পাঠ-উন্মোচন
সাবিনা পারভীন লীনা’র ‘বহুদিনের বাক্যরাশি’ অথবা বিষণ্ণ চৈতন্যের প্রান্তে
রেদওয়ান খান।। পুবাকাশ
‘কথারা হারিয়েছে সকালের উদাসীনতায়/
সন্ধ্যার মৌনতা গড়েছে নীরবতার দীর্ঘ প্রাচীর/…
আর রেখে এসেছি তোমার করতলে/
পথের ধারে ফোটা এক বর্ণিল বুনোফুল।’
‘বহুদিনের বাক্যরাশি’ হাতে পেয়েছিলাম কবির হাত থেকে। অভ্যাসবশতঃ বার বার পাঠ করেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে এইসব বাক্যরাশি বহুদিনের অকথিত কথামালা কবি জমিয়ে রেখেছিলেন। কবিরা প্রথমতঃ জমিয়েই রাখেন। আকাশে ক্রমশঃ জমতে থাকা মেঘমালার মতো। জমে থাকা কথামালা এক সময় শ্রাবণের বরিষণ হয়ে নেমে আসে; ছাতিম বা হিজল ফুলের মাদকতা যোগ হয় সেই জলধারাপাতে। তখন পাঠক-লেখক একাকার হতে বাধ্য।এর নামই কি কবিতায় অবগাহন? সুতারাং বহুদিনের বাক্যরাশি হয়ে ওঠে নিভৃত-পাঠের এক অনন্য অভিজ্ঞান, যা কবি থেকে পাঠকে জারিত হতে থাকে।
মানুষ চিরকাল প্রেমের কাঙাল– এ কথা শ্বাশত। প্রেম ও প্রেমাষ্পদের উদ্দেশে যেসব না বলা কথা সাধারণ মানুষেরা বলতে গিয়ে শব্দ, বাক্য, উপমার অতল খুঁজে তলিয়ে গিয়ে রুদ্ধবাক হয়ে যায়, সেইখানে কবি খুঁজে পান ভাষা। কবিতার ভাষা, অতএব, হয়ে ওঠে এক সংযোগ-সেতু যা চৈতন্যের প্রান্তে এক অনুপম অনুভূতি-অনুরণন-কম্পন তোলে,অদৃশ্য ঢেউয়ে দুলতে থাকে পাঠকের মন।
পাঠক হিসেবে আমাদেরকে চমকে দিয়ে কবি সাবিনা পারভীন লীনা তাঁর নির্মিত ‘বহুদিনের বাক্যরাশি’ গ্রন্থের উৎসর্গ রচনায় এনেছেন অভিনবত্ব। যখন কবি সূচনায়, উৎসর্গপত্রে লেখেন–
‘আমার তৃষ্ণা,আমার হাহাকার ছুঁয়ে
তুমিই এসেছ,
তোমাকে।’
অর্থাৎ আমাদের কাছে কবিতার গতি ও গন্তব্য আর অস্পষ্ট থাকে না– কবির একান্ত আপনার জনকে, দয়িতকে উদ্দেশ্য করেই তাঁর এইসব কথামালা। আর সূচনা কবিতা তাহার কথায় তো দেখতেই পাই–
‘আমার পুরো জীবন সঁপে দিয়েছি তোমার দুই আঙুলের মাঝে।
কিন্তু তারপর ঠোঁট চেপে কেটে গেছে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা’(তাহার কথা)
তখন গভীর প্রেম-ভালোবাসায় সমর্পিত কবির দুঃখলীন অন্তঃক্ষরণে পাঠকের মন ভিজে ওঠে। আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। এই যে মন খারাপ হল– এখানেই কবিতার প্রকৃত যাদু যা এক মায়াবিভ্রমের ভেতর আস্তে আস্তে আমাদেরকে তলিয়ে নিতে থাকে। কবিতায় এই মায়া-বিভ্রম তৈরি করার ক্ষমতা-দক্ষতা-ই কবি সাবিনা পারভীন লীনাকে অন্যদের থেকে পৃথক করেছে। কবিতায় নিজস্ব স্বর এখানে স্পষ্ট।
‘বৃষ্টি ভেজা বৃষ্টি’ কবিতায় আগুন যদি জ্বলে,তবে কার কাছে রাখতে চান আসন্ন বৃষ্টির জল? যে জলে আগুন আরো জ্বলে উঠবে নাকি নিভে যাবে যখন উচ্চারিত হতে দেখি–
‘বৃষ্টিটা আজ তোর কাছেই রাখ/
বিপুল জলের আধার/
তোর বুকেই থাক।’(বৃষ্টি ভেজা বৃষ্টি)
আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি না। আমরা ঘুরপাক খাই। আমাদের মন বৃষ্টির মত ভার হতে থাকে। হয়তো বা এক্ষুণি সেই অশ্রুটলমল বৃষ্টি নেমে আসবে। অবসান হবে দুঃখের।
প্রকৃতিলগ্ন উপলব্ধি ও শব্দচয়ন কবি সাবিনা পারভীন লীনার কবিতাকে বিশেষত্ব দান করেছে বার বার। ছোট ছোট কিন্তু কবির চোখ ও মনোযোগে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে এইসব প্রকৃতিপাঠ। ফলে কবিতার শিরোনাম হয়ে ওঠে করতলে বুনোফুল, বনসাই, উতল দুপুর, ঝরা পাতার প্রলাপ, হৈমন্তী, নক্ষত্রকাল ইত্যাদি। এরকম বহু কবিতায় ছোট ছোট কিন্তু বর্ণিল হয়ে দেখি তাঁর কথা ও কথা বলার উপমাগুলো। ফলে কবির নিজের কথা, প্রকৃতি ও পাঠকের মধ্যে এক ধরণের সংযোগ স্থাপিত হয়। এই কবিতায়-পাঠকে সংযোগ স্থাপিত হয় এখানেই কবিতার সার্থকতা।
‘কথারা হারিয়েছে সকালের উদাসীনতায়/
সন্ধ্যার মৌনতা গড়েছে নীরবতার দীর্ঘ প্রাচীর/…
আর রেখে এসেছি তোমার করতলে/
পথের ধারে ফোটা এক বর্ণিল বুনোফুল।’
পাঠ করতে করতে কবি ও তাঁর দয়িতকে অনুভবে পাই এবং প্রকৃতির কচি লেবু পাতার আড়ালে, ভাঙা বাড়ির ফটকে অথবা থমকে থাকা জলে পাঠকও ক্ষণিক থামকে থাকেন। এই যে পাঠককে আচমকা থমকে দেয়ার শক্তি তা বহুদিনের বাক্যরাশির-ই শক্তি যা ভাষার কারুকাজে বন্দি করেছেন কবি। পাঠকের অনুভবে নির্মাণ করেছেন এক বিষাদমগ্ন কারাগার।
মানুষকে যেমন তার স্বপ্নের বেদীমূলে অপেক্ষা করতে হয়, তেমনি কবিকেও তো!কারণ তিনি তো রক্তে মাংসে ও করোটিতে পুঁতে রাখা তাঁর নিজস্ব স্বপ্নবীজের গন্তব্যে ধাবিত হবেন– এটাই স্বাভাবিক। স্বপ্ন যেমন থাকে, থাকে স্বপ্ন ভঙ্গও। ভালোবাসা যেমন থাকে, থাকে ভালোবাসায় কাঁটার মতো বিঁধে থাকা ব্যথালীন রক্ত-ক্ষরণও। এই বেদনার্ত অনুভবকে কবি প্রকাশ করেছেন প্রকৃতির নীরব সব উপমার সঙ্গে মিলিয়ে; তাই পাঠক হিসেবে আমরা কবিকে সম্পূর্ণ ছুঁয়ে যেতে পারি না, পারা অবধারিত নয় যদিও,কবি,কবিতা ও যিনি পাঠ করছেন এই তিনের মাঝে যে চৈতন্য-ভাষ্য তাকে তো ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না; তবে অদৃশ্য সুতোর বুনন নিশ্চিতভাবেই বোনা হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, কবি উপমা-উৎপ্রেক্ষাগুলো খুঁজে নিতে বরাবরই হাত পেতেছেন নিজের গভীর প্রকৃতিপাঠের ভিতর থেকে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে মাটিলগ্ন। তাই স্বপ্নভঙ্গের কাতরতা দেখতে পাই কবিতার পরতে পরতে, যা মাটির মানুষেরই কথামালা– যেখানে রূপোর মাদুলির প্রসঙ্গ এসেছে, এসেছে লৌকিক বিশ্বাসে স্থাপিত বহুকালের অব্যক্ত অথবা ব্যক্ত প্রেমিক-মনের উচ্ছ্বাস, আনন্দ, দুঃখকাতরতা ও হাহাকার।
‘এখন আমি প্রাচীন রক্তজবার কাছে নত হই/
রূপোর মাদুলি বেঁধে রাখি শরীরের গোপনে/
অবিশ্বাসের দরোজায় তালা ঝলিয়ে/
আশায় থাকি…/
এক জোড়া শাদা কবুতরের।’ (রূপোর মাদুলি)
পাঠ করতে করতে খেয়াল হল কবিতা গ্রন্থটি দু’টি ভাগে বিভাজ্য। গ্রন্থভূক্ত ১ নং কবিতা ‘তাহার কথা’ থেকে শুরু করে ৩৮ নং কবিতা ‘ঘুম আসে না’ পর্যন্ত একটি অধ্যায় এবং এর পরের অংশটি দ্বিতীয় অধ্যায়। দ্বিতীয় অংশেই স্থাপিত হয়েছে শিরোনামভূক্ত বহুদিনের বাক্যরাশি, যথাক্রমে ১,২,৩,৪,৫,৬….থেকে আরম্ভ করে ৩২ নং সংখ্যা হিসেবে যেখানে কবি এভাবেই বিভক্ত কিংবা লিপিবদ্ধ করেছেন রাশি রাশি কথা, থোকা থোকা প্রকৃতিলগ্ন উপমা, বাক্য, পংক্তি।
কবিতাগুলোয় প্রকৃতি থেকে অতি যত্নে তুলে আনা হয়েছে নরম নরম উপমা-তুলনা যা তাঁকে জীবনানন্দীয় করে তুলেছে অনেকটাই; কিন্তু কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে সাবিনা পারভীন লীনার নিজেরই কবিতা। দেখতে পাই, প্রকৃতি কীভাবে এসেছে কবির বুননে। যখন পাঠ করি– ধূসর ছায়ার জলাধার, আঁধারেতে আলোর বীণ, দুপুরের নতমুখি রোদ, বিকেলে উন্মনা শিরীষ, আমের মুকুলের গন্ধ, জলে আঁকা বৃত্ত, মহাজাগতিক মুগ্ধতা, আয়নামতির গল্প,বুকের জমিনে ফোটা ঘাসফুল,পরান ডাহুক,কুয়াশায় জড়ানো নদী, ধূসর আঁচলে ধুতুরা, সোনামুখি সুঁইয়ে বোনা আধখানা নকশার কৌতুক, পাহাড়ে মৌনতার ভাঁজ, শালিকের পায়ের কাছে ছেড়ে যাওয়া মুহূর্ত, চোখের কোলে জমা দীর্ঘ পৌষের রাত, ইচ্ছামতির তীরে একলা দোয়েল, মৃত্যু নামা স্নানঘরে ক্লান্ত ঘুঘুর অপেক্ষার প্রহর, মাটিলেপা গুদামঘরের সিন্ধুক, পানকৌড়ির টলটলে আঙিনা, ডালিম ফুলের লাল থালায় ডুবে কলাপাতার আদর মাখা দই,রোদের গন্ধ মাখা প্রজাপতি,বাতাসে কদমের ঘ্রাণ কিংবা নয়নতায় ফরিদা খানমের গান– এইসব মোহন উপমা-ভাষ্য একই সঙ্গে এক ধরণের জীবনানন্দীয় বিষণ্ণ কথার জালে আবদ্ধ হই আমরা। কিন্তু পুনরায় কৃষ্ণপক্ষ রাতে দিশেহারা একাকী তারার ফুল,একাকী শয্যার সঙ্গী, সুখের পোশাকে দুঃখের অবয়ব, হাওড়ের বুক জুড়ে হিজলের গান, জোছনার শাড়ি জড়ানো মাতাল সাম্পান,জানালার ওপারে ছাতিমের ঘ্রাণ, বেদনার পলি মাখা নদী– এইসব উপমা এক বেদনাহত কবির অন্তঃক্ষণের উদাহরণ হয়ে ওঠে।সর্বোপরি পাঠক হিসেবে আমাদের চিন্তায় এক ধরণের উপলব্ধি তো জাগায়– এ কবি এক অন্তঃশীল বিষণ্ণতার কবি। টুকরো টুকরো কথা ও উপমায় বার বার উঠে এসেছে তাঁর স্বপ্নভঙ্গ-হাহাকার এবং তিনি নিজেকে, নিজের চৈতন্যকে উন্মোচন করতে চেয়েছেন প্রকৃতির ভেতর দিয়েই।এইখানে কবি সাবিনা পারভীন নিজের জাতটি চিনিয়েছেন কিংবা বলা যেতে পারেই– সক্ষম হয়েছেন। তিনি প্রকৃতি ও বিষাদময়তার মগ্ন চেতন্যে নিজেকে সঁপে দিয়ে খুঁজতে চেয়েছেন তাঁর নিজের জগতকে যেখানে বার বার ইঙ্গিত আছে দয়িতের, প্রেমিকের, বেদনার, আশাভঙ্গের।খখনও-বা কবিকে বলতে দেখি
‘বুকের তল শূন্য করে চলে গেছে যে
তার খোঁজ মেলে না জলের গভীরে
মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে থাকে সে
নিঃসঙ্গ সেতারের স্বরলিপি হয়ে।‘
(নিঃসঙ্গ সেতার)
শেষ দুই কবিতায় দেখি..
‘কিছু আগুন আমাকে দাও
জীর্ণ পাঁজরগুলো পুড়ে করি কিছু আত্মগ্লানির ক্ষয়..
মাঝে মাঝে মনে হয় এ জীবন আমার,আমাদের নয়।’
(বহুদিনের বাক্যরাশি-৩১)
অর্থাৎ যে জীবন দোয়েলের ফড়িংয়ের মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা!
অথবা পাগলা ঘন্টি বেজে ওঠার প্রেক্ষিতে পাঠকেরও উপলব্ধি হয়
‘শূন্য দৃষ্টিতে ক্রুশবিদ্ধ শরীর…
আর কুয়াশায় ঢেকে রাখে চেনা মুখ।’
(বহুদিনের বাক্যরাশি-৩০)
কবির জগৎ অচেনা হতে থাকে।প্রকৃতপক্ষে জীবনের চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন-আশালতা, হতাশা– এ সবকিছুই কবিতার বাক্যরাশিতে থরে থরে বিছিয়ে দিয়েছেন কবি এ যেন পূজোর বেদীতে সাজিয়ে রাখা এক একটি নৈবেদ্য।পাঠকের পক্ষে একই সঙ্গে প্রকৃতি এবং কবিতার বিষণ্ণতার রসায়নে একধরণের মায়াবী মায়াযাদুবাস্তবতার জাল বুনে যান সূক্ষ্ম সোনামুখি সূইয়ে..তাঁর নিজস্ব নৈবেদ্য এই সব বাক্যরাশি।
সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় শিহাব চৌধুরী বিপ্লব যেমন বলছেন ‘স্বপ্নলোকে নয়, কবি হাত পেতেছেন জীবনের কাছেই।’ কবির এই জীবনলগ্ন আত্মবুননে পাঠককে আহ্বান জানাই।
প্রকাশক খড়িমাটি বইটি প্রকাশে যত্ন ও পারিপাট্যের ছাপ রেখেছেন। ব্যাতিক্রমী প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী দীপঙ্কর দস্তিদার।
বহুদিনের বাক্যরাশি : সাবিনা পারভীন লীনা। প্রকাশকঃ খড়িমাটি,চট্টগ্রাম। প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি ২০২১। প্রচ্ছদঃ দীপঙ্কর দস্তিদার। পৃষ্ঠাঃ ৬৪। মূল্যঃ ২০০টাকা।