন ঝরা লাখো লাখো দুঃখীর চোখের অশ্রু;
কলকল খল জল ভাঙে,
কেবল ভাঙে
ভাঙনের শব্দ ব্যাঙের চিৎকারে
অতলে তলিয়ে যায়…
কাদাজলে ব্যাঙ ডাকে কুৎসিত, বেসুরো,
বৃক্ষের কদম এঁকে রাখে
মানুষের বিরহের কারুকাজ।
অভিশাপ- চৌধুরী শাহজাহান
আষাঢ় শ্রাবণে ডোবে যায় নিন্ম ভূমি
মানুষ পশু পাখি যাবতীয় প্রাণী
ডুবছে বাড়ি ঘর শস্য সোনা দানা
প্রকৃতির অদ্ভুত খেলা, শেষে হার মানা।
ঝড় বৃষ্টি বন্যা খরা এই নিয়ে আছি
দেখে দেখে সয়ে গেছে এই সব জানি
স্বাধীন হয়েছে দেশ একাত্তর সালে
এখনো পারেনি বাঙালি সোজা হয়ে লড়তে।
কিছু লোক লেগে আছে রাষ্ট্রের সম্মান
হানি করে নিজ নিজ আখের গুছাতে।
যারা মেরে খায় নিঃস্ব মানুষের হক
সেই সব দেশদ্রোহী বেইমানদের সাজা হোক।
বর্ষায় শ্যামাঙ্গিনী- তৌফিক জহুর
সুরমা রঙের চোখ ডাকে মেঘের আড়ালে
মুষল ধারায় নেমে আসে যুবতী বৃষ্টির কণা
লাজের ওড়না খুলে পাপড়ি পেখম মেলে
প্রেমের সেতারে বাজে আদিম সানাই সুর।
চরের মাটিতে ঝরে পরে গাছের পাতারা
নিবিড় সোহাগে শুধু কথা বলে চোখের কামনা
দেহের আরতি জ্বলে বৃষ্টির শীতার্ত ওমে
হুটোপুটি লুটোপুটি বৃষ্টি ভেজা মন জুড়ে।
চারচোখ কথা বলে ইশারায় খুলে যায়
ঠোঁটের আগায় জমে থাকা লবণের ঘাম ।
সাদা চেরিফুল- আবু জাফর সিকদার
পেঁজা তুলো সাদা মেঘের মতো
তার চেয়েও বরং অধিক দৃষ্টিনন্দন
মায়াময় সৌরভে ঊর্ধ্বমুখী পাপড়ি মেলে
হাসতে থাকো তুমি আপন বৈভবে!
পৃথিবীর তাবৎ পেলবতা
উপচে পড়ে তোমার গতরে।
অবসাদে নুয়ে পড়া যাপনের ক্লান্তি
ধুয়ে মুছে একমুঠো অম্লজান প্রশ্বাসে প্রশান্তি আনে
তোমার বেয়াড়া সৌন্দর্য অবয়বে ঈশ্বর ঢেলে
দিয়েছে মাধুরী মেশানো অনন্য কারুকাজ।
পৃথিবী ঘুমালেও তুমি জেগে থাকো চাঁদোয়া প্রহরে
বর্ষার টুপটুপ বৃষ্টির ছোঁয়ায় শিহরিত হও যেন
আদিম উচ্ছ্বাসে উৎসবমুখর হংসমিথুন। তোমার
অনবদ্য দেহলতায় বার্ধক্যহীন যৌবনের দুলুনি।
জানালায় বৃষ্টির ছোট বোন- নাসির উদ্দিন আহমদ
আকাশের ওলান ভর্তি মেঘ
এই বুঝি
পালান ভরে যাবে দুধে-বৃষ্টিতে
দুধেল গাই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে
দোহন করছে এই ভোরে এক গোয়ালিনী
ফরসা বৃষ্টি ভিজিয়ে দেয় আজ ভোরের ঘর বাড়ি
ধুয়ে যায় প্রদোষ—ধুয়ে যায় ঋতুস্রাব
বেড়ালেরা বিছানায় বৃত্ত ঘুমে
হাঁসেদের পাখনায় মোতিচূর্ণের ঝাঁক ঝাঁক দানা
চালতার ফুল হাসে
গায়ে তার সুন্দরী কলেজের ভেজা শাদা ইউনিফর্ম
নব্বই দশক হাসে মোড়ে মোড়ে
কেউ কবিতা লেখে শুয়ে শুয়ে
কেউ চুপচাপ
বৃষ্টি ভিজিয়ে চলে সকালের ভুল
তবু মেঘের পাখায় চড়ে আজ যেন পর্যটন
আসেন মীকাইল (আ:)—সাথে লটবহর
শ্রাবণে তাঁর কাজ বেড়ে যায়
কোথায় কোন ডালিমের বৃন্তে
কয় ফোঁটা পানি-চুম্বন
কোন বাওড়ে নদী এসে কাটবে সাঁতার
কোন মোহনায় নাচবে ইলিশ পাঙ্গাস
সব তাঁর দপ্তরে আছে লেখা
তবু গ্রন্থিত অগ্রন্থিত শব্দ বর্ষাতি ফেলে
দরোজায় টোকা দেয়
ভেজা স্মৃতি-কোষ করোনা ঝেড়ে
সুর তুলে অচিন অক্ষরে
পাড়ায় পাড়ায় কচ্ছপ মুখোশ খুলে
ডুব দেয় কচুরিপানার তলে
হাঁটু পানির নদী এখন ফসলের সাথে সঙ্গমে বিভোর
কিছু পরে বীর্য-পলল ছেড়ে ক্লান্ত হয়ে
ফিরে যাবে ডেরায়
কাশবনে তারা বাইম ডুবে ডুবে জল খায়
প্রেমের ভেলা ভাসে
পিপিই পরে কাজে ডুব দেয় করোনার ডাক্তার
জানালায় বৃষ্টির ছোট বোন উঁকি ঝুঁকি মারে
আলতো পায়ে পায়ে ঢুকে যায় ঘরে
নূতন অক্ষরে সাজাই বুক
ভেসে আসে কেয়া-কামিনীর ঘ্রাণ
মাচান ভরা সুখ সাঁতরায়
চুম্বনে তারা বাইম চুম্বনে কদম
হরতন রুইতন ভুলে ডুবে যাই মেঘে
মজে যাই আদিম যাত্রায়
তখন বিভোর সুবাস—বাইরে চোখ মেলে
দেখি দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মীকাইল
কোয়ারেন্টাইন খুলে
শেষমেষ এই মওসুমের প্রথম করমর্দন
তাঁর আঙ্গুলের ভাঁজে ভাঁজে ভেজা অক্ষর
ঢোলকলমীর বেগুনী ফুল
সংলাপ ভুলে বৃষ্টির ছোট বোন
ঘোমটা টেনে
বলে ওঠে রিমঝিম ঝিমরিম
মাথা মুন্ডু ভিজে ওঠে
গান ভুলে যাই
তাল লয় কেটে যায়
ডুবু রাস্তায় পাজেরো হাঁকায় খেলাপী ঋণী
জলজ্যান্ত ভেজালের নাচ
চোখে ভাসে ভূঁয়া রিপোর্ট
ড্রেনে ড্রেনে জ্বলে হাহাকার
মনে হয়
শহরের এভিনিউ-এ কখনো গোল্লাছুট
কখনো দাঁড়িয়াবাঁধা কখনো ঢেউ-ঢেউ খেলে
ঢোল সমুদ্র বার বার!
লা-মিজারেবল- মাশরুরা লাকী
বৃষ্টিরা পশরা সাজিয়েছিল নগরের বিক্ষিপ্ত ল্যামপোস্টে,
পথশিশুর যুগলবন্দী প্রেমিক হৃদয় লুকিয়ে ছিল শহুরে কদমফুলে,
আঙ্গুলগুলো ব্যস্ত ভীষণ
ভালোবাসা কিনবো সিগন্যাল মোড়ে
রাজপথ অথবা তোমার রোদে পোড়া দু’চোখ ভুলে।
আমি হব অনার্দ্র মেঘফুল
তুমি হবে লা’মিজারেবল
মোমের আলোয় চিত্ত হবে উদ্ভাসিত।
অথবা সেই প্রেমিকযুগলের দীর্ঘশ্বাস
আগত বরষায় আমরা ভাসবো
ভেজা নগরেই হোক নরকের কারাবাস।
অপরাধী মেঘ- আহমেদ মনসুর
মেঘ ডেকে যায় ব্যঙের স্বরে মেঘের সাথে সন্ধি
দিল কাঁপে হায় কালের জ্বরে মেঘের কাছে বন্দি।
ও কালো মেঘ যারে কেটে নামুক হাতের কড়া
সুদিন হাওয়া লাগলে পালে কাটতে পারি ছড়া।
মেঘের দেশে মনের বাড়ি থির থাকে না মোটে
সত্য বলে নিত্য হারি কালো মেঘের ভোটে।
ও কালো মেঘ যারে কেটে হাসি ফুটুক মুখে
কেমনতর সুখ মিলে কও বাসি ফুলের দুখে!
পুবাকাশে আলোর আভায় উঠবে নেচে মন
কালের দহন ঘুচবে কি আর ভাবী সর্বক্ষণ।
ও কালো মেঘ যারে কেটে মিলাক ধূম্রজাল
আর কতকাল ভার সইবে এ হীন কাঙাল!
বিষ্টি বিলাপ- মোসলেহ্ মহসিন
আকাশ ফুড়ে বিষ্টি এলো
চোখ জুড়ে জল
তোর সাথে মিতালি ছিলো
ভুলছিস সে সকল।
চায়ের কাপে বিষ্টি পড়ে
বিষ্টিতেই চুমুক
আজ বিকালটা দুঃখ ভরা
কাল কি হবে সুখ?
কাল বিকালে বিষ্টি হলে
ভাসাবো সব স্মৃতি
টানছি আমি কড়ি কেটে
তোর সাথে ইতি।
আষাঢ়ে গল্প
কোন এক শ্রাবণে- নন্দিতা চক্রবর্তী
বাংলার বরষা আসে যুবতী কন্যার মত ঢলঢল রূপে। কচি নরম সবুজ রঙের ছটায় ভেসে যায় চারপাশ। আকাশ কখনো মুখটা ভার করে তো কখনো হেসে কুটিকুটি।
এমন একটা সকালে পানের ঝাঁকি নিয়ে বের হল পথে মালতি। পুরো নাম মালতি বালা। পান বিক্রি তার পেশা। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুজ হয়েছে,তবুও খুঁড়িয়ে চলছে জীবনের পথটা। সারা বছর দাঁত কেলিয়ে হেসে, কথার ফুলঝুরি তুলে পান দিয়ে যায় ঘরে ঘরে। কেবল এই আষাঢ় আসি আসি হলেই মিয়িয়ে পড়ে সে। শ্রাবণের সাথে পাল্লা দিয়ে পাল্টায় তার মনের রঙ। স্মৃতির অলিতে-গলিতে ভেসে আসে কখনো হারানোর স্মৃতি, কখনো পাওয়ার আনন্দ।
বর্ষার জলে,হাওয়ায় খূঁজে ফেরে তার হারানো ক্ষণকে।
সারাদিনের রোদেজলে ভেজা ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে যায় নিজের ছোট্ট ঘরের দাওয়াতে, যেখানে বসেই দেখতে পায় যৌবন ভরা সমুদ্রকে। হাত ছড়িয়ে বাতাস জড়িয়ে নেয় অতৃপ্ত বাসনায়। কখনো কখনো আপন মনেই বিড়বিড় করে এই পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মালতি।
সন্ধ্যেটা এখনই দোরগোড়ায় এসে পড়বে,তাই আপন মনেই রোজ এ সময় কুপি হারিকেন গুলো মুছতে থাকে। কুপির আলোর প্রয়োজন এখন ফুরিয়েছে, তবুও মুছে রাখে রোজ,হারিকেন আর কুপিটা। হয়তো এইপুরনো কেরোসিনের গন্ধে,নরম আলোর সলতেতে ছুঁতে চায় তার ২৫ বছর আগের মলিন হওয়া স্মৃতিকে আর একটুকরো দীর্ঘশ্বাস। যা অনেক যত্নে লুকিয়েছে রেখেছে।
বর্ষা এলেই মনের কোণে ভয়টাও চেপে ধরে তাকে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ভাবে “এতো কিছু কেড়ে নিলি তুই তবুও তোরে ছাড়তে পারি না ক্যানে?”
“তোর আর কিছু ন্যাবার নাই রে, আমি আর তোরে ডরাই না।”
এই বলে বিড়বিড় করে উঠোনে নেমে আসে, কয়েক ফোটা বৃষ্টির কণা আর বিদ্যুতের চমকে কোন হেলদোল নেই।
শুধু ভিজে যাওয়া আঁচলটাকে টেনে নিয়ে চোখ টা মুছে, আর শাঁখা বিহীন খালি হাতটার ওপর দু ফোটা চোখের জল পড়ে যা বৃষ্টির জলে একাকার হয়ে যায়।যার আলাদা করে কোন অস্তিত্ব মেলে না।
সন্ধ্যে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই ঘরে উঠে আসে, পাটি পেতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে অঝোর ধারায় ঝরে পড়া বর্ষণে। এমন এক বর্ষায় বউ হয়ে এসেছিল, তারিখটা মনে করতে পারে না,শুধু মনে আছে সেদিনও এমন বর্ষণ ছিল।ঘোরতর বর্ষা। নতুন বউ হয়ে এলো এই সাগর পাড়ের চরে।
ছোট কুঁড়ে ঘরে আলো জ্বলে উঠলো,রূপের ছটায় ঝলমলে করে করে আলো ছড়ালো ভাঙা ঘরটি। মালতি বর শিবু বেশ খুশি, চোখে নতুন স্বপ্ন। নতুন সংসারের সুবাসে চনমনে আলোতে মন ভরে আছে।
কিন্তু সমুদ্রের প্রতি তার রয়েছে অদম্য টান।লহরি তালে দুলে ওঠে তার রক্ত। তাই তাকে এবার ফিরতে হবে সাগরপথে। জোছনা রাতের রূপোলী জলে প্রতি টানে রয়েছে অদম্য বাসনা। এই হাতছানি উপেক্ষা করতে পারে না শিবু। তৈরী হয় সাগরের আহ্বানে। একদিন দুপুরের গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালায় মরিচ আর পেঁয়াজ এর মাখানো ভাতের লোকমাটা মুখে তুলেই মালতির কাছে কথাটা পারলো।
আর কতদিন এমন চলবে?এবার তো সাগরে যেতে হবে।”
মালতি, বুঝলো তার স্বামীর আয়ের উৎস, তাকে আটকানো যাবে না,তবুও বলল, সাগরে যাওয়া,আর মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোন কাজ কি করা যায় না?
কি দরকার এই ভরা উত্তাল সাগরে যাও নের “।
শিবু,কানে তোলে না,তৈরী হয় সে,জাল,ঝুড়ি, কেরোসিন জোগারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।মহাজনও শিবু সারেং আবার নৌকায় ফিরছে,তার স্বস্তি ফিরে এলো।শুধু মালতীই হাহাকারে ভরে গেল।
দিনক্ষণ দেখে তৈরী শিবু সারেং। যাওয়ার আগে শুধু মালতিকে বলল,সারেং এর বউ তুই”, ডর তোরে মানায় না।”
মালতী মনে মনে বলল, সে তো সাগর পাড়ের মেয়ে নয়, সে তো এমন ঢেউয়ের খেলায় চলতে শেখেনও।কি করবে সে এখন!!
যাক্ আরো সাতদিন পর রওয়ানা দিল শিবু।
আর মালতি মনকে বোঝালো, জীবনটা হয়তো এমনই।।
হঠাৎ সে রাতেই চারপাশে শোরগোল, কেউ বলছে জলোচ্ছ্বাস হবে,কেউ বলছে এই চর ডুবে যাবে।
ভেবে কুল পাচ্ছে না মালতী, এই একমাস বিয়ের জীবনে তেমন করে কেউ আপন হয়েও ওঠে নি। কাকে জিজ্ঞেস করবে,শিবুর কথা।
কিভাবে জানবে কেমন আছে শিবু।
এই আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই শুরু হয়ে গেল উত্তাল পাথাল বাতাস, বাতাসের তোড়ে দরজা-জানালা ভেঙে পড়তে চাইছে।ভয়ে চুপসে গিয়েছিল সেদিন। চিৎকার, কান্নার শব্দে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠছে।
হঠাৎ এক ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গেলো সব,কিছু বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে গেল সে।
এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই দম আটকানো সময়।
হঠাৎ তার চোখের সামনে মিলিয়ে গেল সবটুকু। জ্ঞান হারিয়েছিল,তাই আর কিছুই মনে করতে পারে না সে।
দুদিন পর অনেক মৃত মানুষের সাথে সে-ও মৃতের তালিকায় চলে গিয়েছিল। খোঁজ নেয়ার কেউই ছিল না।
পরে জেনেছে কোন এক স্বেচ্ছাসেবক দল তার দেহের তাপমাত্রা দেখে তাকে জীবিত বলে ঘোষণা দেয় এবং শুশ্রূষা করে সুস্থ করে।
ঝড় থেমে যায় একটা সময়।আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফেরে নিজের গ্রামে। ঘরদোর বিলীন,কোন চিহ্ন নেই। গোলপাতার ছাউনির কুঁড়ে ঘর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে, এই সমুদ্র।
কি করবে সে এখন? ত্রাণ কমিটির সহায়তায় তৈরী হয় কোন রকম ছাউনি। আশ্রয় পায় কটা দিন।আর রোজ সাগর পাড়ে খোঁজ নেয় ভেসে আসা মৃত দেহ গুলোর।কোনটা তার শিবু।
আদৌ ফিরবে তো!!
অপেক্ষায় কাটে তার রাত দিন,এভাবে গড়িয়ে যায় তিনটা মাস।হঠাৎ অনুভব করে তার শরীরে বেড়ে উঠছে আর একটি প্রাণ। কি করবে এখন সে।
বাবা,ভাই ফিরিয়ে নিতে আসে,এই সন্তান তার জন্য বোঝা,। বুঝতে থাকে।কিন্তু রাজী হয় না সে তাকে মেরে ফেলতে।
পৃথিবীর আলো দেখবার জন্য যে এতটা কষ্ট সহ্য করেছে তাকে সে মারতে পারবে না।আলোর পথ সে দেখবেই।
সেই থেকে অপেক্ষায় কাটে মালতীর,শিবু ফিরে আসার অপেক্ষা।
আজ ত্রিশ বছর পরও তার অপেক্ষার পালা শেষ হয় না।তাদের সম্তান জন্ম নিল,এখন সে ত্রিশ বছরের যোয়ান। ঘরে লক্ষী মন্ত বৌ, ফুটফুটে নাতনি।
কষ্ট গুলোকে এখন তার কাছে স্বপ্ন মনে হয়। পান বিক্রি করে ছেলে বড় করেছে,পড়াশোনা শিখিয়েছে আঁচল দিয়ে ঢেকে নিজে রূপ লুকিয়েছে লোভাতুর চাহনি থেকে।
শিবুর ছেলে রামু। ভালো নাম রামানুজ দাশ”।
সরকারি অফিসের পিয়ন।
সাগরে বড় ভয় মালতীর। তাই শিবু সারেং এর ছেলে কে আগলে রাখলো সে।আর সমুদ্র নয়।
আর ভয় শ্রাবণকে,তার স্বপ্ন ভাসিয়ে নেয়া শ্রাবণ।
বাউন্ডুলে বীর- পান্থজন জাহাঙ্গীর
আষাঢ়ের মাতাল সন্ধ্যায় সেদিন পরীর পাহাড়ে জনাব আলিকে যম ডেকেছিল। ফলে দানব শিয়াল গুলো সারারাত প্রতিশোধের লেলিহান শিখা জ্বেলে তাকে খুবলায় খুবলায় খেয়েছিল। প্রকৃতি হয়তো এভাবেই শোধ নেয় তবে এটাও ঠিক বীরকে শোধের কবলে পড়তেই হয়। মল্লযুদ্ধে বীর একজনই থাকে। তার মৃত্যু যেভাবেই হোক। জনাব আলি পড়শীদের কাছে বীরের মতোই।
জনাব আলি নামটি এলাকার শিশু-কিশোর আবাল-বৃদ্ধ সবার কাছে একটা প্রিয় নাম। তার নামটি কারো মনে পড়লে সবার আগে চোখে ভেসে উঠে একদল শিশু কিশোর তার পিছু পিছু সারাদিন ঘুরছে আর জনাব আলি সবাগ্রে নায়ক হয়ে বিভিন্ন অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এসব অভিযানে শিশুরা জনাব আলির বাহবা সঙ্গি। নতুবা সাহসের বা উৎসাহ-উদ্দীপনার। কখনো তীব্র হৈচৈ এর। এরা হৈ হৈ না করলে জনাব আলির বীরত্ব আর কে শুনাবে এলাকাবাসীর ঠাহর হবে কেমনে? কোন সময় কোথায় কিভাবে সফল নেতৃত্ব দিয়ে আসল বা সফলতার কাহিনি। তারপর শিশু থেকে বয়স্ক সবাই জানবে। কেউ কেউ মুখস্থ করে বলবে কোনো দোকানের বেঞ্চিতে বসে বা কোনো জটলায় বা কোনো মহিলা কথাকারের মতো ফেরি করে বেড়াবে পাড়ায় পাড়ায় তার ঘনিষ্ঠ সহচরীদের বা নতুব কোন পিয়ারিবন্ধুকে। শুধু একটা বিড়ি, বা একটান হুক্কা বা এক চিলতে পান ভোগের জন্য। কিন্তু নেপথ্যে জনাব আলির বীরত্বের কাহিনি আরো প্রগাঢ়, রূপ-রস-গন্ধে মজে বিশুদ্ধ হয়। সেই বাহবা ও বিশুদ্ধতার তেজ ধরে রাখতে জনাব আরো তেজোদ্দীপ্ত হয়।
কোনো কোনো দিন বেপরোয়া হয়ে অসাধ্য সাধন করে ফেলে গায়ের লোককে তাক লাগিয়ে দেয়। কিন্তু ঘরে এসে দেখে কোনো রান্নাবান্বা হয়নি। কে বা রান্না করবে? কি রান্না হবে? কোথায় থেকে আসবে রান্নার রসদ?- তা তো জনাব আলিরই ব্যবস্থা করার কথা। তারপরও তার কোনো রা নেই। কলাগাছে উঠে কাঁচাকলা পেড়ে নুন আর কাচা মরিচ দিয়ে খেয়ে চম্পট। এই আদিমতম খাবারে বেশ চলে জনাব আলির। কখনো কাউয়াটোনির শাক বা কচি আমপাতা-জামপাতা খেয়ে আসে আর সারাদিন না খেয়ে পড়ে থাকে। এতে সৎমা বড়ই নাখোশ। ঘরের মহিলারা তো এগুলো সইবেনা। কিন্তু জনাব সহে,ফলত: সৎমার অকথ্য গালাগালি হজম করে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের মতো।মাঝে মাঝে এলাকার বাচ্চা কাচ্চারাই জনাব আলিকে নিয়ে যায় কোনো বিপদ বা শ্বাপদের নিশ্বাসে বাস্তু ভিটা আক্রান্ত হলে। শিশু-কিশোরদের সাথে এভাবে এগুলো করে সময় কাটায় বলে মাঝে মাঝে জনাব আলিকে তার সৎমা ডাক দেয়। ছোট ভাইয়ের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বড়বোন আমেনা একদিন খাওয়ার সময় ভাতের থালায় মানব বিষ্টা এনে দেয়। তারপর শাসিয়ে দেয় ভালো করে –‘ নে খা, গু খা, ভাতের বদলে গু খা।ঘরত মইদ্দে তুর মত এত্তর ওগ্গা বলদ থাইলে তরিতরহারি চইল-ডাইলর অভাব অনে? তুই আরাদিন মাইষর পোয়াইণ লই বন জঙ্গলত দৌরর। তুই এহন আঁয়দ্দে ভাত খায়বল্লাই?’’ এই তীব্রতর শ্লেষাত্বক গালিগালাজকে রা না করে জনাব আলি চালিয়ে যায় তার ডানপিটে কান্ড। শিষ্যদের নিয়ে এ কান্ড করতে না পারলে পেটের ভাত হজম হয়না।
সবাই তার পছন্দের সাথি না হলেও শিশু-কিশোদের মধ্যে তার অভিযানের দ্বিতীয় সারির যোদ্ধা হিসেবে অনুকূল, খুশিদ, আনসার, নাজিম, জয়ফুল, শেখড় ও নুনুইয়্যা প্রিয় শিষ্য। তারাও বেশ মজা পায় জনাব আলির সান্বিধ্যে সত্যি মিথ্যা কাহিনি শুনে। তবে এসব আষাঢ়ে গল্প একদিন সে সত্যও করে তুলে। কখনো সিরিয়াস হয়ে আবার কখনো খেলার ছলে আবার কখনো ফরমায়েশী হয়ে।
এই তো সেদিন দিনের বেলায় তমসির পাহাড়ে কয়েকজন মিলে হৈ হৈ করে আচম্বিত চিৎকার করতে করতে এমন সোরগোল তুলল, শেষে হৈ হৈ রবে গর্তের শেয়াল কয়েকটি বের হয়ে প্রাণ নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগলো। সাথে যোগ দিল পাড়ার আরো উৎসাহী যুবক। অবশেষে শেয়াল জোড়া জনাব আলির বাঁশের আঘাতে ধরাশায়ী হলো। দিনদুপুরে এতো বড় পাহাড়ে শেয়াল ধরা কি চাট্টিখানি কথা! গ্রামের মানুষকে এভাবে কারিশমা দিয়ে জনাব আলির বুকটা ফুলে ওঠে। অবশেষ এলাকার কয়েকটি ধাঙর পরিবারে শেয়াল দুটো ঈদের খুশি নিয়ে আসে।
সেদিন অনুকুলদের বেত ঝোপে এক বাস্তুসাপ রোদ পোহাচ্ছিল। কনকনে শীত। অনুকূলদের পুরাো পরিবার উঠানে রোদ মাখছিল। বেত ঝাড়ের আগায় দুধ সাপটি নিশ্চল কুণ্ডলী পাকিয়ে রোটিন মাফিক রোদ টানছিল। হঠাৎ অনুকূলের অনুসন্ধিৎসু চোখ পড়ল সেই দূর্ভাগা সরিসৃপটির উপর। আর যায় কোথায়। ফরমায়েশি ডাক পড়ল জনাব আলির। তারপর লাঠি আর গরম পানির বদৌলতে অনেক উঁচুতে জঙ্গলময় আবাসে থাকা সত্ত্বেও জনাব আলিকে ফাঁকি দিতে পারলনা বেচারা সাপটি। অবশেষে অনুকুলদের নারিকেল গাছের গোড়ায় ভবিষ্যতের জৈব সার হিসেবে সমাধি হলো আট হাত লম্বা দুধরাজের।
অনেকে আবার জনাব আলিকে অবিশ্বাসের দর্পণেও দেখে। কারণ তারা বলতে চায় তার নাকি হাতটানেরও অভ্যেস আছে। সেসবের সংখ্যা একেবারেই কম এবং লিঙ্গভেদে তারা পুরুষ-অকর্মণ্য। করবেই না কেন? জনাব আলি যখন বনে যায় তখন এমন সৌখিন কঞ্চি কেটে নিয়ে আসে যেগুলো সংরক্ষিত বন ছাড়া অন্য কোথাও নেই। আবার বিলে যখন মাছ ধরতে যায় তখন বালতি পুরে শোল টাকি মাগুর মাছ নিয়ে আসে। এগুলো শুধু জনাব আলির নাগালেই থাকে। অন্য কেউ পায়না। নানা রকম বনফল যেমন বর্ষার কাউফল, গ্রীষ্মের বেতফল, শীতের আমলকী, পানিফল, পাইন্ন্যাগুলা সব খোচড় পুরে নিয়ে আসে। আসার সময় বিলিয়ে আসে পাড়ার কিছু প্রিয়জনকে। বিশেষ করে তার প্রতি অনুরক্ত কিছু যুবতী মেয়েদের। বুনোফলের ভালোবাসায় তারা সিক্ত হয়ে অনেকে মন দেয় জনাব আলিকে। জনাব আলি তা বুঝে। তাই তাদের আবদার মিটিয়ে আসতে আসতে নিজের ঘরের সৎ ভাই বোনদের জন্য আর তেমন কিছু থাকে না । ফলে সৎ মার রাগগুলো গুনের নামতার মতো বাড়তে থাকে।
একদিন এক বালতি শিং মাছ প্রতিবেশির মেয়ে ময়নার কাছে দিয়ে আসে। ময়নার মার প্রশ্রয়ে জনাব আলি রাতের বেলা তাদের ঘরে শিং মাছের ঝুল দিয়ে লুকিয়ে খেয়ে আসে। এতে পাশের ঘরের শাকেরা জানতে পারে । ঈর্ষায় তার মুখ মরিচের মতো লাল হয়ে যায়। সে ঘটনাটি সাত রঙে রাঙিয়ে ফাঁস করে দেয় পুরো পাড়ায়। আর যায় কোথায় ময়না! পরের দিন তার সৎমা বোন আমেনা কে নিয়ে ময়নার চুলের মুটি ধরে। ঘর থেকে নিয়ে আসে। তারপর কাঁঠাল গাছের সাথে বেঁধে ময়নার চোখমুখ দিয়ে শিং মাছের ঝুল বের করে। অবশেষে ডানাভাঙা আহত ময়না কলঙ্ক নিয়ে ধড়ফড় ধড়ফড় করতে করতে বাড়ি আসে। ময়নাও রাগে ফুঁসে ওঠে। ময়না তার গতরের সব কলঙ্কের পালক ঝেড়ে ফেলতে চায়। জনাব আলির পরিবারের প্রতি প্রচন্ড ক্ষোভ তার । ক্ষোভ জনাব আলির প্রতিও। কিন্তু তার বোন সৎ মার এত অন্যায় অত্যাচারে একটি প্রতিবাদ ও করিনি সে। বাইরে সে বীর কিন্ত ঘরের মানুষের কাছে নিবেদিত প্রাণ জনাব আলি যতই অপরাধ করুক কোন প্রতিবাদ করে না । করবে কিভাবেই সে দিন তো কাছেই ছিলোনা। কোথায় পালিয়ে গিয়েছিল ।
একদিন নুনুই্যযা ছাগলগুলো চরাচ্ছিল ধলার পাহাড়ের ঢালে। মনে হলো কি একটা তার বামপাশে রাস্তার ধার ঘেষে শাঁ করে করে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর জনাব আলি আসছিল দক্ষিণ পাড়ার রাস্তা ধরে। নুনুয়্যার দেরি করল না আর সাথে সাথে বলল,‘‘অ চাচা এহন উগ্গা বড় আপ মনে অয় ঝুপ ইবাত দোড় মারি ঢুকি গেইয়্যই।তারপর জনাব আলি একটা কঞ্চি নিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে দিল ঝোপঝাড়টা। লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বের করল ডলফিন মার্কা একটা দেয়াশলাই। মূহুর্তে পোড়ে গলো ঝোপটা। তারপর দেখতে পেলো একটা গর্ত। জনাব আলি বুঝতে পারল এটাই সাপ খোপ। তারপর বলল,‘‘ আ কুতকুতের বাচ্চা বের হ। বের হ বলছি । জনাব আলি যতই লেজ ধরে টানে সাপটি ততোই অন্ধকার গর্ত খুঁজে । তারপর মল্লযুদ্ধের অবসান হয় ঘন্টা খানিক পর। ঘেটি ধরে সাপটি নিয়ে আসে রশিদার মার ঘরে। ঘেটি শক্ত করে ধরে হাতের পেঁচানো অংশটা রশিদার মার গলায় ঢলে দেয়। রশিদার মার গা টা মূহুর্তেরই খিতখিত করে ওঠে। ভয়ের চোটে শুধু একটা আওয়াজ বের হলো তার গলা থেকে। ‘‘ও রে জারগোর পোয়া… তুই ইয়ান কি গরলিরে…’’ বলে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যায় রশিদার মা।
এবার ভয় দেখানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায় জনাব আলি,হাতে প্যাঁচিয়ে সাপটি নিয়ে রাজ্য ঘুরে আসার। মানুষ থ বনে যায়। এমন বিষধর সাপ হাতে নিয়ে কেমনে ঘুরে জনাব আলি! পেছনে আনন্দ উৎসব করছে তার ঢোল পেটানো শিশু-কিশোর-যুবারা।ঘরের ঘাটার বেষ্টনী আর্গলে ময়নার মধুময় মুচকি হাসি জনাব আলির শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে দেয়। বাঁক ঘুরিয়ে জনাব আলি যখন সামনে এগুতে থাকে তখন গ্রীবা বাঁকিয়ে উড়ালপঙ্খীর মতো ময়নাও ডানা ভাসাতে থাকে বাতাসে। তার স্বপ্নের নায়কের বীরত্বের কথা চাওর হচ্ছে আকাশে বাতাসে।
এমন বীরত্বের দিনেই প্রিয়ংবদার মিলন হয়। আজ সন্ধার জন্য প্রস্তুত হয় ময়না।তলে তলে কত জলে খেল শুধু কি ময়নাই জানে? না আরো অনেকে?অনুকূল, খুশিদ, আনসার, নাজিম, জয়ফুল, শেখড় ও নুনুইয়্যা-জনাব আলির বিশ্বস্ত সাথীরা। যাই হোক আজ পূর্ণতা পাবে ময়নার যতসব ভালোবাসা, মুছে যাবে যতসব অপমান, প্রতিশোধ। সে জনাব আলিকে বিয়ে করেই ছাড়বে। তারপর জনাব আলির সৎমার নাকের ও চোখের পানি এক করে ছাড়বে। আর তার আইবুড়ো ওই বোনটির চুলের ঝুটি ধরে ঘরের বাহির করবে। সন্ধ্যায় জনাব আলির সব সাহস গুলো ময়নার বুকে জমা হয়। নীল রাঙের একটা বইতে কলমা পড়ে স্বাক্ষর করে দু’জনে। কেউ জানবেনা। সাক্ষী কাজী নিজে যোগাড় করে নিবে। পাড়ার লোক যেদিন জানবে। সেদিন শাকেরার বুক জ্বলে যাবে। পানিতেও তৃষ্ণা মিটবেনা। ঘনঘন বিষম উঠবে। জনাব আলি আজ থেকে আর কারো নয়। নয় শাকেরার, নয় আনজুর, নয় সালমার। একান্তই ময়নার। জনাব আলি যদি পাড়ার বীর হয় তাহলে ময়না হবে বীরাঙ্গনা। ময়নার হলুদ শাড়ি, লাল ব্লাউজের ভাজে ভাজে প্রতিশোধের রিরিংসা। গোলাপী ঠোঁঠের কোণায় যেন আগুন জমে আছে। শুধু উদগীরণের অপেক্ষা। ময়না দিন গুনে। কখন বীরাঙ্গনা বেশে জনাব আলির ঘরে উঠবে। ময়নার মাও তার ছায়া হয়ে দাঁড়ায়। মেয়ে মানুষের মাঝেমাঝে জিদ না দেখালে হয়না।
জনাব আলির শরীরের বল আরো বেড়েছে। মনের জোর তো আছেই। কালো লম্বা চুলে তেল চকচক করছে। শ্যামলা দেহে নতুন পোশাক। ভেতরে শাদা সেন্টু গেঞ্জি, বাইরে রঙিন শার্ট আর ফজর আলী লুঙ্গি। রঙের সুঘ্রাণ ধাক্কা মেরে যাচ্ছে নাসারন্ধ্র পথে। দারুণ রোমাঞ্চ। ময়না দু’টি পাখা লাগিয়ে নিলে মনে হবে এখনই উড়াল দিয়ে চলে আসবে।এমন আনন্দ জনাব আলি আর কখনো পায়নি। প্রেমের পূর্ণতা পেয়েছে। পায়ে আলতা মাখছে ময়নাও। লালা পাড়ের শাড়িতে ভেসে যাচ্ছে পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ। লাল গোলাপে ভরে উঠছে বিছানা। সারা শয্যায় বাসরের ফুল ফুটছে। জনাব আলির বুকে মাথা পেতে শুয়ে আছে ময়না। জনাব আলি উবু হয়ে ময়নার মুখের কারুকার্য পরিদর্শন করে যেন কোনো রত্ন মূর্তি। ময়নার পালকে হাত বুলায়ে জনাব আলি। চরের ঘাসের মতো নরোম বুক। জায়নামাজের মতো দু’হাত রেখে মাথা রাখে জনাব আলি।এমন সময় অনুকূল, খুশিদ, আনসার, নাজিম, জয়ফুল, শেখড় ও নুনুইয়্যা এসে ডাক দেয়, ‘‘ও খুইল্যা ও খুইল্যা… ঘরোত আছন্নে? একখান হথা আছে । এক্কানা বাইর অন। পরীর পারোত যন পরিবো ।’’সঙ্গীদের ডাকে জানাবের ভাতঘুম ভাঙ্গে। বুক ধড়ফড় করে বিছানায়ে উঠে বসে । বাইরে এসে দেখে নুনুয়্যার হাতে একটা শিয়ালের বাচ্চা। কিরে নুনুইয়্যা ইবা কি?ইবা হত্তুন আইন্নোস দে।’’
‘‘পরীর পারোত্তু ও খুইল্ল্যুা। পারোর হাচাত আয়রে যহন কাউকাউ,গরের তহন আরা যায়রে লই আইস্যি। কুইরের বাইচ্চা মনে গইজ্জিলাম পরে দেহিদ্যে ইয়ালর বাইচ্চা। আরা আইসিদ্যে আরো শিয়ালের বাইচ্চা ধরিবল্লাই।চলেন খুলু, চলেন দেরি নগজইজ্জন।’’
জনাব কিছুক্ষণ চেয়ে দেখে। কোনো কিছু বলেনা। ঘুম ভাঙার সাথে সাথে মধুর মিলনের স্বপ্নও ভাঙছে। সবাই চেয়ে আছে গুরুর চেহারার দিকে। গুরুর যে পিছুটান তৈরি হচ্ছে তা এখনো শিষ্যরা বুঝেনা। অনেকক্ষণ পরে গায়ে একটা গামছা নিয়ে বলল,‘‘চল তইলে আজিয়া যত শিয়ালের বাইচ্চা পাইয়্যোম বিয়াগ্গুন নিয়ে আইস্যোম।’’
সৎমার ডাক পড়ে ‘‘ওরে জনাইফ্যা আর যেডে যাবি যা তবু এ অবেলায় পরীর পারোত ন যাইচ।’’
কিন্তু এ জগতে সৎমার কথার কে দাম দেয়? আকাশের মেঘ জমেছে। বেলা পড়ে যাওয়ার আর বেশি সময় নেই। সামনে জনাব আলি আর পেছনে কয়েকজন উৎতি কিশোর,যুবা। হাতে একটি শিয়ালের বাচ্চা।লোকালয় থেকে দূরে পরীর পাহাড়ে অমূল্য এক অভিযানে নেমেছে তারা।অবশেষে পৌঁছে যায় সবাই।
বিরাট শিরিষ গাছ ।তার পাশেরটা কাঠবাদাম। এই পুরানো বৃক্ষগুলো পাশের চিতার ভুত প্রেত দৈত্যদানবদের বেশ প্রশ্রয় দেয়। বৃক্ষগুলোর বিপরীতে পাহড়ের ঢাল। টকটকে লাল মাটি। তারমধ্যে কয়েকটি শেয়ালের গর্ত।গর্তের মুখ খোলা । অনূকুলদের চারদিকে বিভিন্ন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে গাছে উঠে যায় জনাব আলি। বাচ্চা শেয়ালটি গাছের সাথে বেঁধে দেয় শক্ত করে।
বাচ্চা শেয়ালটির কুঁইকুঁই আর্তনাদ শুনে ধীরেধীরে অনেকগুলো শিয়াল জমতে থাকে। মানুষের গন্ধ পেয়ে অনুকূলদের তাড়া করলে সবাই পালাতে থাকে। জনাব আলি ভয়ার্ত কন্ঠে ডাক দেয়।কিন্তু কেউ শুনে না। এবার শিয়ালগুলো গাছের চারদিকে শিকল তৈরি করে ঘিরে ফেলে। সন্ধ্যা গত হয়েছে। আকাশের বিদুৎ চমকাচ্ছে। বজ্রপাত সহ বৃষ্টি শুরু হলো। অভিযাত্রী জনাব আলির হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। প্রচন্ড ভায়ের চোটে গলার স্বর কমে গেছে।এতো ক্ষীণ কন্ঠ দূরের লোকায়ের কোনো মানুষের কানে পৌঁছেনা।নিচে আবছা আলোতে চেয়ে দেখে শিয়ালগুলো এখনো হা করে তার দিকে চেয়ে আছে।লকলকে জিহবাগুলো থেকে লালা ঝরছে।চোখেমুখে অগ্নি ষ্ফুলিঙ্গ।
জনাব আলি তার সৎমার কথা ভাবে। পরীর পাহাড় শুধু পরীদের!দৈত্য-দানবদের,ভুত-প্রেতাত্নাদের!!ওইখানে যাওয়া বারণ!!! তাহলে কি এগুলো শিয়াল নয়? এগুলোই কি দানব? অন্ধাকারের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রচন্ড বেগে ধারাপাত হচ্ছে। বজ্রের আলো শিয়ালগুলোকে ড্রাগনের রূপ দিয়েছে। এগুলো কি সরবে না? এই অন্ধকারে কেউ এগিয়েও আসছেনা । আর এগিয়ে আসাটাও জনাব আলির জন্য অপমানজনক। গাছের বাকল বেয়ে বৃষ্টির নহর নামছে। এতোক্ষণ পর জনাব আলির বুকে কাঁপুনি শুরু হলো । আষাঢের অনেক বর্ষণে ভিজেছে জনাব আলি। এরকম ঠান্ডায় কখনো জমেনি। ঠান্ডায় জমতে জমতে কান দিয়ে আগুন ছুটলো। সে হুঁশ থাকতে গামছা দিয়ে গাছের ডালের সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলে তারপর পরনের লুঙ্গি দিয়ে। তারপর বেহুঁশ সন্ধ্যায় বৃক্ষের ডালে বুক ঘষে ঘষে জ্বরের ঘোরে দু:স্বপ্ন দেখে জনাব আলি। গাছে গোড়ায় জমায়েত হয় শজারু, বন্য শুকর, শেয়াল, দুধরাজ, উড়ক্কু সাপ,দাঁড়াশ, পদ্মগোখরো, গাছের উপরের ডাল বেয়ে নেমে আসছে কালনাগিনী। কাজীর নালায় মল্লযুদ্ধে প্রাণ দেওয়া অজগরটিও ণীলাভ চোখে জিহবা বের করে এগিয়ে আসছে জিনাব আলির দিকে্। জনাব আলি কাঁতরাতে থাকে।তার এ আর্তনাদ এ বসুন্ধরা শুনে না। কোথায় পালাবে জনাব আলি?
লজ্জাবতীর সমুদ্রস্নান- আবদুল কাইয়ুম মাসুদ
এতো ঝিনুক দেখে রিমি দিশেহারা। রংবেরঙের ঝিনুক। দৃষ্টিনন্দন নানা ডিজাইনের ঝিনুক! দেখে দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে তার। বালির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এসব ঝিনুক। বালি সরে যাওয়ায় আজ দৃশ্যমান হয়েছে। রিমির সুযোগ হলো, প্রথম বারের মতো ঝিনুক কুড়াবার। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত রিমির কাছে নতুন নয়। আগেও এসেছে। বেশ কয়েকবার। মা বাবার সাথে অথবা স্কুল কলেজের পিকনিকে।
কখনো এতো ঝিনুক চোখে পড়েনি রিমির। আজ দেখছে। সামনের দিকে যাচ্ছে আর নানা রকমের ঝিনুক দেখছে সে। বিচিত্র এ অভিজ্ঞতা তার মন ভরিয়ে দিচ্ছে। ঝিনুক খুঁজতে খুঁজতে সে অনেক দূর চলে গেছে। ভিন্ন ভিন্ন রূপের ঝিনুক পাওয়ার নেশায় বিভোর সে। পেছন ফিরে দেখে তার জীবনসঙ্গী দাঁড়িয়ে আছে। একা। স্থির দৃষ্টি তার দিকে। হয়তো উপভোগ করছে রিমির ঝিনুক কুড়ানোর দৃশ্য।
জনমানবহীন বিচ-এ কিছুটা শংকাও কাজ করছে। রিমি আরও এগিয়ে যাচ্ছে। তার হাসবেন্ড যতক্ষণ আছে ততক্ষণ কোন ভয়কে জয় করা যাবে। এ আত্মবিশ্বাস তার আছে।
বৃষ্টি থামছেই না। ঝুম ঝুম বৃষ্টি। রাসিদ সৈকতের ছাতা সম্বলিত চেয়ার বা ‘কিটকট’র দুটো ছাতা একসাথে দিতে বলেছে ছেলেটিকে। বৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা। তাদের দু’জনকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা কিটকট এর দায়িত্বে থাকা এ ছেলেটিরও ছিলো। অন্তত একটা সিট ভাড়া নিশ্চিত হবে। তাই সে দুই/তিনটা ছাতা এনে চেষ্টা করেছে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে। সে সফল হতে পারেনি।
এরমাঝে যে কয়জন ঊষাকালিন পর্যটক এসেছেন একে একে তারা সবাই চলে গেছেন। রাসিদ আর রিমি রয়ে গেছে। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে কিটকট রেখে সে ছেলেটিও বীচ সংলগ্ন দোকানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বিশাল সমুদ্রের ধারে এখন শুধু দুটো মানুষ। রাসিদ আর রিমি। তাও একজন থেকে আরেক জনের থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে। তবুও তাদের ভালো লাগছে।
রাসিদ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল আকাশ থেকে বারিধারা ঝরছে; জলে ও স্থলে। ভূমিতে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য সে অনেক দেখেছে। সমুদ্রে এটিই প্রথম। বৃষ্টি আর সমুদ্রের পানির খেলা ভীষণ ভালো লাগছে তার। মনে হচ্ছে প্রতিনিয়ত অসংখ্য তীর সমুদ্রের বুক ক্ষতবিক্ষত করার চেষ্টা করছে। সমুদ্রও বুক পেতে দিয়েছে। রাসিদের গায়েও পানি বোমা লাগছে। বৃষ্টির ফোটা পানির তৈরি তা মাটির দেহ সয়ে যাচ্ছে নীরবে। তারওপর জামাকাপড়ও সহায়ক হয়েছে। অবিরত বৃষ্টির ফোটা সয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে।
রাসিদ বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে তাকিয়ে আছে। যতদূর দেখছে সব ঘোলাটে পানি। বালির ওপর বড় বড় সাইজের বৃষ্টির ফোটা পড়ছে, মাটি ধুয়ে বালিসহ সমুদ্রে গড়িয়ে পড়ছে। বালির নিচে লুকিয়ে থাকা সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন ঝিনুক বেরিয়ে আসছে। আর সমুদ্রের পানি ঘোলা হচ্ছে।
আজ তেমন বাতাসও নেই। ঢেউও তার ছন্দ হারিয়েছে। সমুদ্র আজ ক্ষতবিক্ষত। বৃষ্টির ফোটা প্রতিনিয়ত আঘাত করে চলেছে; সমুদ্রের বুকে। স্থির, নিস্তেজ ভিন্নরূপের এক সমুদ্র দেখছে সে। বৃষ্টির ফোটাগুলো নিরবে ধারণ করে যাচ্ছে, বিনিময়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে তার জলরাশি।
রিমি আজ ভোরে ফজরের আজান শোনার সাথে সাথে ঘুম থেকে ওঠে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন সেরে রাসিদসহ হোটেল থেকে বীচে এসেছে। সে বেশ লাজুক। সকালে পর্যটকদের ভীড় এড়িয়ে গোসল সারবে আজ লজ্জাবতী। দীর্ঘ সময় নিয়ে। রাসিদের হাত ধরে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বিশাল বিশাল ঢেউয়ের দোলায় রোমাঞ্চিত হবে।
গতকাল ভোরেও তারা এসেছিলো। সমুদ্রের পানিতে নেমে গোসল করেছে। ঘুম থেকে ওঠে আসতে একটু দেরি হয়ে গেছিলো,তাই বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। ভীড় বাড়ার সাথে সাথে রিমির চেহারার লালিমাও বাড়তে থাকে। ঊষা ফেটে সদ্যোদিত সূর্য্যের কঁচি আলোর স্বর্ণালি আভা সে চেহারার ওপর যখন পড়েছে তখন কি যে অপরূপ শোভার অবতারণা হয়েছে সেটি রাসিদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। অমূল্য স্মৃতিসম্পদ হয়ে।
ঢেউ আঁচড়ে পড়ার সময় প্রথম প্রথম খুব ভয় হতো রিমির। রাসিদের হাত আটকে ধরে থাকতো সে। আস্তে আস্তে ঢেউয়ের সাথে দোল খাওয়া শিখে গেছে। দু’জনে একসাথে দোল খেয়েছে; কখনো কখনো একাকার হয়ে। মাঝে মাঝে রিমি রাসিদের চেহারার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছে। সুর্য্যের কোমল আলো রাসিদের অপরিনত দাড়ির ফাঁক গলিয়ে ফর্সা চেহারায় পৌঁছানোর পর সে সূর্য্যরশ্মি যে কি যে দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিলো চারিদিকে রিমি তা দেখে ক্ষণিক স্তম্ভিত হয়ে অপলক নেত্রে হারিয়ে গেছে; বহুবার। পরক্ষণে বড় আকারের ঢেউ এসে পড়লে তার হাত আটকে ধরে থাকা রাসিদের হাতের তৎপরতায় সম্ভিত ফিরে পেয়েছে। মেতে ওঠেছে স্রোতের সাথে দোল খেলায়।
মাঝে মাঝে উঁচু ঢেউ চুবিয়ে দিয়ে গেছে। ফোটা ফোটা পানি রাসিদের দাঁড়ি বেয়ে বেয়ে পড়েছে। প্রতিটি ফোটা সূর্য্যালোকের ঝলকানিতে মুক্তোর রূপ ধারণ করেছে। সব মিলিয়ে যার হাত ধরে মধুচন্দ্রিমায় এসেছে তার সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করেছে, বারংবার। আহা! এমন সুন্দর পুরুষও হয় বুঝি!
গতদিনের এমন সুখস্মৃতির তাড়া থেকেই আজ সূর্যোদয় আগেই তারা বীচে এসেছে। আসার পর পরই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। সেই রকম বৃষ্টি। পানির ফোটা বলতে আমরা যে সামান্য পানির দলা বুঝি এগুলো সেরকম ফোটা নয়। স্বাভাবিক বৃষ্টির ফোটার চেয়ে অনেক বড়। জামাকাপড় ভেদ করে শরীরেও আঘাত করছে। তারপরও রিমি অপেক্ষা করেছে। বেশ কিছুক্ষণ ভেজার পর দু’জনই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অপরাপর পর্যটকদের মতো তারাও বীচ থেকে ফিরে গেছে। পরম যত্নে নিয়ে গেছে কুড়িয়ে পাওয়া ঝিনুকগুলো।
আজ তাদের গোসল হয়েছে বৃষ্টির পানি দিয়ে। নিরাপদ,পরিচ্ছন্ন পানি। সৈকতেই গোসল হয়ে গেছে রিমির। তটে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ-গাছালির মতো। বৃষ্টির ফোটা পড়ছে আর এসব গাছের পত্র পল্লব শিহিরিত হচ্ছে। সারি সারি গাছ-গাছালি ধুলোময়লা মুক্ত হয়ে সতেজ, সজিব হয়ে উঠছে।
আজ রিমির সমুদ্রের পানিতে নামা হয়নি, ছন্দময় ঢেউয়ের তালে তালে দোল খাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঊষার গগনে আলো দেখেনি। সূর্য্যালোকের দেখাও মেলেনি।
বর্ষা ভাবনা
জলপদ্যের শব্দমালা- তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী
বর্ষার ঝর ঝর — অঝোর ধারায় ঝরে বৃষ্টি। টিনের চালে, গাছের ডালে ঝম্ ঝমা ঝ্ম — টুপটাপ বৃষ্টি। এ বৃষ্টির জলধারা ভিজিয়ে দেয় গাছ-পালা, তরু-লতা,মাঠ-ঘাট এমন কি আমাদের দেহ-মনকেও। বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির অনাবিল রুপ কার না ভাল লাগে ! আর যদি ভরা বৃষ্টিতে দেখা মেলে কোন বৃষ্টিভেজা ভরা-যৌবনা নারীর এবং তা যদি চোখে পড়ে কোন কবির; কবির অভিব্যক্তি হয় তখন আল-মাহমুদের মত —
” বৃষ্টির বিধানে সিক্ত এমন কি তোমারও কামিজ
প্রকৃতি গুছিয়ে দেয় সবুজের সহজ শরম ‘।
(সনেট–১, বখতিয়ারের ঘোড়া) ।
অথবা ‘ প্রেম-বিরহের কিংবদন্তী-পুরুষ ‘ কবি চণ্ডীদাশের সহজ সরল স্বীকারোক্তি — ” আঙ্গিনার মাঝে বধুয়া ভিজিছে
দেখিয়া পরান ফাটে “।
বৃষ্টি-স্নাত বধুয়া বা রমণীর শরীরে তখন সাঁতরে বেড়ায় দেবরাজ ইন্দ্র অথবা জিওসের আত্মা। বর্ষণ মুখর দিনে বৃষ্টি-ভেজা রমণীর ভেজা-কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে ওঠা নান্দনিক সৌন্দর্যের মতো বৃষ্টি আমাদের অন্তর-মন ভিজিয়ে ভিজিয়ে ভিতরের সুন্দরকে দৃশ্যমান করে, যা বাঙময় হয় আমাদের সৃষ্টিশীলতায়। ‘ ‘আষাঢ় ‘প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ” বর্ষা ঋতুটা বিশেষ ভাবে কবির ঋতু’। এতো গেল কবির কথা। বৃষ্টি আমার কাছে মিষ্টি মধুর, উপভোগ্য এক নান্দনিক সৃষ্টি। বৃষ্টি ঝরছে —আমি বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখি। বৃষ্টির সুঘ্রান নেয়ার চেষ্টা করি। বৃষ্টির জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। বৃষ্টির একটানা গান আমার অন্তরকে স্পর্শ করে। বৃষ্টি পড়ছে — আমি তার শব্দ শুনতে পাচ্ছি; বৃষ্টি ঝরছে — আমি তার কণা দেখতে পাচ্ছি। এই শুনা আর এই দেখা — আমার মনোজগতে আলোড়ন তুলে। আমার অন্তর-মন নেচে উঠে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে । বর্ষার সজল সরসতায় ভূ-প্রকৃতি হয়ে ওঠে সতেজ-সজীব। বৃষ্টিকে আমার মাঝে-মধ্যে মনে হয়, জন্ম-সূত্র ‘বীর্য’, মেঘের কামুক রসে সিক্ত করে যে কেবল মাটিকে করে পোয়াতি। বৃষ্টি যেমন বর্ষণের, তেমনি বৃষ্টি কর্ষণেরও । বৃষ্টি-স্নাত ভূমি কর্ষণ করে যেমন চাষী ফসল ফলায় , তেমনি বৃষ্টি-স্নাত মন কর্ষণ করে লেখক-কবি সৃষ্টির পসরা ফলায়। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃষ্টি-স্নাত বর্ষা নিয়ে ১১৬টি গান রচনা করেছেন। মেঘদূতে তিনি বর্ষাকে অপরুপ বন্দনায় তুলে এনেছেন। বৃষ্টি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কথায় —
” যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে,
সে কথা আজি যেন বলা যায়,
এমন ঘনঘোর বরিষায় ” । (বর্ষার দিনে) ।
বরিষার রিম-ঝিম ছন্দে আমাদের মগ্ন চেতনার ঘনঘোর আকাশে খেলা করে বৃষ্টি। বৃষ্টি সকলকেই করে অর্ন্তমুখী। তখন কেউ হয়তো কলম ধরেন, কেউ ধরেন না — এই যা পার্থক্য। একটানা বর্ষণের অফুরান অবসর মুহুর্তে যিনি কলম হাতে নিয়ে লিখতে শুরূ করেন, বৃষ্টি তার মানস- পটে হাজির হয় সৃষ্টির পসরা নিয়ে। ময়ুখ চৌধুরীর কথায় —
” মেঘের পোষাক ছেড়ে বৃষ্টি নামে পাহাড়ের স্তনে ;
পাদদেশে নদী বয়, নৌকাখণ্ড ভাসে দেহ-মনে “।
বৃষ্টি মানেই জল -পতন। বৃষ্টি মানেই জলের অস্তিত্ব-প্রকাশ। রিম-ঝিম, ঝম-ঝম, ঝুম -ঝুমা- ঝুম, ঝর-ঝর, টুপ-টাপ, টাপুর- টুপুর, ইলশে-গুড়ি — যেভাবেই ঝরুক। বৃষ্টির জল-পতনের এই ধারায় একটা ছন্দ আছে, আছে তাল,লয়। জল-পদ্যের এই সম্মোহনী যাদুতে মানুষ মাত্রই মোহিত হয়। এই মাহেন্দ্রক্ষণে মানুষ ঘোর -লাগা একটা সময় পার করে। আর সেই মানুষ যদি হয় কবি -সাহিত্যিক —তাহলেতো কথাই নেই। কালজয়ী অনেক পংক্তি বা সাহিত্য এ মৌসুমেই লিখেছেন বেশীর ভাগ সৃজনশীল কবি-সাহিত্যিক। এ সময় কবি-লেখকের বর্ণনা কেবল বর্ষণমুখর দৃশ্য রচনায় সীমিত থাকে না, মানুষের একান্ত আবেগ অনুভুতি, নর-নারীর অন্তরলোকের নিভৃত অভিব্যক্তিও সুন্দর বিধুর হয়ে ওঠে। বৃষ্টিতে মন উড়ে যায় দূর পাহাড়ের সেই চূড়ায় — যেখানে মেঘ ধূসর শাড়ি পরে ছুঁয়েছে এ ধরণীকে কিংবা পায়ে চলা মেঠো পথে — যেখানে এখনো সতেজ আমাদের পদস্পর্শ। বৃষ্টি আমাদের সৃষ্টি ও মননে নতুন চিন্তার রুপক, ভাবরস সঞ্চারী কাব্য-প্রতিমা। ভূমির ক্ষয় আছে, প্রকৃতির আছে রুপ-বদল। কিন্তু বৃষ্টির ! বৃষ্টির ছন্দ আছে, বৃষ্টির গন্ধ আছে, আছে রুপ-রস, মিলন-বিরহ-বেদনা। আর আছে নতুন ভাবনার চিন্তন।
বৃষ্টি মানুষকে আচ্ছন্ন করে। ‘ আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে’র বর্ষণে নিসর্গের সান্নিধ্যে , প্রকৃতির একাকীত্বে মানুষের শৈল্পিক ভাবনা মূূর্ত হয়ে ওঠে। এ সময় সৃজনশীল চিত্রশিল্পী সর্বদা একটা সৃজন প্রক্রিয়ার আবর্তে ঘূর্ণমান থাকেন ।তখন তিনি প্রকৃতির অনাবিল আবাহনে কখনো আনন্দিত, কখনো বিষাদে হন বিক্ষত। এ সময় প্রকৃতির সাথে শিল্পীর আচরণ অনেকটাই একতরফা — গ্রহীতার। শিল্পী মনে তখন তৈরী হয় প্রকৃতির প্রতি নিখাদ মায়া এবং শংকা ক্যামোফ্লেক্স। অন্তর্জগতের এই দ্যোদুল্যমানতাকে নানা ভঙ্গি, ফর্ম, টেক্সচার, রেখা -রঙে-চিত্রপটে বুনন করেন নিপুণ পটুয়া।
বাঙ্গালির পাললিক মনের সাথে বৃষ্টির নিবিড় সখ্যতা। বৃষ্টির রিম ঝিম ছন্দে মন উড়ে যায় দূরে কোথাও , যেখানে শাল- পিয়ালের বনে নাম না জানা বুনো ফুলের সুবাস,মাটির সোঁদা গন্ধে মন হয়ে যায় পাগলপারা। বাঙ্গালির জীবনে বৃষ্টির কথা এলেই অনিবার্যভাবে এসে যায় কবি কালিদাস ও তার কালজয়ী ‘ ‘মেঘদূত’ এর কথা। মেঘদূতে আছে,
“মেঘলোকে ভবতি সুকিনুহপ্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ
কণ্ঠাশেষ প্রণয়িনী জনে কিং পুর্ণদুরসংস্হ “।
(মেঘদূত–শ্লোক– ৩) ।
কত শত-সহস্র বছর আগে শেষ হয়ে গেছে সেই কলিদাসের কাল ! খ্রিষ্ট-পূর্ব পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধে জীবিত ছিলেন কালিদাস। অথচ আজো ” মেঘদূত “এর বিরহ-তাপিত প্রেমরসসিক্ত আবেগ বাংলা কাব্যে সঞ্চারমান। মেঘের গুড় গুড় গর্জন আর অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হলেই কালিদাসের মতো বিরহী মন কি যেন খুঁজে ফিরে ইতি-উতি। এ ঘোর-লাগা ক্ষণে সাধু(স্বামী) বিহনে বিরহ-কাতর স্ত্রীর। করুন আকুতি লোকজ পদ্যে শুনুন —
” আইলরে শাওন ঘোর বরিষণ,
গুড়গুড় নাদে করে দেওয়ার গর্জন।
যার সাধু আছে ঘরে আঞ্জা করে ধরি,
ফুলের সাধু ঘরে নাই পাছাড়িমু কারে “।
তখন মনে পড়ে অমিয় চক্রবর্তীর সেই কাব্য পংক্তি, ” কেঁদেও পাবে না তারে বর্ষার অজস্র জলাধারে……….. “। দয়িতের অনুপস্হিতির মাঝে তখন মৈথিল কবি বিদ্যাপতির মতো বলতে ইচ্ছে করে —” এ ভরা বাদর মাহ, ভাদর শূণ্য মন্দির মোর “। বৃষ্টি-বাদল বর্ষণে চলে ভাললাগা- মন্দ লাগার কানামাছি খেলা।
বর্ষার বর্ষণের সাথে সঙ্গীতের কোথায় যেন নিবিড় সাদৃশ্য বিদ্যমান। উভয়ের সক্রিয়তায় ছন্দের অনুরণন লক্ষণীয়। সঙ্গীতের মতো বৃষ্টিরও শব্দ বা আওয়াজ আছে ; যা ছন্দময়,অনুভূতিপ্রবন। শব্দ ও সঙ্গীতের সুর সমান্তরাল হয়ে নিরন্তর বাজে। কান পাতলেই তা শোনা যায়। আবদুল মান্নান সৈয়দ বৃষ্টির মাঝে
সঙ্গীত দেখেছেন—- ” মেঘ করে কালো হয়
মেঘ ফেটে বৃষ্টি নামে অমোঘ সংগীতে “।
(আষাঢ়স্য প্রথম দিবস) ।
সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম সংগীত গুরু তানসেন নাকি মেঘমল্লার রাগ-সংগীত গেয়ে আকাশে মেঘের সঞ্চার করতেন, বৃষ্টি ঝরাতেন। সংগীতের মতোই বৃষ্টি মানুষকে মাদকতায় বুঁদ করে রাখে। মনকে করে আনচান, প্রাণকে করে উচাটন। বৃষ্টির বাড়ি খুঁজতে গিয়ে মেঘের দেশে মন ছুটে যায়। মেঘকে খুঁজতে গিয়ে দেখি
—” সাগর থেকে জন্ম নিয়ে আকাশে করে বাস ,
মায়ের কোলে ফিরে যেতেই জীবন হয় তার নাশ “।
অথবা
” সাগরে জন্ম তার অাকাশে ওড়ে
পর্বতের মার খেয়ে কেঁদে ঝরে পরে “।
প্রাকৃতিক নিয়মে বর্ষা আসে শীতল পায়ে। বর্ষার বৃষ্টিতে হৃদ- চলচ্চিত্র সচল হয়ে উঠে। এ সময় স্মৃতির সরোবরে ভিড় করে আনন্দের অনুক্ষণ, মিলন- বিরহের নানা অনুষঙ্গ। রাধা নাকি অভিসারে যেতেন বৃষ্টিতে। আর বলতেন, ” আমার শূণ্য মন্দিরে বৃষ্টি পড়ছে “। বৃষ্টি কামকাতর নর-নারীর কাছে সঙ্গমের মতোই প্রার্থিত, চর্চিত, উপভোগ্য। আকাশের নীলবর্ণ ও কাজলের ছোঁয়ার স্পর্শে বৃষ্টির অঝোর ধারা, মেঘের গুড় গুড় ডাক বিদ্যুতের আলোর ঝলকানির মাঝে ময়ূরও পেখম মেলে নৃত্যের তালে তালে বর্ষা অবাহন করে। প্রেমের কবি নজরুল তখন লক্ষ করেন —-
” বন ময়ূর অানন্দে নাচে ধারা প্রপাত ছন্দে “।
এ সময় আমাদেরও প্রাণ খুলে গাইতে ইচ্ছে করে —”
নাচ ময়ূরী নাচেরে/ রুম ঝুমাঝুম
নাচেরে / ঐ এল আকাশ জুড়ে / বর্ষা রাণী সাজেরে “। / বৃষ্টির টাপুর-টুপুর ছন্দে গাছের ডাল-পাতা একে অপরকে জল ছিটিয়ে
জলকেলী করে। তখন কবিগুরু’র কবি মনে ধ্বণিত—-
” বৃষ্টি আসে মুক্তা কেশে আঁচলখানি দোলে,
নাচন লাগে পাতায় পাতায় আকুল কল্লোলে “।
আর গ্রীস্ম-দাহে শুস্ক বিমর্স ধান-চারা বৃষ্টির জলে গা ধূয়ে তরতাজা সতেজ হয়ে হেলেদ্যুলে হৃদয় নাড়ায়। ধানকন্যার প্রতি তাই অন্য এক কবির আকুতি —-
” আকাশ জুড়ে মেঘ জমেছে বৃষ্টি থেকে বন্যা,
গা ধুয়ে নাও দুধেল মাটির বিষণ্ন ধান-কন্যা”।
যখন আকাশের সবগুলো দরজা খুলে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে মেঘেদের দল, তখন ভরা বর্ষণে আমেরিকার দক্ষিণ – পূর্বাঞ্চলের আদিবাসি চেরোকিরা পাখির পালক আর নীল-সবুজ পোষাক পরে এক ধরণের বৃষ্টি – নাচে বিভোর হয়। তাদের বিশ্বাস, ভরা বর্ষণে এ ধরণের বৃষ্টি- নাচের ফলে খারাপ আত্নাগুলো পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যায়। খরার প্রচণ্ড তাপদাহে ধরা যখন জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়, তখন বৃষ্টি ঝরানোর নানা সংস্কারে মেতে উঠে মানুষ। বৃষ্টি কামনায় আমাদের দুই-বাংলায় পূজা-পার্বন, যাদু-টোনা, মানতের আশ্রয় নেয়া হয়। ব্যাঙের বিয়ে, কূলা নামানো, ইন্দ্র পূজা ভাঁদো পূজা, বসুধারা ব্রত ইত্যাদি পালন করা হয়।
গ্রামের মেয়েরা গোল হয়ে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে নেচে নেচে গায় —- ” আল্লা মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই ” অথবা ” দেওয়া তুমি অদরে বিদরে নামো………. ” আর চক্রের মাঝখানে কলসি থেকে পানি ঢালে। উদ্দেশ্য, বৃষ্টির ভারী বর্ষণ।এক সময় বৃষ্টি কামনায় ‘চৌদ্দ মাদল ‘ বাজানো হতো। বৈষ্ণব কবি হরিদাসের মতে —
” চৌদ্দ মাদল ধ্বণি যে স্হানে হয়,
সেখানে হরির নামে বৃষ্টি সুনিশ্চয় “।
চট্রগ্রামে একসময় পানি মাঙার রেওয়াজ ছিল। লোকজন বিশ্বাসকরতো, পানি মাঙলে বৃষ্টি হয়। পানি মাঙার সময় মাথায় কূলা নিয়ে
তারা গাইতো—– ” মারে মা মেঘ রাণী,
ঠেং ধুই ধুই ফেলা পানি।
কেলার আগাৎ বেতর বান,
ঝর ঝরাইয়া পানি আন “।
তারা যে ঘরে যেত, সে ঘরের কর্তা বা গিন্নি এক গামলা পানি তাদের মাথায় ঢেলে দিত। অনুরুপ রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ায় ” পাপারুদা ” নামে এক ধরণের বৃষ্টি- নাচ প্রচলিত আছে, যেখানে এক যুবতী মেয়ে গাছের সবুজ পাতা আর ডালপালা দিয়ে ‘স্কাট ‘বানিয়ে তা পরিধান করে গ্রামের পথে নাচতে নাচতে প্রতিটি বাড়িতে ঢুঁ মারে। তখন বাড়ির কর্তা পানি দিয়ে তাকে ভিজিয়ে দেয়। অনেকটা একই ধরণের নাচের প্রচলন আছে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান, শ্লোভাকদের মধ্যে। আর্মেনিয়ায়ও’পিরপিরুনা ‘ নামে একই নাচ প্রচলিত আছে। বৃষ্টির কামনায় পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ির কিছু কিছু স্হানে এবং বাংলাদেশের পাঁচগড়, দেবীগঞ্জ, বোদা, রাজগঞ্জ এলাকায়’হুদুম চুকা’বা’ হুদুমদেও’ নামে জল-দেবতার পূজাকে ঘিরে এক ধরণের বিশেষ নৃত্য গীত হয়। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে বিশেষ স্হানে শাল বা কলাগাছকে ‘ হুদুম ‘ এর প্রতিভূ গণ্য করে আদিবাসী ও বাঙ্গালি নিম্ন – গোত্রের মেয়েরা সম্পূর্ণ উলঙ্গ -বিবস্ত্র হয়ে টিন বাজিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে উদ্দাম ছন্দে নৃত্য করে আর গায় —
” কুদুম দেও হুদুম দেও এক ছলকা পানি দাও, ঁছুয়ায় পানি নাই, পানি ছুঁয়ায় ছুটি বারা পানি।। কাল্যা মেঘ ধওল মেঘ, মেঘ সোদর ভাই,
এক ঝাঁক পানি দাও,গা ধুবারে যাই”।
এ অনুষ্টানের ধারে -কাছেও পুরুষরা ঘেঁষতে পারে না। তাদের ধারণা, এ নৃত্যে জলদেবতা হুদুম কামোদীপ্ত হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসবে এবংসাথ সাথে নেমে আসবে অঝোর বৃষ্টি। অনা বৃষ্টিতে বৃষ্টি প্রত্যাশিত ও সঙ্গত। কিন্তু অতিবৃষ্টি ! তাও অনাকঙ্খিত। ছড়ার যাদুকর সুকুমার বড়ুয়ার কথায় —–
” আয় বৃষ্টি আয় / হিসাব করে আয় / ঘরবাড়ি আর ফসল যেন /রক্ষা পেয়ে যায় “। /
বৃষ্টি অঝোরে ঝরলে লোকজ সুরে গাইতে ইচ্ছে করে —- ” নেবুর পাতা করমচা, /যা বৃষ্টি ধরে যা “। /
অতি বৃষ্টিতে বন্যা হলে নিম্ন- বঙ্গের রমণীরা আদিকালে কোন দুগ্ধবতী ভরা-যৌবনা নারীর দুগ্ধ পোড়া-মাটির পাত্রে সংগ্রহ করে বন্যার জলে ভাসিয়ে দিত এই লক্ষে যে, তা পান করে জলদেবতা তুষ্ট হবে এবং অবিরাম বর্ষণ বন্ধ করবে। তখন তারা গাইতো —–
” দেবারে দেবা দুধ খা,
পিয়ার বুকের দুধু,
জলের ধারা বন্ধ হলে
পাবি আদর কুত “।
বৃষ্টির ক্যানভাসে -অনাবৃষ্টি, স্বল্পবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি — যাই থাকুক না কেন, বৃষ্টি আসলে বৃষ্টি। বৃষ্টি প্রকৃতির অলন্কার। বৃষ্টিকে নিয়ে যত গল্প, রুপকথা, ছড়া, কবিতা , গান রচনা হয়েছে ; বৃষ্টিকে নিয়ে যত শব্দমালা গাঁথা হয়েছে, অন্য কোন বিষয়ে তা হয়েছে কি-না আমার সন্দেহ। বৃষ্টি নিজেই আসলে শিল্পোত্তীূর্ণ পদ্য,রসোত্তীর্ণ গল্প,কালোত্তীর্ণ কথামালা। টুং টাং জলপদ্যের শব্দমালা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কবি।
বাংলার বর্ষা ও কিছু শৈশব- শামসুদ্দীন শিশির
বর্ষার মাতাল করা অপরূপ দৃশ্য যে কাউকেই উদাস করে। এক টানা রিমঝিম ছন্দে ছন্দে বৃষ্টির অবিরাম শব্দে মন পাগল হয় না এমন মানুষের সংখ্যা বিরল। কবি গুরুর কবিতায় যেমন করে বর্ষা এসেছে ‘ রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা ‘। অথবা আমার বর্ষা জলে ভেজা প্রেমের প্রথম কদম ফুল, গীতিকবির গানে, কবিতায় বর্ষা বন্দনা। সব শব্দই বর্ষায় বাংলার চিরায়ত রূপকে সাজানো। আমি যে ভাবে বাংলার বর্ষা কে উপভোগ করেছি তাই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। দিন নেই, রাত নেই আকাশ কেঁদেই চলছে। এক দিন, দুদিন করে সাতদিন পর্যন্ত ঝরছে তো ঝরছে থামার কোন নিশানা নেই। এ কয়দিন কালো মেঘে ঢেকে রাখা আকাশ সূর্য মামার দেখা নেই বহুদিন। মেঘলা আকাশে গুড় গুড় শব্দ আর মাঝে মাঝে বিদুৎ চমকানো। পথ ঘাট, মাঠ প্রান্তর, পুকুর জলাশয় জলে টইটম্বুর। মানুষের সীমাহীন কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় গবাদিপশু পাখি সহ একই ঘরে থাকতে হয়।। পানির তোড়ে ঘর বাড়ি ভেসে যায়। তখন কেউ কেউ নৌকায় বসবাস করে।। সাথে গবাদিপশু পাখি নিয়ে যায়।। সে এক অসহনীয় যন্ত্রণা।। নিজের খাবার ব্যবস্থা করা। গবাদিপশুর খাবার ব্যবস্থা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।মানুষের দুর্দশার শেষ নেই।বর্ষায় ছোটরা মজা, আনন্দ একটু বেশিই করে। তাদের কাজ খাওয়া আর জলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো। সুযোগ পেলেই ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া আর দীঘির জলে ডুব সাঁতার খেলা। শাপলা শালুক তোলা, মাছ শিকার, বৃষ্টির জলে ভেজা। ইচ্ছে করে কাঁদা মাটিতে আছড়ে পড়া, আম কুড়ানো আরও কত আনন্দ।। সে আর লিখে শেষ করা যাবে না। কখনো কখনো বৃষ্টি আর বজ্রপাত শুরু হয়। তখন বড়রা ছোটদের ঘর থেকে বের হতে দিতেন না। মা, চাচী, দাদী সবাই মিলে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ শুরু করতেন।। তখন ঘরের বাইরে কোন কাজ করার কোন সুযোগ থাকতো না। ছোটদের দিয়ে কাঁথা সোজা করে ধরে সেলাইয়ের জন্য সাহায্য নিতেন। এই সুযোগে ছোটরা কাঁথায় গড়াগড়ি খেতো। অনেকেই সুঁইয়ের খোঁচাও খেয়েছে।। অবিরাম বৃষ্টির কারণে মোরগ মুরগী গুলো ঘরের পাশে ঢেলার উপর এক পায়ে ভর করে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে আর ঝিমিয়ে পড়ে। তখন অবশ্য হাঁসদের আনন্দ বেড়ে যায়।। যতদূর চোখ যায় ঘুরে আসে। বর্ষার থৈ থৈ পানিতে সাঁতার কাটার মজাই আলাদা। গৃহস্তের সংশয় থাকে সন্ধ্যায় হাঁস গুলো ঠিক ভাবে ঘরে ফিরে আসবে তো! নয়তো কাদা জল মাড়িয়ে খুঁজে আনতে হয়।মিষ্টি আলু সেঁকে বা মিষ্টি আলু চুলার ছাইয়ের ভেতর পুড়ে খাওয়া।। কখনো কখনো মা, ফুফু দাদী অবসর থাকলে বিভিন্ন রকম পিঠা তৈরি করে দিতেন। বিকেলের নাস্তা বেশির ভাগ সময়ই হতো ডাটা শাক, কচু শাক বা পাট শাক সিদ্ধ সাথে শুকনো মরিচ টালা।। ও একটা কথা বলাই হয়নি আমাদের ছিল যৌথ পরিবার। একসাথে ১২/১৪ জন বাচ্চা থাকতাম। লম্বা লাইন ধরে বসে নাস্তা, ভাত, ঘুমানো সবই চলতো। সেই ফেলে আসা দিন আহা কি মধুর ছিল। বৃষ্টি থামতে দেরি আমাদের বের হতে দেরি হতো না।
শামসুদ্দীন শিশির: খ্যাতিমান শিক্ষা গবেষক।
বৃষ্টি দেশে বিদেশে- নাজমুন নাহার
১
গত শনিবার থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে সিডনীতে । ঝির ঝির বৃষ্টি । সারাদিন পড়ছে তো পড়ছেই । বাংলাদেশে এরকম বৃষ্টি বর্ষাকালে হয় । তবে জলাবদ্ধতার সমস্যা নেই বলে পানি জমে যায় না ।
শনিবারে যখন সিডনাম মেইনটেনেন্স সেন্টারে কাজে যাচ্ছিলাম তখন এই বৃষ্টি দেখে আনন্দ হলো । মনে মনে বলছিলাম ইস সারারাত যেনো এই বৃষ্টি থাকে । আরো ঝুম বৃষ্টি হোক ।
বাসনা আংশিক সফল হলো । সন্ধ্যা পাঁচটায় হালকা বৃষ্টি সে এতো বলার মতো না । কিন্তু রাত এগারটার পরে সম্ভবত ভালোই বৃষ্টি শুরু হলো । আমি হুমায়ুন আহমেদের ,বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল আর একটা অনুবাদ গল্পের বই হাতে নিলাম । সাথে ফেসবুক , গেম – ফাঁকে ফাঁকে বৃষ্টির অবস্থা দেখছি –
সে ঝরেই যাচ্ছে – আজ বৃষ্টিকে ভালো না বেসে উপায় নেই –
রোববার আমার কাজ নেই – সোমবারে আবার কাজ ।
সোমবারেও আকাশের মেঘ ভার । বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে । ইউনিয়ার্ডে কাজ ছিল । কাজের দিন সবসময় ভালো লাগে না । আজ ভালো লাগলো – এতো মানুষের সাথে দেখা হচ্ছে আজ ! কাউকেই তেমন চিনি না । সাদা , কালো , কিছুটা ডার্ক , চাইনিজ , আরো কত ধরণের মানুষকে দেখি । আনন্দ হয় ।
চাইনিজ মেয়েরা ব্র্যান্ডের দামী ড্রেসগুলো পড়ে । ছিমছাম পরিপাটি সবসময় । এই বৃষ্টিতে লম্বা ছাতা সাথে রাখে । একে আবার এতো মসৃণ করে গুটিয়ে রাখে , দরকার হলে আবার খুলে দেয়। মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা সবই গোছানো –
বাসে ওঠার সময় সাদা ,কালো ,ব্রাউন সবাই কিউ ধরে দাঁড়ায় । কোনো গোলযোগ নাই কে আগে যাবে কে পরে যাবে – শৃংখলা পরিমিতিবোধ অনেস্টি শেখার জন্যেও দেশ লাগে – বাংলাদেশের অনিয়মে চলে আসা আমরা ঠিকই কিউ ধরে দাঁড়াই – গোলযোগ তো করি না ।
আজ ছিলো ঝকঝকে আকাশ ।শীতও কমে এসেছে । বৃষ্টি শীত কমিয়ে দিয়েছে বোধ করি । অস্ট্রেলিয়ায় শীতকালেই বৃষ্টিটা বেশী হয় । ওরকম মেঘ কালো হলে আকাশ কালো হলে আমি বিষণ্ন হই ।
বিষণ্ন কেন ? কেনো এই বিষণ্নতা ?
আহা ! সোলসের গানটা মনে না করলেই নয় –
”কেউ না জানুক কার কারনে
কেউ না জানুক কার স্মরণে
মন পিছু টানে…
তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে…
তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে… নিয়মে…
সত্যিইতো জীবন তো তার নিয়মেই কাটে – তার নিয়মেই চলে – আমরা শুধু তার পিছু হাঁটি —
২
বাংলাদেশে এইসময় বর্ষাকাল । অস্ট্রেলিয়াতে বর্ষা বলে আলাদা কোনো সিজন নেই । যে কোনো সময়ই বৃষ্টি হতে পারে বলে সম্ভবত এখানে বৃষ্টির জন্য আলাদা সিজন রাখা হয় নি । সামারে ৪০ ডিগ্রীও হয় টেম্পারেচার । সারাদিন এতো গরম – এতো গরম – বিকেল হলে সমস্ত প্রকৃতি কালো করে বৃষ্টি নামে । সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । প্রকৃতি , প্রাণীজগত আমরা সকলেই । বৃষ্টির জন্য আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছেন । জানিনা অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টি নিয়ে এতো উচ্ছ্বাস আছে কিনা !
সমস্ত দোকানপাটে বোঝাই আছে ছাতা । ৫ ডলার থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত দাম । পাখির পালকের মতো হালকা কিছু ছাতা আমার ব্যাগে সবসময় থাকে – বলা তো যায় না কখন নামবে রিমঝিম বৃষ্টি-
কবিগুরু বর্ষার কবি । আহা পদ্মার বুকে যখন কবি পালতোলা বড় নৌকা/বজরা নিয়ে ভাসতেন তখন ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়ছে সমস্ত আকাশ ভেঙ্গে,সবুজ পানিতে তৈরী হচ্ছে বৃষ্টির ছন্দ এর চাইতে সুন্দর দৃশ্য আর হতে পারেনা । এভাবে ঝর ঝর করে বৃষ্টি আমাদের দেশেই নামতে পারে ।
কবির বাণীর সাথে আমার একাত্মতা- কবি কেমন করে বলেন ওই মন কেমন করা সব সুর,বাণী ছন্দ এই বৃষ্টিকে ঘিরে –
‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে.জানি নে, জানি নে, কিছুতেই কেন যে মন লাগে না’।।
আসলেই এই বাদলা দিনে কিছুতেই মন বসে না –
তাহলে কি চায় মন? সেখানেও একটা উত্তর আছে কবির
‘এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে. উদ্ভ্রান্ত মেঘে… মন চায়… মন চায়… ঐ বলাকার পথখানি নিতে চিনে ;’
দেশে প্রায় বর্ষায় দেখতাম আমাদের বাসার পেছনে আদর্শ পাড়ায় এক বুক পানি উঠে গেছে । মনে মনে খুশী হয়ে উঠেছি- আর যেতে হবে না কলেজে । আহা বর্ষা মানেই বুঝি এই শহরেও বুক সমান পানি ।
কলেজে বসে আছি একদিন।ছুটির সময় হয়েছে। তারও একঘন্টা আগে থেকে বৃষ্টি শুরু হলো।ওমাই গড! এর মধ্যেই দুই নাম্বার গেটের পানি কোমর ছাপিয়েছে। যদিও কষ্ট এই অনিয়ম বৃষ্টির তোড়ে তবু এক অজানা
আনন্দে সবার চোখ ঝলমল করছে- সবাই বুক পানিতে হয়রান, কি যন্ত্রণা কি যন্ত্রণা !
তবু মানুষ এতো খুশী কেন!! আজব তো ।
একদিন এমবিএ ক্লাস শেষ করেছি । বাসায় ফিরবার সময় দেখি হায়রে বৃষ্টি ! সব উড়িয়ে নেয়ার মতো বৃষ্টি । অনেক কষ্টে একটা রিকশা পেলাম । তখন রাত নয়টা । বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার । আর প্রকৃতিতে তুফান। রিকশা চলছে ।মনে হচ্ছিলো সেদিন রিকশাটাও উড়িয়ে নেবে । রিকশার ভেতর ভিজে একশা হয়েছি । রিকশাওয়ালা অনেক কষ্ট করে আমাকে বাসার সামনে নামিয়ে দিলো । তাকে অনেকটা বেশীই ভাড়া দিলাম । ভাই অনেক কষ্ট করে আনছো আমাকে । সে লজ্জা পাচ্ছিলো নিতে । মনে মনে ভাবছিলাম আহা- ওরাও অনেকে এতো ভালো হয় ।
হুমায়ুন আহমেদেরও প্রিয় ঋতু বর্ষা । তার নায়ক নায়িকা সবাই বর্ষায় ভেজে। স্নান করে । আনন্দে গায়- এসো করো স্নান নবধারা জলে’
একদিন ঘুম ভাঙ্গলো বজ্র বিদ্যুতের কড় কড় শব্দে। অস্ট্রেলিয়ার বৃষ্টি মিন মিন করে যেনো পড়ে । বাংলাদেশের বৃষ্টির মতো এমন মহাসমারোহে আসে না । কিন্তু একদিন বজ্র আর বিদ্যুতের সমারোহ দেখে মন কেমন করে উঠলো । দেশের বর্ষার জন্য মন কাঁদলো । পর পর কদিন ইউটিউবে ব্জ্র বিদ্যুতের কড় কড় শব্দ ,টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনে মনকে বোঝাতে চেয়েছি- পৃথিবীর সকল দেশই আমার দেশ- সকল বর্ষাই আমার বর্ষা –
আহা দেশ – আহা আমার রিমঝিম সজল ঘন বৃষ্টি…
নাজমুন নাহার: কবি ও প্রাবন্ধিক। অস্টেলিয়া প্রবাসী।
এক গুমোট প্রহর- সুলতানা কাজী
এ এক গুমোট প্রহর! চারদিকে নিষ্প্রাণতা! ভালো থাকার, ভালো রাখার প্রাণপণ লড়াই। সবাই যোদ্ধা!! অন্য রকম, অন্য সময়ের!! গন্তব্য অজানা…আমার, আমাদের, সকলের।।
বসে আছি যেন অন্তহীন কালের অপেক্ষায়!! বাইরে ঝুম বৃষ্টি। কখনো জোরে, কখনো ঝিরিঝিরি। শ্রাবণ’ ছুঁইছুঁই। মনে পড়ছে, ছোটবেলায় দেখা পাল তোলা নৌকার কথা। আচ্ছা, নৌকাগুলো কি এখন আছে আমাদের দেশে? আমি চোখ বন্ধ করে চলে যাচ্ছি, গেরুয়া রঙের ওপর নানা রঙের ছোট কাপড়ের তালি দেওয়া পাল তোলা নৌকার কাছে!!
বর্ষা মানেই মেঘ, বৃষ্টি, নতুন প্রাণ,জেগে ওঠার গান। ঐশ্বর্যের ঋতু, অকৃপণ ঋতু, সমৃদ্ধির ঋতু মানেই হলো বর্ষা। সে সকল প্রকার জরাজীর্ণ, পাপ-তাপ আর পুরাতনকে ধুয়ে মুছে পবিত্র করে তোলে। সে যতটা না কাঁদে, তার চেয়ে বেশি হাসে। প্রকৃতিতে যৌবনের হাওয়া তোলা এ ঋতু আমার ভীষণ প্রিয়। এর সাথে বাঙালির জীবন ও এক সাথে গাঁথা। চারদিকে সবুজের মনোলোভা রূপ আমাদের মোহিত না করে পারেনা। সিক্ত হৃদয় উদ্বেলিত হয় এই সময়ে। বর্ষায় ঝরে কোনো এক আনখোরা লেখকের কলম। অবিরাম…অবিরাম ধারায় চলছে। হয়তো চলবে!
আকাশের ওপর ভাসমান শূন্যতা! মেঘের ওপর মেঘ, তার ও ওপর আকাশ!! জীবন অনিশ্চিত দূর…
“এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর”।
বৃষ্টি মুখর দিন। গাছে গাছে ফুল আর বৃষ্টির পরশ। বৃষ্টির পানিতে নৃত্য করে পাখিরা। টাপুরটুপুর বৃষ্টিতে ঝাপসা হয় গাছপালাগুলো। ফুল ফুটে, গন্ধ ছড়ায়,ছড়াবে ও !! মেঘের পরে মেঘ জমবেই… আমি চেয়ে চেয়ে দেখি। এই তো বেশ আছি! কত সুন্দর এই পৃথিবী। এই আকাশ,এই বাতাস, এই বৃষ্টি, এই স্নিগ্ধতা…!
সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা হচ্ছি আধুনিক। কিন্তু বৃষ্টি, বর্ষার রূপ অাদিগন্ত একই..। সেই কালো মেঘে ঢেকে থাকা, অঝোর ধারায় বর্ষণ সবই তো স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতির অপরূপ রাণী বলে কথা!!
বর্ষা মানেই আবেগ অনুভূতির মাখামাখির সময়। একে নিয়ে মাতোয়ারা হননি এমন কবি সাহিত্যিক পাওয়া যায়না। শুধু কবি সাহিত্যিক নন, সাধারণ মানুষ ও এর বন্দনায় গা ভাসিয়েছেন। কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ বা নির্মলেন্দু গুণ,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হুমায়ুন আহমেদ… কেউ বর্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি।
আমরাও প্রতিনিয়ত জীবনের এই ভাঙাগড়ার খেলার মধ্যে স্বপ্নের জাল বুনি। এই মাটির বর্ষণমুখর সন্ধ্যা, আকাশের পুঞ্জপুঞ্জ মেঘ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ধারাপাত বড় ভালো লাগে আমার। মনে হয়, আমি যেন সব কিছুতেই মিশে আছি। এই বিশ্বপ্রকৃতির বিশাল আয়োজনে আমি ও এক অতিথি যেন। আমার এ আবোলতাবোল হয়তো কারো ভালো নাও লাগতে পারে……. …
মাটি,গাছপালা, পশু-পাখি,নদীনালা সর্বোপরি প্রকৃতিকে আমাদেরই ভালোবাসতে হবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতির সাথে আমাদেরও সৌন্দর্য ও ভালোবাসার মেলবন্ধন তৈরি হবে। বর্ষা আমাদের জীবনের অশান্তিগুলো ধুয়ে নিয়ে গিয়ে শান্তির বার্তাবাহক হোক। বর্ষাধারায় শুদ্ধ হই আমরা সকলে।
সুলতানা কাজী:তরুণ লেখিকা। শিক্ষিকা,অংকুর সোসাইটি স্কুল, চট্টগ্রাম।